দারুণ জয়ে নতুন উচ্চতায় বাংলাদেশ

ভালো শুরু পাচ্ছিলেন, তামিম ইকবাল পাচ্ছিলেন ফিফটিও। কিন্তু তাঁর মতো ব্যাটসম্যানের ব্যাটে যেটি দেখার প্রত্যাশা, সেটি না হয়ে আবারও ফিফটির আশপাশেই থামলেন এ ওপেনার।

ত্রিদেশীয় সিরিজে আগের তিন ম্যাচ মিলিয়ে মাত্র ৩৬ রান করা সাব্বির রহমানও পাওনা মেটালেন, তবে পুরোটা নয়। এই ওয়ানডাউন ব্যাটসম্যানও তামিমের মতোই ৬৫ রানে গিয়ে থামলেন।

সাব্বির তবু পাওনা কিছুটা মেটালেন। কিন্তু সাকিব আল হাসান যে একটুও নয়। আগের তিন ম্যাচের দুটোতে ব্যাটিং করতে হয়েছিল। ইনিংস দুটো মোটে ১৪ ও ৬ রানের। সুবাদে তাঁর কাছে বড় রানের দাবি ক্রমেই উচ্চকিত হচ্ছিল। কিন্তু এ অলরাউন্ডার হামিশ বেনেটের শর্ট বলে উইকেট দিয়ে এলেন ১৯ রানে।

তিনজনেরই আউট হওয়ার ঘটনাগুলো ঘটলও খুব দ্রুত। তাতে নিউজিল্যান্ডের ২৭০ রান তাড়া করতে নেমে দ্বিতীয় উইকেটে তামিম-সাব্বিরের ১৩৬ রানের পার্টনারশিপে জয়ের পথে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগোতে থাকা বাংলাদেশও খায় বড় এক ধাক্কা। ব্যাপার অনেকটা এমন হয়ে গেল যে বানরের তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে

অনেকখানি উঠে আবার ততটাই নেমে যাওয়ার মতো! কিন্তু ডাবলিনের ক্লনটার্ফ ক্রিকেট ক্লাব মাঠের কালকের বাংলাদেশের স্লোগান এটাই হয়ে গিয়েছিল যে ‘আমি নই, আমরা। ’

তাই কেউ একলা নয়, সবাই মিলে ঝাঁপালেন। তাই ধাক্কাও সামলে নেওয়া গেল। অনিশ্চিত হয়ে পড়া জয়ও নিশ্চয়তা খুঁজে পেল মুশফিকুর রহিম আর মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটে। ১৯৯ রানে পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে সাকিবকে হারানোর পর বাংলাদেশ শিবিরে বয়ে যাওয়া আশঙ্কার চোরা স্রোত কেটে বের হয়ে গেলেন ওই দুজন। সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশকেও। ধীরে ধীরে তাই আশঙ্কার মেঘ কেটে গিয়ে দেখা দিল জয়ের সোনালি রোদ্দুরও।

যে রোদে ঝলমলে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যাচ্ছে তাদের অন্যতম গ্রুপ প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডকে এই প্রথমবারের মতো বিদেশের মাটিতে হারানোর আত্মবিশ্বাস নিয়ে। শুধু তাই নয়, এই প্রথমবারের মতো আইসিসির ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে ছয় নম্বরে ওঠার সাফল্য নিয়েও আজ ইংল্যান্ডের মাটি ছুঁতে চলেছে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। শেষ পর্যন্ত ১০ বল বাকি থাকতে ৫ উইকেটের প্রভাববিস্তারী জয়ের কতই না মহিমা!

এর আগে বোলিংয়েও তো ‘সবে মিলে করি কাজ’-এর সফল মঞ্চায়ন। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা দুয়েক দিন আগেই বলে রেখেছিলেন যে বাংলাদেশ এখনো ওয়ানডেতে একেবারে বলে-কয়ে তিন শ রান করার মতো দল নয়। তাহলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জেতার উপায়? তাঁর দর্শনটা ছিল সহজ-সরল। কিউইদেরই তিন শর কমে আটকে রেখে তবেই রান তাড়া করা।

কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমান ওপেনার লুক রংকিকে (২) শুরুতেই ফিরিয়ে দেওয়ার পর কিউইদের অবাধ রানপ্রবাহ ভয়ই ধরিয়ে দিচ্ছিল। দ্বিতীয় উইকেটে এই সিরিজের অধিনায়ক টম ল্যাথাম (৮৪) ও নেইল ব্রুমের (৬৩) ১৩৩ রানের পার্টনারশিপ যেন তিন শ পেরোনোর স্বপ্নই দেখাচ্ছিল তাঁদের। এই ম্যাচেই প্রথম খেলতে নেমে ক্যাচ ফেলা নাসির হোসেন জুটি ভাঙলেন ব্রুমকে ফিরিয়ে। এরপর তুলে নিলেন ল্যাথামকেও। ১১ রানের মধ্যে দুজনের বিদায়ে কিউই ইনিংসের লাগাম টেনে ধরার শুরুও।

তবে ওই যে কেউ একা নন, সবাই। একে একে শিকারযজ্ঞে যোগ দিলেন প্রায় সবাই। রস টেলরকে (৬০*) শেষ পর্যন্ত কেউ তুলে নিতে পারলেন না, কিন্তু অন্যদেরও তাঁর সঙ্গে জমে উঠতে দিলেন না কেউ। সাকিব ৪১ রানে ২ উইকেট তুলে নিলেন তো মাশরাফিও ৫২ রানে দুটো। তাতে কিউইদের ২৭০ রানে আটকে ফেলা বাংলাদেশ ইনিংসের শুরুতেই দেখল বিপরীতমুখী দুটো দৃশ্য। নিজের মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই তামিম মারলেন ছক্কা আর সৌম্য সরকার হলেন আউট। একজন ফিরলেও অন্যজন ঠিকই পথ দেখাচ্ছিলেন।

তাঁর সঙ্গে থেকে পথের শেষে জয়ের বিন্দুটা দেখাচ্ছিলেন সাব্বিরও। কিন্তু মোসাদ্দেক হোসেনের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝিতে সাব্বিরের রানআউট এবং এর আগে-পরে তামিম-সাকিবের বিদায়ে সব যেন মাঠেই মারা যেতে বসেছিল। কিন্তু মুশফিক আর মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটে সেখান থেকেই নতুন প্রাণ পেল দলের ইনিংস। তাঁরা ব্যাটিংও করলেন গুটিয়ে থেকে নয়, সময়ে সময়ে আক্রমণাত্মক চেহারায় দেখা দিয়েও। এ জন্যই বোধ হয় ৪৫ বলে ৩ বাউন্ডারি ও ১ ছক্কায় অপরাজিত ৪৫ রানের ইনিংসে ম্যাচসেরা হয়ে গেলেন মুশফিক। অবশ্য ৩৬ বলে ৬ বাউন্ডারি ও ১ ছক্কায় অপরাজিত ৪৬ রানের ইনিংসে সহজ ক্যাচ ফেলার ব্যাপারটি সুদে-আসলেই মিটিয়েছেন মাহমুদ উল্লাহও।

তাই কেউ কেউ পাওনা একেবারেই না মেটালেও, কেউ কেউ পুরোটা না মেটালেও র‌্যাংকিংয়ের ছয়ে ওঠা আটকে থাকল না বাংলাদেশের!