চিকিৎসা বিপ্লবের আরেক নায়ক আবদুল্লাহ

ঘটনাবহুল বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত দৃশ্যপট পাল্টে যায়। এক বিষয় নিয়ে লিখব তো আরেক বিষয় চলে আসে। রাতে চিন্তা করি রাজনীতি নিয়ে, ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই খবর পাই আমাদের তারুণ্য ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির শক্তির উেসর মূল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনের সামনে অস্তিত্বের স্মারক হয়ে থাকা অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। একজন নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ ভালো মানুষের স্মৃতিচারণ এখন সবাই করছেন। জীবিত থাকতে আমরা কেউ মূল্য দিতে জানি না। হাসান হাফিজুর রহমান তাই আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘এদেশে বীর নেই, শহীদ আছে। ’

কয়েক দিন আগেই বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গী জাঁদরেল কূটনীতিক ও রসবোধসম্পন্ন লেখক ফারুক চৌধুরী ৮৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। অথচ তার ভাগ্যে মৃত্যুর আগে কোনো রাষ্ট্রীয় পদক জোটেনি। অতীতে বাংলা একাডেমি যাকে পদক দেয়, সরকারও তাকে একুশে পদক দিতে দেখা গেছে।

যাক, আমি সে কথা বলছি না। কয়েক দিন আগে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম, আমি চার দশক ধরে কেন সুবর্ণা মুস্তাফার ভক্ত। প্রথম তারুণ্য থেকে বলা যায় আমি তার মুগ্ধ ভক্ত। তাকে কি যে ভালো লাগত, এই পরিণত বেলায় এসেও তাকে যত দেখি আমি তত মুগ্ধ হই। আমি তার ভক্ত, তাকে ভালো লাগে এটা বলতেও আমার গর্ব হয়। তিনি আমাদের শক্তিমান অভিনেত্রী। বাবা গোলাম মুস্তাফাও ছিলেন শক্তিমান অভিনেতা ও আবৃত্তিকার। আমার কৈশোরে গভীর মুগ্ধতায় জড়িয়ে ছিলাম বিশ্বনন্দিত রাজনীতিবিদ শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি। দেহরক্ষীর হাতে এই মহান নেত্রী নিহত হলে আমি অশ্রুসজল নয়নে নির্বাক হয়েছিলাম। দুই ফিতার স্যান্ডেল, ডাইস করা এতটুকু চুল, দৃঢ়ব্যক্তিত্ব আর সাদামাটা তাঁতের শাড়িতে অনন্য সাধারণ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সেই প্রিয়দর্শনী ইন্দিরার প্রতি আমি এখনো শ্রদ্ধাশীল। কৈশোর উত্তীর্ণ তারুণ্যের প্রথম প্রহরে সিলসিলা সিনেমা গভীর ভালো লাগা জন্ম দিয়েছিল বোম্বের নায়িকা রেখার প্রতি। কি যে ভালো লাগত! অমিতাভ বচ্চনকে যেন তার সঙ্গেই মানিয়েছিল। যদিও আমাদের দেশের মহিলারা স্বামীদের প্রতি এতটাই ভালোবাসা রাখেন যে তারা মনে করেন, তাদের জীবনসঙ্গী অমিতাভ বচ্চনের মতোই প্রবল জনপ্রিয় আর ঘরের বাইরে গেলেই সুন্দরীরা ফুলের মালায় বরণ করে তাদের উঠিয়ে নিয়ে যাবেন। সেই সময়ে আমাদের সাদাকালো টিভি জামানায় অভিনয়ে, চেহারায়, কণ্ঠে, সংলাপে, অভিব্যক্তি প্রকাশে সুবর্ণা মুস্তাফা সেই যে জায়গা করেছিলেন মনের জগতে, সেই জায়গা আজও কেউ ভাঙতে পারেননি। সেই সাদাকালো যুগে আফজাল হোসেনের মতো অভিনেতারও যেন জন্ম হয়েছিল সুবর্ণার জন্য।

সেই সময় সপ্তাহের নাটক দেখার জন্য নগর থেকে শহরে সন্ধ্যার পর রাস্তা মানুষশূন্য হয়ে যেত। হুমায়ুন ফরীদির মতো শক্তিমান অভিনেতা একদিকে মঞ্চ আরেক দিকে টিভি পর্দা, শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র কাঁপিয়ে গেছেন। পারলে না রুমকি থেকে অয়ময়, সংশপ্তক, সকাল সন্ধ্যা, এইসব দিনরাত্রি, পূর্ব রাত্রি পূর্ব দিন, জোনাকী জ্বলে, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই অসাধারণ নাটক বাংলাদেশ টেলিভিশন দিয়েছে। আজকের বাংলাদেশে বিটিভি হারিয়ে গেছে দর্শক হৃদয় থেকে। বেসরকারি এত টেলিভিশন চ্যানেল তবু দর্শক রিমোট কন্ট্রোল টিপে যায়, সেই ক্রেজ কোথাও খুঁজে পায় না। সকাল সন্ধ্যার পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, আফরোজা বানু, আলী যাকের, সারা যাকের ছাড়াও আবদুল্লাহ আল মামুন, ফেরদৌসী মজুমদার, আরিফুল হক, আবুল খায়ের, আবুল হায়াত, মামুনুর রশিদ, জহির উদ্দিন পিয়ার, কেরামত মওলা, কেয়া চৌধুরী, আল মনসুর, রিটা, রীনা হক, মেঘনা, তারিক আনাম, খালেদ খানের মতো অনেক প্রতিভাধর দর্শক টানা অভিনেতা-অভিনেত্রী যেন আর আসেননি। তাদের ছায়ায় শহীদুজ্জামান সেলিম, তৌকীর আহমেদ, জাহিদ হাসান, শমী কায়সার, বিপাশা হায়াত, আজিজুল হাকিম, আফসানা মিমিসহ অনেকেই এসেছিলেন। কিন্তু সেই ক্রেজ কেউ ভাঙতে পারেননি। আজকাল রিমোট টিপতে টিপতে কোনো নাটক দেখতে গেলে ভাঁড়ের দর্শন মিলে। সেই শক্তিমান অভিনেতা-অভিনেত্রীর সন্ধান মেলে না। সেই সাদাকালো যুগের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অভিনয়কে যেন সাধনার মতো নিয়েছিলেন। তেমনি ফুটবল জগতে সালাউদ্দিন থেকে সালাম মুর্শেদী, কানন, আসলাম, কায়সার হামিদ, বাদল রায়, মানিক, মুন্নাসহ আরও কয়েকজন দেশের মানুষকে আবাহনী-মোহামেডানের পতাকায় সেই যে জাগিয়েছিলেন তারা এখন ঘুমিয়ে গেছেন। হারিয়ে গেছে সেই ক্রেজ।

বাংলা চলচ্চিত্রে রাজ্জাক, বুলবুল আহমেদ, আলমগীর, আনোয়ার হোসেন, এ টি এম শামসুজ্জামান, সোহেল রানা, ফারুক, ববিতা, শাবানা, কবরী, অলিভিয়া, সুচরিতাদের দাপটের যুগ বাসি হয়ে গেছে। একালের প্রজন্মকে মুস্তফা সরয়ার ফারুকীরা টানলেও সেই ক্রেজ যেন ফিরে আসেনি। ফারুকীর সৃজনশীলতা ও কর্মদক্ষতার ওপর আমার অগাধ শ্রদ্ধা। তার মতোন রাজনৈতিক সমাজসচেতন পরিচালক, নির্মাতা আমি এখনো দেখিনি। তার জন্য আমার মতো অনেকের শুভ কামনা রয়েছে। সেই ফারুকীর একটি চলচ্চিত্র ‘ডুব’ দর্শকদের দেখতে দেওয়া হচ্ছে না। এটা মানুষের একটি স্বাধীন দেশে সংবিধান প্রদত্ত মানুষের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতাকে হরণ করার শামিল। দর্শকদের হলে টানতে হলে এই স্বাধীনতা দিতে হবে। না হয় হলগুলোতে ভারতীয় সিনেমা দেখার সুযোগ করে দিতে হবে।

হুমায়ূন আহমেদের জীবনের অংশ যদি চলেই আসে, তাহলেও দেখতে দেওয়া উচিত। এখানে কার বউয়ের কি মাথাব্যথা সেটি বড় নয়। হুমায়ূন আহমেদ একজন জনপ্রিয় লেখকই নন। তার জীবন বর্ণাঢ্য ও আলোচিত। সৃষ্টিশীল মানুষদের জীবন এমনই হয়। আলবার্ট আইনস্টাইন থেকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনেও বেদনা, বিরহ ও দহন ছিল। কিন্তু তাদের সৃষ্টিশীলতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সাহিত্যের অমরত্ব জগৎ সংসারকে আলোকিত করে গেছেন। হুমায়ূন আহমেদ ফেরেশতা নন, একজন সৃষ্টিশীল বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মানুষ। তাকে নিয়ে চলচ্চিত্র হলেও সেটি নির্মাতার এখতিয়ার। সেই সৃষ্টিশীল মানুষের পরিবারের এখতিয়ারভুক্ত নয়।

মুস্তফা সরয়ার ফারুকীর চলচ্চিত্র নির্মাণের অধিকার সংবিধান ও আইন দিয়েছে। এটি রুখবার মতো বড় হাত কারও হতে পারে না। যাক, বলছিলাম সেই ক্রেজ আমাদের হারিয়ে গেছে। সাদাকালো যুগের জাতীয় রাজনীতি থেকে ছাত্ররাজনীতির যে গৌরবকাল ছিল, যে স্বর্ণযুগ ছিল তা আজ অতীত স্মৃতি ছাড়া কিছু নয়। রাজনীতিতে সেই সাদাকালো যুগে জাতীয় রাজনীতি থেকে স্থানীয় রাজনীতিতেও যারা নেতৃত্ব দিতেন তাদের জীবন ছিল খোলা বইয়ের মতো মানুষের সামনে উন্মুক্ত। জননেতা শব্দটি, গণমানুষের নেতা শব্দটি অনায়াসে তাদের নামের আগে জুড়ে দেওয়া যেত। তারা মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ, অনুভূতি লালন করে রাজনীতি করেছেন। মানুষের কল্যাণে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নির্লোভ, নিরহংকারী আদর্শিক পথ ধরে হেঁটেছেন। তাদের সামনে যে ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা ছিল, গণমানুষের প্রতি সাদামাটা নিরাবরণ জীবনের নির্লোভ, নিরহংকারী চরিত্রের ত্যাগবাদী দর্শনের যে একাত্মবোধ ছিল; আজকের রাজনীতিতে তা নির্বাসিত। তাই রাজনীতিতেও সেই সময়ের সেই ক্রেজ হারিয়ে গেছে, কী গণরাজনীতিতে, কী ছাত্ররাজনীতিতে।

এখন রাজনীতি মানেই খলনায়কের চরিত্রে আবির্ভাব। রাজনীতি মানেই মানুষের অধিকার হরণ। যখন যে ক্ষমতায়, তখন তার দাম্ভিক উন্নাসিকতা গণতন্ত্রকে পদদলিত করে সিন্ডিকেটতন্ত্র কায়েম করে ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করার মধ্য দিয়ে ভোগ-বিলাসের জীবনে গা ভাসিয়ে দেওয়া। এই রাজনীতির সঙ্গে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত, জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিপন্থী। তাই সেই রাজনীতির ক্রেজ, আকর্ষণ আজকের সাধারণ জনগণ দেখতে পায় না, আকর্ষণবোধও করে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সংখ্যালঘিষ্ঠ লুটেরা, নষ্ট রাজনীতিবিদ, সমাজপতিদের আগ্রাসনের সামনে অসহায়। আমাদের এখন সময় প্রবল ঝাঁকুনি দিচ্ছে। সজাগ হওয়ার, সতর্ক হওয়ার, সংস্কারের মধ্য দিয়ে নিজেকে বদলানোর।

একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, সেই বিতর্কিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটছে না। জনপ্রিয়তা নিয়েই প্রার্থীদের আসতে হবে। দলের বর্ধিত সভা হয়েছে। অংশগ্রহণমূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে চেহারা দেখে তিনি প্রার্থী মনোনয়ন দেবেন না। বর্ধিত সভায় পরিষ্কার বলেছেন, দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। যাকে প্রার্থী দেওয়া হবে, তাকে মেনে নিতে হবে। কিন্তু একটি নির্বাচনী হাওয়া যখন বইতে শুরু করেছে তখন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে পুলিশি অভিযান বিবেকবান মানুষকে ঝাঁকুনি দিয়েছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সব দলের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিবেশ অগ্রাধিকার পায়। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তথ্য মাঠ নেতাদের হাতে দেওয়া হয়েছে। মাঠ নেতাদের দায়িত্ব জনগণের হৃদয়, শেখ হাসিনার উন্নয়নের চিত্রকল্প দিয়ে জয় করার। নিজেদের আখের গোছানোর পথ থেকে সরে এসে মানুষকে সঙ্গে টানার। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণা করেছেন। সরকারি দল বলছে, তাদের কর্মসূচিকে অনুসরণ করা হয়েছে। মানুষের কল্যাণের জন্য যদি হয় রাজনীতি তাহলে উত্তম পথ গ্রহণ অন্যায় বা অপরাধ নয়। বিএনপি নেতা-কর্মীদের এখন উচিত এই দর্শনের প্রতি মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য তাদের অতীত ভুল ও ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চাওয়া, জনগণের হৃদয় জয় করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের আস্থা, বিশ্বাস ও আনুগত্যের জায়গাটি পরিষ্কার করা।

যাক, এর মধ্যে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জটিল রোগীর মৃত্যু ঘিরে যে ঘটনা ঘটেছে তা আমাকেই নয়; অনেককেই ব্যথিত করেছে, লজ্জিত করেছে। চিকিৎসকদের ওপর হামলা হয়েছে, ভুল চিকিৎসার অন্যায় অভিযোগ এনে মামলা হয়েছে। এটি কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। ঢাবির শিক্ষার্থী আফিয়া আক্তার চৈতী মে মাসের ১৭ তারিখ ভীষণ জ্বর ও কাশি নিয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালে যায় চিকিৎসার জন্য। জ্বরের সঙ্গে ব্যথা দেখে সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেন দেশবরেণ্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। সেদিনই পাওয়া রিপোর্টে দেখা যায়, চৈতীর হিমোগ্লোবিন ১১-এর ওপরে থাকার কথা থাকলেও ছিল ৪.৫০। শ্বেত রক্তকণিকা ১ লাখ ৩৭ হাজার যা স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে ১৫-২০ হাজার গুণ বেশি। প্লাটিলেট যেখানে ১৬ হাজার থাকার কথা, সেখানে দেড় লাখের ওপর। এর মানে যে কোনো সময় রক্তক্ষরণ হতে পারত। তার ব্লাড সেল ৯৯ শতাংশ অথচ ২০ শতাংশের বেশি থাকা মানে একিউট লিউক্যামিয়া বা রক্তের ক্যান্সার। ডেঙ্গু পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ হয়েছিল। মানে ডেঙ্গু হয়নি। অন্যান্য রিপোর্টে হাইপোক্যালেমিয়া অর্থাৎ পটাসিয়াম কম যার কারণ মাংস পেশির দুর্বলতাসহ হৃৎপিণ্ডের সমস্যা ছিল। এ ছাড়া এক্সরেতে নিউমোনিয়াও ধরা পড়ে। এ বি এম আবদুল্লাহকে আমিই নই, বাংলাদেশের সমাজসচেতন মানুষ মাত্রই জানেন তিনি নিরহংকারী, বিনয়ী উচ্চমানের চিকিৎসক যিনি রোগীকে সেবা করা ইবাদত মনে করেন। তিনি এমন এক মানুষ চাইলে পরিবার-সংসারসহ বিদেশের অত্যাধুনিক হাসপাতালের চাকরি নিয়ে আয়েশের জীবনযাপন করতে পারতেন। তিনি এমনই এক কিংবদন্তিতুল্য মেডিসিনের চিকিৎসক যার দেশপ্রেম, মানবপ্রেম সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। চিকিৎসা জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নিজেকে একজন ডাক্তারই নন; মানুষকে সেবাদান, রোগীকে সুস্থ করে তোলার সাধকে পরিণত হয়েছেন।

ঢাবির সেই শিক্ষার্থীকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার একদিনের মধ্যেই ব্লাড ক্যান্সার শনাক্ত করা তার পক্ষেই সম্ভব। একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে বিদেশেও তার সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় ধীরে ধীরে। এ বি এম আবদুল্লাহ মহান স্রষ্টার সেই সৃষ্টি যিনি সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সন্দেহ নিশ্চিত হয়েছেন একদিনের মধ্যেই। তিনি রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাসুদা বেগমের কাছে রেফার করেছিলেন। তারপর একিউট মাইলয়েড লিউক্যামিয়ার প্রাথমিক চিকিৎসা, কিছু পরীক্ষা এবং কয়েক ইউনিট প্লাটিলেট দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় হেমোটলোজি বিভাগের পক্ষে। কিন্তু এ প্রস্তুতি নিতে না নিতেই রোগীর শারীরিক অবস্থা অবনতি হতে থাকে। তাকে আইসিইউতে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকলে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এই রোগীর ইনিসিয়াল ডায়াগনসিস ক্যান্সারই ছিল। এ ধরনের ক্যান্সারের প্রাথমিক চিকিৎসা কেমোথেরাপি যেখানে শুরুই হয়নি, সেখানে ক্যান্সারের চিকিৎসা দিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ এনে চিকিৎসকদের ওপর হামলা ও মামলার ঘটনা গভীর দুঃখ ও বেদনার। ইব্রাহিম মেডিকেলের নাফিউল নয়ন নামের রোগীর সঙ্গে থাকা এক শিক্ষার্থীর ফেসবুকে দেওয়া ভুল তথ্যে চৈতীর সহপাঠীরা আবেগাপ্লুত হয়ে ক্ষোভে-দুঃখে সেন্ট্রাল হাসপাতালে এসে হামলা চালায়। একুশে পদকপ্রাপ্ত দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহকে এক নম্বর আসামি করা হয় মামলায়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আমজাদ আলীর বক্তব্যও ছিল মূর্খতার শামিল এবং উসকানিমূলক। একজন চিকিৎসক ভুল করে থাকলে আইন বিধিবিধান অনুযায়ী তা তদন্ত সাপেক্ষে সত্য উদঘাটন সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশের চিকিৎসা অনেক এগিয়েছে। নিউরোসার্জন নোমান খালেদ চৌধুরী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন, এদেশের রোগীরা বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাক, এ জন্য বড় মুনাফার বিনিয়োগ হয়ে থাকে। এটি খতিয়ে দেখা উচিত। আমাদের রোগীদের হার্ট, কিডনি, মেডিসিন এমনকি ক্যান্সার ও নিউরোর জন্য এখন বিদেশে যেতে হয় না। আমাদের জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, মেডিসিনের অধ্যাপক আবদুল খালেক চিরনিদ্রায় শায়িত। সেখানে মেডিসিনের অধ্যাপক আবদুল্লাহ অনেক বেশি বিনয়ী ও রোগীবান্ধব মমত্ববোধ নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বিদেশে তার লেখা ও প্রকাশনা চিকিৎসা শাস্ত্রের জগেক আলোকিত করেছে। আমাদের দেশের নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বড় চিকিৎসকই নন; মানবসেবার আধার হয়ে ছায়া দিচ্ছেন। আমাদের সামন্ত লাল আগুনে পোড়া মানুষদের জীবন রক্ষার উজ্জ্বল প্রতীক, আমাদের জাহাঙ্গীর, মোমিনুজ্জামানরা হৃদরোগীদের পরম আশ্রয়। ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর প্রতি এমন অবিচার গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের চিকিৎসা জগতে বিপ্লব ঘটে গেছে, সেই বিপ্লবের নায়কদের অন্যতম একজন আবদুল্লাহ। কথায় কথায় চিকিৎসকদের ওপর হামলা, হাসপাতাল ভাঙচুর গ্রহণযোগ্য নয়। যে কোনো অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণ হলে এটাই সত্য আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। কিন্তু আইন হাতে তুলে নেওয়ার ফিল্মি সুযোগ কাউকে দেওয়া যাবে না। সরকারকে এখানে কঠোর হতে হবে।