সৌদি আরবকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয়ায় ঢাকা রিয়াদ সম্পর্ক বাড়ছে

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে আইএসবিরোধী সামরিক জোটে অংশগ্রহণ, সৌদি-ইরান প্রশ্নে সৌদিকে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন, ইয়েমেনে শিশু নিহতের ঘটনায় জাতিসংঘে সৌদিকে সমর্থন ইত্যাদিতে বাংলাদেশ সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে দেশটির কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব ধীরে ধীরে বাড়ছে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে আইএসবিরোধী সামরিক জোটের বিষয়ে ২০১৫ সালের শেষ দিকে সমর্থন দিয়েছে বাংলাদেশ। আইএসবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রমে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব একযোগে কাজ করবে বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। আইএসবিরোধী জোটে থেকে সন্ত্রাস প্রতিরোধে ইনফরমেশন বিনিময়, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি কাজে যুক্ত থাকবে বাংলাদেশ। তবে সৌদি আরবে পবিত্র মসজিদ রক্ষার জন্য অতীতের মতো ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সৌদি জোটে বাংলাদেশ সৈন্য পাঠাবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এমন সুস্পষ্ট বার্তা দেয়ায় সৌদি আরব বাংলাদেশের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা ও সন্তোষ প্রকাশ করে। ইতোমধ্যেই সামরিক জোটে ৪১ দেশ যোগ দিয়েছে। সামরিক জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে বাংলাদেশ প্রথম থেকেই অনেকটা তাড়াহুড়ো করেই এই জোটে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেয়। সে কারণে সৌদি আরব বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে শুরু করে। যদিও সৌদির নেতৃত্বাধীন এই জোট এখনও বিশেষ কোন ধরনের সফলতা দেখাতে পারেনি।

এছাড়া গত বছরের শুরুতে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে সৌদিকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয় বাংলাদেশ। বিশেষ করে ইরানে সৌদি আরবের দূতাবাসে হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল ঢাকা। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেজন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ইরান সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছিল ঢাকা। সে সময় ইরানের রাজধানী তেহরানের সৌদি দূতাবাস ও দেশটির মাশহাদ শহরের কনস্যুলেটে হামলা চালানো হয়। সৌদিতে শিয়া নেতা নিমর আল নিমরের মৃত্যুদ- কার্যকরের জেরে শিয়া অধ্যুষিত ইরানে ওই হামলার ঘটনা ঘটেছিল। হামলার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এরই মধ্যে সুন্নি অধ্যুষিত কয়েকটি মুসলিম দেশ ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন করে। তবে সে সময় বাংলাদেশ সরকার বিবৃতির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ওই হামলা কূটনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি ভিয়েনা কনভেনশনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই চুক্তি অনুযায়ী কোন দেশে অবস্থিত দূতাবাস বা মিশনের নিরাপত্তার দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের। এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেজন্য ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল বাংলাদেশ।

ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী প্রতিরোধে সৌদি আরবের নেতৃত্বে জোটের হামলায় প্রায় এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৪০০ শিশু নিহত হয়েছে। শুধু ২০১৫ সালেই সেখানে মারা যায় ৫১০ শিশু। সেখানে শিশু নিহতের ঘটনায় জাতিসংঘ সৌদি আরবকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। তবে বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি দেশ এর প্রতিবাদ জানালে সৌদি আরবের নাম কালো তালিকা থেকে বাদ দেয় জাতিসংঘ। এসব কারণে সৌদি আরব বাংলাদেশকে এখন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর ৩-৭ জুন পাঁচ দিন সৌদি আরব সফর করেন। সৌদি আরব সফরকালে বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিজের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের মধ্য দিয়ে আরও গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সৌদি আরবের গভীর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে এই জামায়াতে ইসলামী সৌদি আরবকে ম্যানেজ করার জন্য ব্যাপক লবিং চালিয়েছিল। তবে সেই লবিংয়ে কোন কাজ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত বছর রিয়াদ সফরকালে সৌদি বাদশার সঙ্গে বৈঠকে যুদ্ধাপরাধ ইস্যু নিয়ে কোন আলোচনাই হয়নি। শেখ হাসিনার সৌদি সফরের সময় এ নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে সৌদি আরবের সমর্থন রয়েছে বলেই ধরে নেয়া হয়।

আশির দশক থেকেই বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের সখ্য গড়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সৌদি আরব অর্থ সহায়তা দিয়েও আসছে। বিশেষ করে ওয়াহাবী মতাদর্শের প্রতি অনুগত হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক গভীর হয়। এই সম্পর্কের কারণেই যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে সৌদি আরবে জোর তৎপরতা চালিয়ে আসছিল জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে চাপে রাখার জন্য সৌদি আরবের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে আসছিল দলটি। তবে গত বছর শেখ হাসিনার সৌদি সফরের মধ্যে দিয়ে আরও স্পষ্ট হয় যে, সৌদি আরবের প্রতি জামায়াতের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসছে।

উইকিলিকসে প্রকাশিত এক নথিতে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে একাধিকবার জামায়াতে ইসলামী সৌদি আরবের হস্তক্ষেপ আশা করেছিল। এছাড়া রাজনৈতিক সংকট সমাধানে বিএনপিও সৌদির মধ্যস্থতা চেয়েছিল। তবে সৌদি আরব তাতে সাড়া দেয়নি। ঢাকার সৌদি দূতাবাস থেকে রিয়াদে পাঠানো একাধিক কূটনৈতিক বার্তায় এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমেই সুস্পষ্ট হয় যে, সৌদি আরবের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক গভীর ছিল। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকে অপপ্রচার চালানো হয়, সৌদি আরব এই বিচারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে বলেও অপপ্রচার চালানো হয়। তবে গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌদি আরব সফরের মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সেসব অপপ্রচার এখন মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। কেননা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাদরে গ্রহণ করে সৌদি আরব।

সৌদি শূরা কাউন্সিলের স্পীকার ড. আবদুল্লাহ বিন মোহাম্মাদ বিন ইব্রাহিম আল শেখ গত বুধবার চারদিনের সফরে ঢাকা এসেছিলেন। এই সফরের প্রথম দিনেই তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে আগামী ২১ মে রিয়াদে ‘আরব ইসলামিক আমেরিকা সামিটে’ অংশগ্রহণের জন্য সৌদি বাদশার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২০ মে সৌদি আরব সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই সফরের মধ্যে দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।

তবে শ্রম বাজারের দিক থেকে সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দেশ। সৌদি আরবে প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশী কর্মী কাজ করছেন। দেশটির শ্রম বাজারে আধা দক্ষ ও দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ সৌদিতে আরও বেশি হারে জনশক্তি রফতানি করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌদি আরব সফরকালে সাইড লাইন বৈঠকে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ প্রভাবশালী দেশ হিসেবে বিবেচিত। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব। দেশটিকে পাশ কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোন দেশ সাধারণত কিছু করতে পারে না। তাই বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের গভীর সম্পর্কের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর ওপরও বাংলাদেশের প্রভাব বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন সৌদি আরব সফরের মধ্য দিয়ে বিনিয়োগ ও অন্যান্য সহযোগিতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া গত কয়েক বছরে ঢাকা ও রিয়াদের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ ও শক্তিশালী হয়েছে।