অদম্য ইচ্ছায় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে

শিক্ষার আলোয় বদলে যাচ্ছে শাপলার জীবন। দিনমজুর মা-বাবার ঘরে বেড়ে ওঠা শাপলার লেখাপড়াটা যেন নেশার মতো পেয়ে বসে। ছোটবেলায় অন্যের বাসায় কাজ করেও সামান্য সময়ের জন্য হলেও সে বই নিয়ে বসত। তার এই ইচ্ছাশক্তি তাকে যশোর জেলার সিংড়া থানার ইতালি গ্রাম থেকে তুলে এনেছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শাপলাকে এখন আর অন্যের বাসায় কাজ করতে হয় না। তবে টিউশনি করতে হয়। লেখাপড়ার পাশাপাশি বেঁচে থাকার জন্যে সকাল-সন্ধ্যা চলে তার নিরন্তর সংগ্রাম। বৃহস্পতিবার শাপলার সঙ্গে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে।

শাপলা বলেন, যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই দেখেছি পরিবারে অভাব আর অশান্তি। মা শুধু বলতেন পড়াশোনা করতে হবে। অভাবের মধ্যেও খেয়ে না খেয়ে লেখাপড়া করতাম। ৫ম শ্রেণিতে আমি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাই। সবাই খুশি হয়েছিল। মা বলতেন লেখাপড়া করলে আমাদের সংসারে সুখ আসবে। আর বাবাকে দেখতাম, কাজ করতেন না। মা হাঁস-মুরগি পালতেন, অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। এভাবেই আমাদের সংসার চলত। আমরা দুই বোন। বড় আপা লেখাপড়ায় খুব একটা ভালো ছিল না। মা আমাকে বলতেন তুমিই ভালো করে লেখাপড়া করো।

এরপর জেএসসি পরীক্ষায় আমাদের সিংড়া থানায় আমি প্রথম হলাম। তখন টিচাররাও নজর রাখা শুরু করলেন আমার ওপর। মা সুদে টাকা ধার নিয়ে আমার ফরম ফিলাপের টাকা দিতেন। অন্যের টাকায় আমাকে পড়তে হতো, এটা ভালো লাগত না। কিন্তু করার কিছুই ছিল না। টিচাররা বললেন. লেখাপড়াটা ছেড়ে দিও না। আমরা তোমাকে সাহায্য করব। তখন মাকে আর পড়ার জন্য টাকার কথা বলতাম না। হয়তো ক্লাসের কোনো বান্ধবীকে বলতাম, আমাকে কিছু টাকা ধার দাও আমি শোধ করে দেবো। ২০১৩ সালে এসএসসি পাস করি জিপিএ-৪.৮৮ পেয়ে। এইচএসসিতে টিউশনি করে নিজের লেখাপড়া চালাই। উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করি। এরপর বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমার চান্স হলো। সবাই অনেক খুশি, কিন্তু আমার চিন্তা হতে লাগল, ঢাকায় কোথায় গিয়ে থাকব, কী করে সেখানে চলব। আমাদের এক আত্মীয়ের বাসায় এসে উঠলাম। তারা অনেক কথা শোনালো। আরো বলে ‘তুমি গরিবের মেয়ে, ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ার ইচ্ছে হলো কেন? বাড়ি চলে যাও। কিন্তু আমি দমে না গিয়ে একজনের নিকট থেকে সুদে ১২ হাজার টাকা ধার নিলাম ভর্তির জন্য। ভর্তির পর এখানকার এক শিক্ষকের সহযোগিতায় একটি হলে আমার সিট হয়ে গেল।

কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার সময় নেওয়া ১২ হাজার টাকা সুদে-আসলে ৩০ হাজার টাকা হয়ে গেল। এই টাকার জন্য অনেক খারাপ আচরণ করেন লোকটি। তখন ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ওই লোকের ধার শোধ করি। এখন ব্যাংকে আমার প্রতিমাসে আড়াই হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। ব্যাংকের কিস্তির টাকা, বাবা-মায়ের খাবারের টাকা, দাদির ওষুধের টাকা এসব দেওয়ার পর আমার হাতে থাকে দেড় থেকে ২ হাজার টাকা। হলে খেতে মাসে লাগে ৩ হাজার টাকা। তাই রান্না করে খাই। দুটো টিউশনি থেকে পাই ৫ হাজার টাকা। আর অ্যালামনাই থেকে বৃত্তি হিসেবে পাই ৩ হাজার টাকা। এভাবে কষ্টেসৃষ্টে এগিয়ে চলছে আমার পড়াশোনা। কিন্তু আমি হাল ছাড়তে চাই না। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।