হাইব্রিড ব্রি-৫ জাতের ধানচাষ করে সফল গোপালগঞ্জের জালাল শেখ

দেশের মধ্যে এবারই প্রথম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বাংলাদেশ রাইস রিসার্স ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত হাইব্রীড ব্রি-৫ জাতের ধানের চাষ করা হয়েছে। এ ধানের চাষ করে সফল হয়ছে গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ার কৃষক জালাল শেখ। এতে অধিক ফল হওয়ায় খুশি তিনি। উচ্চ ফলনশীল এ হাইব্রিড ধান চাষের ফলে একদিকে যেমন ফলন বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে বীজও উৎপাদন করে কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। কৃষি বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দেশে যেসব হাইব্রিড ধানের চাষ করা হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ব্রি-৫ জাতের ধানের। এ ধানের সফল চাষ করায় অন্যান্য কৃষকেরাও আগামীতে এ জাতের ধানের চাষের আগ্রহ দেখিয়েছেন।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার সরদারপাড়া গ্রামের জালাল শেখের জমিতে গিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ রাইস রিসার্স ইনষ্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবন করে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ব্রি-৫ জাতের ধান। জাতীয় বীজ বোর্ড থেকে অনুমোদন পেয়ে চালানো হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এর প্রায় এক বছর পর প্রথমবারের মত গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার সরদারপাড়া গ্রামের জালাল শেখের ২ বিঘা জমিতে আবাদ করা হয়। জমির দুই পাশের এক পাশে করা হয় ধানের আবাদ। অন্য পাশে ধান থেকে করা হচ্ছে বীজ উৎপাদন। আর জমিতে ফলনও হয়েছে ভাল। প্রথমবারের মত নিজ জমিতে ব্রি-৫ জাতের ধানের চাষ করে সফল হওয়ায় খুশি জালাল শেখ। দেশী ও বিদেশী যেকোন হাইব্রিড ধানের থেকে এর উৎপাদন বেশী হওয়ায় এবং এ ধান থেকে কৃষক নিজেই বীজ উৎপাদন করতে পারায় কৃষকরা এ জাতের ধান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
দেশীয় আবহাওয়ায় উদ্ভাবিত বিধায় এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশী এবং এ জাতের স্থানীয়ভাবে বীজ উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক। হেক্টর প্রতি উৎপাদন ৯ টন বা একরে ৯০ মণ। মাত্র ১শ ৪৫ দিন জীবনকাল হওয়ায় কৃষকেরা স্বল্প সময়ের মধ্যেই ধান ঘরে তুলতে পারবেন। সেই সাথে চাল চিকন ও ভাত ঝরঝরে হবে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার হাইব্রিড ধানের বীজ আমদানী হয়ে থাকে বাংলাদেশে। বিদেশ থেকে আমদানীকৃত বীজ থেকে ফলন ভাল না হলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকেরা। ব্রি-৫ জাতের ধান থেকে প্রয়োজনমত হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদন করলে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষাসহ অর্থিক লাভবান হবেন তারা।
এদিকে বুধবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ব্রি-৫ ধানের চাষ ও বীজ উৎপাদন বিষয়ক মাঠদিবস অনুষ্ঠিত হয়। গাজীপুর ধান গবেষনা ইন্সটিটিউটের (ব্রি) আয়োজনে শেখ রাসেল শিশুপার্ক সংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত এ মাঠ দিবসে প্রধান অতিথি ছিলেন গাজীপুর ধান গবেষনা ইন্সটিটিউটের পরিচালক ড. মোঃ শাহজাহান কবীর। এসময় ভাঙ্গা ধান গবেষনা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মাদ আমির হোসেন, বরিশাল ধান গবেষনা ইন্সটিটিউটের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ আলমগীর হোসেন, গাজীপুর ধান গবেষনা ইন্সটিটিউটের উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ খায়রুল আলম ভুইয়া ও পিরোজপুর-গোপালগঞ্জ-বাগেরহাট সমন্বিত প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. প্রিয়লাল বিশ্বাস। কৃষকদের ব্রি-৫ জাতের ধান চাষের পদ্ধতি ও এ জাতের ধানের বীজ উৎপাদনের কলাকৌশল ও গুনাগুন সম্পর্কে বিশেষ ধারনা দেওয়া হয়। এতে এলাকার শতাধিক কৃষক অংশ নেন। পরে জমি থেকে ধান কাট হয় এবং মাড়াই করে ফলন পরিমাপ করা হয়।
কৃষক জালাল মোল্যা জানান, ব্রি-র কর্মকর্তারা এসে আমাকে হাইব্রিড ব্রি-৫ জাতের ধানের চাষ করতে বলেন। এতে খুব ভাল ফলন পাবো বলে তারা জানান। তাদের কথা মত আমি নিজের দুই বিঘা জমিতে ব্রি-৫ জাতের ধানের চাষ করি। ধানের খুব ভাল ফলন হয়েছে। আগামীতে আমি আমার সব জমিতেই এ জাতের ধানের চাষ করব। ভাল ফলন হওয়ায় অনেক কৃষকই আমার জমিতে ধান দেখতে আসছেন। তারাও আগামীতে এ জাতের ধানের চাষ করবে বলে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
অপর কৃষক বাকা শেখ জানান, ব্রি-৫ জাতের ধানে অধিক ফলন হয়েছে। এ ধানের চাষ করলে আমারা লাভবান হব। আগামীতে আমি আমার জমিতে ব্রি-৫ জাতের ধানের আবাদ করব। আশাকরি এলাকার অন্যান্য কৃষককরাও আগামী বোরো মৌসুমে এ জাতের ধানের চাষ করবেন।
ফরিদপুরের ভাংগার ব্রি অফিসের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ আমির হোসেন জানান, ব্রি-৫ জাতের ধানটি বোর মৌসুমের একটি উপযোগী জাত। দেশীয় আবহাওয়ায় উদ্ভাবিত বিধায় এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশী এবং এ জাতের স্থানীয়ভাবে বীজ উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক। এ ধানের গড় জীবন কাল মাত্র ১৪৫ দিন। কৃষকেরা চাষ করলে এর গড় ফলন হবে একরে ৯০ মণ বা হেক্টরের ৯ টন। এজাতের ধানে চাল চিকন ও ঝরঝরে হয়। ফলে এ জাতটি কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় জয়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি।
পিজিবি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. খায়রুল আলম ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশে অনেক এক ফসলি জমি রয়েছে। এসব জমিতে একটু ভালমত কষ্ট করে ফলন ফলাতে পারলে অন্য ধান থেকে ফলন অনেক বেশি আসবে। এ ধানের চাল চিকন হওয়ায় কৃষকেরা বিক্রি না করে নিজেরাই খেতে পারবেন। এতে কৃষকেরা একদিকে নিজের পরিবারের জন্য সারা বছর চালের যোগান দিতে পারবেন অন্য দিকে বিক্রি করেও লাভবান হবেন।
বরিশালের ব্রি-র মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ আলমগীর হোসেন বলেন, চালের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হাইব্রিড জাতের ধানের বীজ উৎপাদন আমাদের দেশেই করতে হবে। সেসব বীজ উৎপাদন কোম্পানী বাইরে থেকে বীজ আমদানী না করে আমাদের এখান থেকে বীজ নিয়েই কৃষকদের সাথে করে বীজ উৎপাদন করবে বলে আশা করেন তিনি।
গাজিপুর ব্রি-র উর্দ্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ড. প্রিয়লাল বিশ্বাস বলেন, ব্রি-৫ জাতের ধান দিয়ে আমার যদি চাষি পর্যায়ে বীজ উৎপাদন দেখাতে পারি যে চাষিরাও বীজ উৎপাদন করতে সক্ষম। সেই সাথে এ বীজ দিয়ে সরাসরি ধান উৎপাদন সক্ষম তাহলে এ জাতের ধানটি জনপ্রিয়তা লাভ করবে এবং অন্যান্য কৃষকেরা চাষ করতে আগ্রহ দেখাবে।
বাংলাদেশ রাইস রিসার্স ইনস্টিটিউট (ব্রি) গাজীপুরের পরিচালক (প্রশাসন ও সাধারন পরিচর্যা) ড. মোঃ জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ রাইস রিসার্স ইনষ্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবন করে ব্রি-৫ জাতের হাইব্রিড ধানটি। এবছরই প্রথম মাঠে চাষ করা হয়েছে। এধরনের জাতের ধানগুলো আমাদের দেশের আবহাওয়ার উপর ভিত্তি করে উদ্ভাবন করা হয়েছে। চীন থেকে আমদানী করা বীজগুলো চীনের আবহাওয়ার উপর ভিত্তি করে উদ্ভাবন করা হয়। যে কারণে এদেশের পরিবেশে আসার পর বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। কৃষকদের বিনামূল্যে এর বীজ ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট প্রদান করছি। এজন্য সরকারকে বিদেশে কোন রয়্যালটি দিতে হবে না।
তিনি আরো বলেন, এ ধানের আবাদ যদি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিভিন্ন কোম্পানীর বিদেশী হাইব্রিড ধানের বীজ আমদানী হ্রাস পাবে। সেই সাথে নিজের উৎপাদিত বীজ দিয়ে ধান চাষ করলে কৃষকেরা লাভবান হবেন।