যোগাযোগ সম্ভাবনার দিগন্ত এগিয়ে চলেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেললাইন প্রকল্পের কাজ

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পর্যটকদের যাতায়াতের সুবিধা, বনজ ও কৃষি পণ্যসামগ্রী পরিবহনের সুবিধার্থে এই রেললাইন স্থাপনের চেষ্টা ছিল দীর্ঘদিন ধরেই। এ চেষ্টায় দীর্ঘ দুই যুগের অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুনধুম রেলওয়ের যোগাযোগ প্রকল্প। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পর্যটন শহর কক্সবাজার রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। এতে সৈকত নগরীর পর্যটনশিল্পের যেমন বিকাশ ঘটবে, তেমনি বিস্তৃত হবে সেখানকার ব্যবসা-বাণিজ্যও। তাছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেললাইন স্থাপিত হলে যোগাযোগসহ দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এবার আর মিটারগেজ সিঙ্গেল লাইন নয়, ব্রডগেজসহ ডুয়েল লাইনের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে এ প্রকল্পটি। বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুরু করেছে এ প্রকল্পের কাজ। রেলের মহাপরিচালক (ডিজি) মো আমজাদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার এবং কক্সবাজারের রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ প্রকল্প দুই ধাপে বাস্তবায়ন হবে। প্রথম ধাপে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় ধাপে কক্সবাজারের রামু থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা হবে। এটি নির্মাণে প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। স্থানীয় ও রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন রেললাইন স্থাপনের জন্য কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাওয়ায় আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে বহুল প্রতীক্ষিত এ প্রকল্প। এতে কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। কয়েক বছর আগেও এখানকার মানুষের মাঝে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। বর্তমানে প্রতীক্ষিত এই রেললাইন নির্মাণকাজের কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়ায় আশায় বুক বাঁধছেন তারা। ডুয়েল গেজের রেললাইনটি স্থাপনের মধ্য দিয়ে পাল্টে যাবে এখানকার অর্থনৈতিক চিত্র। আমূল পরিবর্তন ঘটবে যোগাযোগ ব্যবস্থার। তাছাড়া রেললাইন স্থাপনের জন্য তৈরি নকশায় কক্সবাজারের চকরিয়ার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বহু-ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা সরিয়ে নিতে কাজ শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা পরিষদ সদস্য কমর উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কক্সবাজারবাসীর শত বছরের লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে প্রতীক্ষিত রেললাইন স্থাপনের মধ্য দিয়ে। দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেললাইন প্রকল্পটি ইতিমধ্যে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে কক্সবাজারবাসীর। তাছাড়া এ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হলে প্রতি বছরে প্রায় ২০ লাখ যাত্রী রেলে চলাচলের সুযোগ পাবেন বলে জানান তিনি। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেললাইনের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো মফিজুর রহমান বলেন, এ রেললাইনের কাজটির কার্যক্রম দ্রুত করতে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর দরপত্র দাখিল করা হয়েছে। এর আগে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর মূল কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। দাখিলকৃত কাগজপত্র কারিগরি মূল্যায়নের বিষয়ে মতামতের জন্য চলতি বছরের ১৯ মার্চ এডিবিতে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত এ মতামত পাওয়া যাবে।

প্রকল্পে যা আছে : দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এবং রামু হতে ঘুনধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটারসহ মোট ১২৮ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ। পর্যটন শহর কক্সবাজারকে রেলওয়ের নেটওয়ার্কের আওতায় আনা। পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তন। এ ছাড়া সহজে ও কম খরচে মাছ, লবণ, কাগজের কাঁচামাল, বনজ ও কৃষিজ দ্রব্যাদি পরিবহন এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডর মিসিং লিংক নির্মাণ। দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ৮৮ কিমি রামু থেকে কক্সবাজার ১২ কিমি এবং রামু থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত ২৮ কিমি রেলপথ নির্মাণের কথা রয়েছে। আর ১২৮ কিমি রেলপথে স্টেশনের সংখ্যা থাকছে ৯টি। এগুলো হলো সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়ার সাহারবিলের রামপুর, ডুলাহাজারা, ঈদগাঁও, রামু, কক্সবাজার, উখিয়া ও ঘুনধুম। এতে কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলক সিগন্যাল সিস্টেম ৯টি ও ডিজিটাল টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম থাকবে ৯টি। সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মাণ করা হবে সেতু। এ ছাড়া ৪৩টি মাইনর সেতু, ২০১টি কালভার্ট, সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া এলাকায় একটি ফ্লাইওভার, ১৪৪টি লেভেল ক্রসিং এবং রামু ও কক্সবাজার এলাকায় দুটি হাইওয়ে ক্রসিং নির্মাণের উল্লেখ রয়েছে প্রস্তাবিত প্রকল্পে। রেল মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে সূত্র জানায়, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য ১৯৫৮ সালে জরিপ চালানো হয়েছিল। এরপর ১৯৭১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্রস্তাবিত রেললাইনটির ট্রাফিক সম্ভাবনা ও সমীক্ষা চালায় জাপান রেলওয়ে কারিগরি সার্ভিস (জেআরটিএস)। দেশ স্বাধীনের পর প্রকল্পটি আটকে যায়। ২০০১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে আরেক দফা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হয়। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে (একনেক) চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার এবং কক্সবাজারের রামু থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত রেলপথ ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন হয়।

প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৯১ কোটি। চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হয়েছিল। রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার, রামু থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার এবং রামু থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ১২৮ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া; কক্সবাজারের চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগাহ, রামু, সদর ও উখিয়া এবং নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুম স্টেশন নির্মাণের কথা রয়েছে। কিন্তু রামুতে নতুন সেনানিবাস হওয়ায় রামু-ঘুনধুম রেলপথ নির্মাণকাজ আপাতত থেমে গেছে। এখন কেবল দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ ও অবকাঠামো নির্মিত হবে। আরও জানা যায়, প্রথমে মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণ করার এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি ৩৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। কিন্তু পরে রেললাইনের নকশায় (মিটারগেজ ও ব্রডগেজ দুটিই থাকবে) পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। পরের ধাপে অর্থাৎ গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকের আগে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ২৫৮ কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। গত বছরের এপ্রিলে প্রকল্প ব্যয় আরও বেড়ে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় স্থির হয়।