বদলে গেছে পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ছিটমহলের জীবনচিত্র

দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনা অবসানের মাত্র দুই বছরের মধ্যে বদলে গেছে বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষের জীবনচিত্র। পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে রাস্তা পাকাকরণের কাজ। এছাড়া গড়ে উঠছে নতুন নতুন স্কুল-কলেজ। প্রতিটি পরিবারই বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। এ পরিবর্তনে খুশি বাংলাদেশের নতুন নাগরিকরাও।

১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি (মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ ও ভারত ১৬২টি ছিটমহলের বিনিময় করে। ফলে ভারতীয় ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এবং ৫১টি বাংলাদেশী ছিটমহল ভারতের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। এতে দুই দেশেরই মানচিত্র পূর্ণতা পায়। আর ছিটমহলবাসী দীর্ঘ ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি পায়। বিলুপ্ত ছিটমহলের উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলার তিনটি উপজেলায় ৩৬টি বিলুপ্ত ছিটমহলের আয়তন ১১ হাজার ৯৩২ দশমিক ৮০ একর। এর মধ্যে ১৭টিতে জনবসতি রয়েছে, যার লোকসংখ্যা ২০ হাজার ৭১ জন। এ বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে তিন বছরমেয়াদি প্রকল্পের আওতায় ১০৫ দশমিক ২৫ কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণ, ১৯৩ মিটার সেতু তৈরি, ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল খনন, ১১টি বাজারে শেড স্থাপন, সাতটি মসজিদ ও পাঁচটি মন্দির নির্মাণ করা হচ্ছে। ৮২ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

জেলা পরিষদের মাধ্যমে ১৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের উন্নয়নে ২৫টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। কৃষি উন্নয়নের জন্য সাইট্রাস ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় বিলুপ্ত ছিটমহলের ৩০০ কৃষক-কৃষাণীকে প্রশিক্ষণ প্রদান, চারা বিতরণ ও প্রদর্শনী খামার তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য সুবিধা পৌঁছে দেয়ার জন্য বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোয় পাঁচটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের অনুমোদন হয়েছে। এর মধ্যে দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত কোটভাজনি ছিটমহলে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। এরই মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দারা এ ক্লিনিক থেকে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন।

শিক্ষার উন্নয়নে জেলা প্রশাসন ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাহিদাপত্র দিলেও পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৪২টি শিশুশিক্ষাকেন্দ্রে নিয়মিত পাঠদান চলছে। সেই সঙ্গে একটি বেসরকারি ব্যাংকের অর্থায়নে টেকনিক্যাল স্কুলসহ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ চলছে। এছাড়া স্থানীয় উদ্যোগে বিভিন্ন বিলুপ্ত ছিটমহলে প্রায় অর্ধশতাধিক স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজ গড়ে উঠেছে, যেগুলোয় নিয়মিত পাঠদান করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) মাধ্যমে তিন উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহলে পাঁচ শতাধিক মানুষকে সম্পৃক্ত করে ১৫টি গ্রাম উন্নয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ১ হাজার ১৬৫ জনকে বয়স্ক ভাতা, ৪৯১ জনকে বিধবা ভাতা এবং ৩২৪ জনকে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে বিলুপ্ত ছিটমহল এলাকায় প্রায় আড়াই হাজার হাস-মুরগিকে টিকাদান ও ৭০০ জন অসচ্ছল নাগরিকের মাঝে বিভিন্ন প্রাণী (গরু, ছাগল, সোনালি মুরগি ও হাঁস) বিতরণ করা হয়েছে। বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে পল্লীবিদ্যুত্ সমিতির আওতায় ২৫০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করা হয়েছে এবং নয় হাজার গ্রাহককে বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়া হয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দখলের ভিত্তিতে প্রাক-জরিপ শেষে ডিজিটাল সার্ভে করা হয়েছে এবং ভূমি রেকর্ডের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের নাগরিকত্বের পরিচয় নিশ্চিত করতে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। ২০১১ সালের হেডকাউন্টিং অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পঞ্চগড়ের তিনিটি উপজেলার ছিটমহলগুলোয় ২০ হাজার মানুষের গেজেট প্রদান করা হয়েছে। সে মোতাবেক এরই মধ্যে নয় হাজার অধিবাসী ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এবং তারা এরই মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

অধিভুক্ত এ ছিটমহল এলাকাগুলোকে ভাগ করে সংযুক্ত করা হয়েছে পার্শ্ববতী ইউনিয়ন পরিষদগুলোর সঙ্গে। সেখান থেকেই তারা ভিজিএফের চালসহ নানা সুবিধা পাচ্ছেন। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে ৩৮০ জনকে মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং ৩ হাজার ২৫০ জনকে ভিজিডি কার্ড প্রদান করা হয়েছে। মত্স্য অধিদপ্তরের আওতায় বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের মাছ চাষে উদ্বুদ্ধকরণ ও সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন জলাশয়ে ১ হাজার ৮০০ কেজি পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বিলুপ্ত ছিটমহলের গৃহহীন ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের জন্য গুচ্ছগ্রাম দ্বিতীয় পর্যায়ের (সিডিআরপি) প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০টি পরিবারের জন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত কোটভাজনি ছিটমহলের বালাসুতি এলাকায় একটি গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়েছে।

সদর উপজেলার বিলুপ্ত গাড়াতি ছিটমহলের রাজমহল উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী সুমাইয়া জাহান স্বপ্না বলেন, আগে আমাদের মিথ্যা পরিচয়ে স্কুলে পড়ালেখা করতে হতো। এখন আমরা আমাদের বাড়ির পাশের স্কুলে পড়তে পারছি।

বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, বাড়িতে এখন আমরা টিউবওয়েল, শৌচাগার সব পেয়েছি। বাড়ির সামনে দিয়ে পাকা রাস্তা হচ্ছে। সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজনে আমরা আইনের আশ্রয়ও নিতে পারি। আগে এসব সুবিধা ছিলই না।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক অমল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, জেলার তিনটি উপজেলায় ৩৬টি ছিটমহল বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এ পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এবং তা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। সরকারের সব উন্নয়ন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা হবে।