নীড় অর্থনীতি প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের স্বীকৃতি পাচ্ছে পাট

প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের স্বীকৃতি পাচ্ছে পাট

সোনালি আঁশ খ্যাত পাটের সুদিন ফিরছে শিগগিরই। বর্তমান সরকারের নানা উদ্যোগে এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে বিষয়টি। পাট দিবসের পর পাট রক্ষায় তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। এবার প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে পাট স্বীকৃতি পাচ্ছে। আর এ স্বীকৃতির পরই রফতানিতে ২০ শতাংশ নগদ ভর্তুকি পাবেন রফতানিকারকরা। এছাড়া মিলবে অল্প সুদে ঋণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরকার পাটের সুদিন ফেরানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে খুব শিগগিরই পাটের সুদিন ফিরবে। সূত্র জানায়, এপ্রিল মাসে পাটপণ্যকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যকরণ সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার আলোকে অবিলম্বে পাটপণ্যকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে ফের অনুরোধ জানানো হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৪ মে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মোঃ হায়দার আলী মোল্লা কৃষি মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি পাঠান। এতে পাটপণ্যকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।
গেল বছরের মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০ এর সফল বাস্তবায়ন উপলক্ষে সম্মাননা প্রদান এবং বহুমুখী পাটপণ্য মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, পাট কৃষিজাত পণ্য। অন্য সব পণ্য, যার সঙ্গে কৃষির একটু সম্পর্ক সেগুলোও কৃষিপণ্য হিসেবে বিশেষ সুবিধা পায়, আর পাট পায় না, এটা তো বোঝানো যায় না। আমি ঘোষণা দিতে চাই, আমাদের পাটপণ্য ও পাটকে আমরা কৃষিজাত পণ্য হিসেবেই বিবেচনা করব। বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি খাতে নগদ ভর্তুকির চিত্রে দেখা গেছে, বর্তমানে বৈচিত্র্যকৃত পাটজাত পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নগদ ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। পাটজাত চূড়ান্ত দ্রব্য (হেসিয়ান, সেকিং ও সিবিসি) ক্ষেত্রে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং পাট সুতার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ নগদ ভর্তুকি পেয়ে আসছেন রফতানিকারকরা। কৃষিপণ্য (শাকসবজি/ফলমূল) ও প্রক্রিয়াজাত (এগ্রোপ্রসেসিং) কৃষিপণ্য রফতানি খাতে রফতানি ভর্তুকি রয়েছে ২০ শতাংশ। পাটকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতির পর এ খাতেও ২০ শতাংশ রফতানিতে নগদ ভর্তুকি দেয়া হবে। ব্যাংক থেকে অল্প সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। তবে বর্তমানে পাটকাঠি থেকে উৎপাদিত কার্বন রফতানিতে ভর্তুকি রয়েছে ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি এম বারিক খান আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, পাটকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে এখন পর্যন্ত পাটের গুরুত্ব অপরিসীম। স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের একমাত্র অর্থকরী ফসল ছিল পাট। বাংলার পাটের আয় থেকেই সে সময়কার পাকিস্তান সমৃদ্ধ হতো। নানা কারণে পাটের ঐতিহ্য হারিয়ে যায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন এ পণ্যটি যে আসলে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এ বিষয়টি আমি গেল পাট বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সভায় উপস্থাপন করেছি। পাটকে মুক্তিযুদ্ধ পণ্য বা স্বাধীনতা পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলেছি। এটি বাস্তবায়ন হলে পাটকে কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ থাকবে না। তিনি বলেন, পাটকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা দীর্ঘদিনের। এটি এখন বাস্তবায়ন হওয়ার পথে। এতে যে শুধু ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন, সেটি সত্য নয়। কারণ পাটের সঙ্গে কৃষক জড়িত। কৃষক যদি পাট বিক্রি করতে না পারে, তাহলে তারা পাট চাষে আগ্রহী হবেন না। আর পাট বিক্রি করে যদি ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলেও তারা পাট চাষে আগ্রহ হারাবেন। একই সঙ্গে পাট কিনে যদি ব্যবসায়ীরা লাভবান না হন, তাহলে তারা এ ব্যবসায় থাকবেন না। পাটকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলে এ খাতের ভর্তুকির হার বাড়বে। ব্যাংক থেকে অল্প সুদে ঋণ পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে ‘পাটের লড়াই’র উদ্যোক্তা নাসিমূল আহসান বলেন, পাট প্রকৃত পক্ষেই কৃষিপণ্য। এটি মাঠের ফসল হলেও কৃষকের পণ্য এটি। ফলে কৃষিপণ্য হিসেবে পাটকে আরও আগেই ঘোষণা করা উচিত ছিল। যদিও দীর্ঘসময় পর পাট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, পাটের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে, সেহেতু এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। এর মধ্যে পাটের বাধ্যতামূলক মোড়কীকরণ, পাট দিবস উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, পাটের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত। পাটে সুযোগ-সুবিধা বাড়লে এসব মানুষেও ভাগ্যের পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে পাট যে এক সময় বাংলাদেশের সোনালি আঁশ ছিলÑ এটি আবার পুনর্জীবিত হবে। এদিকে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়নে ১৫ মে থেকে সড়ক, মহাসড়কে ১৭টি পণ্য উৎপাদন, বিক্রয় ও বিতরণ এলাকা এবং ঢাকাসহ সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়েছে। পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০-এর অধীনে গঠিত পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার বিধিমালা, ২০১৩ অনুযায়ী এতদিন ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনি পরিবহনে পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক ছিল। বিধিমালার তফসিলে আরও ১১টি পণ্য যুক্ত করে ২১ জানুয়ারি গেজেট জারি করে সরকার। সে পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনিয়া, আলু, আটা, ময়দা ও তুষ-খুদ-কুঁড়া।