৫০ শ্রবণপ্রতিবন্ধী বিনামূল্যে পাবে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সেবা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে আরও ৫০ শ্রবণপ্রতিবন্ধীকে বিনামূল্যে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সেবা দেয়া হবে। বার্ষিক কর্মসূচির আওতায় জুনের মধ্যেই এসব শ্রবণপ্রতিবন্ধী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এ সেবা পাবেন। বিশেষজ্ঞরা জানান, কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট একটি ব্যয়বহুল চিকিৎসা। শুধু কক্লিয়ার ডিভাইসের দাম ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা। বিদেশে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারি করতে ব্যয় হয় ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা। বিএসএমএমইউ সূত্র জানায়, এরই মধ্যে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে শিশুসহ ১৫২ জনের কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১২৮ জনকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট করা হয়। এদিকে শনিবার বিএসএমএমইউতে দুই দিনব্যাপী পঞ্চম কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারিবিষয়ক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কর্মসূচি পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল হাসনাত জোয়ারদার জানান, বধিরতা বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে বধিরতার হার শতকরা ৯ দশমিক ৬ ভাগ। দেশে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ মারাত্মক ধরনের বধিরতায় ভুগছেন, যারা সবাই কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের সম্ভাব্য প্রার্থী। বিশ্বজুড়ে প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে দুই শিশু বধিরতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। সে হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর ২ হাজার ৬০০ শিশু বধিরতা নিয়ে জন্মায় এবং প্রায় সমসংখ্যক জনগোষ্ঠী শ্রবণশক্তি নিয়ে জন্মালেও তাদের জীবদ্দশায় কোনো না কোনো সময়ে বধিরে পরিণত হয়।
অধ্যাপক আবুল হাসনাত জোয়ারদার বলেন, শৈশবে এবং বাল্যকালে শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা শিশুর মৌখিক ভাষার বিকাশ এবং মানসিক বিকাশকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে। শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশু বা ব্যক্তি পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে থাকে। তাই একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধীর দ্রুত শ্রবণ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মারাত্মক বধিরতা অথবা সম্পূর্ণ বধিরতা যেখানে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করেও কানে শোনা সম্ভব হয় না সেক্ষেত্রে এখন অন্তঃকর্ণেও কক্লিয়ায় স্থাপনযোগ্য জৈব ইলেকট্রনিক যন্ত্র কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট অত্যন্ত উপযোগী ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র যা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অন্তঃকর্ণে স্থাপন করতে হয়। এ ইমপ্লান্ট শ্রবণপ্রতিবন্ধীর জন্য এক আশীর্বাদস্বরূপ। এ ইমপ্লান্ট গ্রহণের মাধ্যমে একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শ্রবণের জগতে প্রবেশ করতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারি এখন বাংলাদেশেই হচ্ছে কিন্তু তা সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
অধ্যাপক আবুল হাসনাত জোয়ারদার আরও বলেন, ২০০৫ সালের আগে বাংলাদেশের হাতে গোনা তিন থেকে চারজন রোগী বিদেশে গিয়ে এ ইমপ্লান্ট সার্জারি করিয়েছেন। ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে ২৫টি ইমপ্লান্ট সার্জারি হয়। বাংলাদেশে বর্তমান বাজারে একটি কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের (ডিভাইস) মূল্য ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এছাড়া সার্জারি, হেবিলিটিশন থেরাপি ও বিবিধ খরচের গড়ে কমপক্ষে আরও লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়। এ ব্যয়বহুল চিকিৎসা সাধারণ মানুষের একেবারে নাগালের বাইরে ছিল। তাছাড়াও দেশে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট টেকনোলজি সহজলভ্য ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ডেভেলপমেন্ট অব কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট প্রোগ্রাম ইন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (প্রথম পর্যায়ে) নামে একটি কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ কর্মসূূচির মূল লক্ষ্য ছিল শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট ডিভাইস প্রদান করা, সার্জারি করে শ্রবণপ্রতিবন্ধীর কানে কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট স্থাপন করা, ইমপ্লান্ট-পরবর্তী সময়ে শ্রবণপ্রতিবন্ধীকে ভাষা বা কথা বলা শেখান এবং ইমপ্লান্ট বিষয়ে জনমত তৈরি করা ও টেকনোলজি আহরণ করা। এ পর্যন্ত সব কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিএসএমএমইউ হাসপাতালে সব অপারেশনও বিনামূল্যে করা হয়েছে। সব ইমপ্লান্ট গ্রহীতারা শুনতে ও কথা বলতে সক্ষম হচ্ছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ জিল্লার রহমান। সভাপতিত্ব করেন বিএসএমএমইউ ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রোভিসি (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ শহীদুল্লাহ সিকদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী আসগর মোড়ল প্রমুখ।
অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার মহানুভবতায় শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় বিএসএমএমইউতে অন্যন্য সাধারণ মহতী সেবা কার্যক্রম হলো কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারি কর্মসূচি। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী আছেন বলেই অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুরাও লাখ লাখ টাকার চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেয়েছে। এর ফলে আজ ওই সব শিশু শুনতে পারছে, কথা বলতে পারছে এবং তাদের মা-বাবার মুখে হাসি ফুটেছে। আজ আর এসব শিশু সমাজের বোঝা নয়।
বক্তারা বলেন, শিশুসহ ১৫২ জনের কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে। আরও ৫০ জনকে চলতি বছরের জুনের মধ্যেই কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট বরাদ্দ দেয়া হবে। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক বলেই অত্যন্ত দামি এ ডিভাইস সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে।