পাখির গানে স্বপ্নপূরণ

বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত জাহিদ হোসেন (৩০) একটি চাকরির সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেক জায়গা। লেখাপড়া কম, তাই কোথাও মেলেনি কাজ। নিরুপায় হয়ে মাত্র ৪ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২০১৬ সালের মে মাসে শুরু করেন কোয়েল পাখি পালন। সেই থেকে ঘুরতে শুরু করল জাহিদের ভাগ্যের চাকা। এলাকায় কোয়েল পাখি ও ডিমের ভালো চাহিদা থাকায় অল্প সময়ে লাভের মুখ দেখেন তিনি। বর্তমানে জাহিদের রয়েছে কোয়েল খামার নামে একটি পাখির খামার।

এই কোয়েল খামারের মালিক হলেন দীঘিনালার জাহিদ হোসেন। পাখির ডানায় ঘুরল জাহিদ হোসেনের ভাগ্যের চাকা। কোয়েল পাখি পালন করে এখন স্বনির্ভর জাহিদ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জাহিদ হোসেন এখন লাখপতি।

শুধু তাই, জাহিদ এখন এলাকায় ক্ষুদে বিজ্ঞানী হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন। কারণ কোয়েল পাখির ডিমে তা দেওয়ার ইনকিউবেটরটা জাহিদ নিজেই বানিয়েছেন।

বর্তমানে জাহিদের খামারে কোয়েল পাখি ছাড়াও রয়েছে ময়ূরপঙ্খি কবুতর, মুংখি কবুতর, সাটিং কবুতর, নান কবুতর, রেছাহুয়া কবুতর, বাজরিগা (ইংলিশ), বাজরিগা (বাংলা), লাভবার্ড, ভারতীয় মুনিয়া পাখি, হল্যান্ডের ঘুঘু, জাপানি সাদা শিলকী ঘুঘু, ডগি ঘুঘু ও পাকিস্তানি তিতিসহ দেশি-বিদেশি হরেকরকম পাখি। শুরু করেছেন খরগোশ পালন। বাড়ির পাশে একটি খোলা জায়গায় গড়ে তুলেছেন খরগোশের খামার। এখন আর জাহিদ হোসেনের পেছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই। সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে যাওয়ার পালা।

সরেজমিন দেখা যায়, হরেকরকম পাখির কলকাকলিতে মুখর জাহিদের কোয়েল খামার। পাখিপ্রেমী জাহিদ ব্যস্ত খামারের কাজে। খামারের বাইরে কোয়েল পাখির ডিমের জন্য অপেক্ষা করছেন মানুষ। খামারের কাজে জাহিদের একমাত্র সহযোগী তার স্ত্রী সাথী বেগমও ব্যস্ত নানা কাজে। বর্তমানে জাহিদের খামারে ১১ শতাধিক কোয়েল পাখি রয়েছে। প্রতি জোড়া কোয়েল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। প্রতিদিন খামার থেকে সংগ্রহ করা হয় কোয়েল পাখির পাঁচ শতাধিক ডিম। প্রতিটি ডিম বিক্রি হয় তিন টাকা করে। বিদেশি পাখিরও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। এক জোড়া ময়ূরপঙ্খি কবুতর ৩ হাজার টাকা, মুংখি কবুতর ১,৫০০ টাকা, সাটিং কবুতর ২,৫০০ টাকা, নান কবুতর ২,১০০ টাকা, রেছাহুয়া কবুতর ২,১০০ টাকা, তিতি পাখি এক জোড়া ৩ হাজার টাকা, হল্যান্ডের ঘুঘু জোড়া ১,৮০০ টাকা, জাপানি সাদা ঘুঘু জোড়া ১,৫০০ টাকা, ডগি ঘুঘু জোড়া ৮০০ টাকা, বাজরিগা (ইংলিশ) জোড়া ৪ হাজার টাকা, বাজরিগা (বাংলা) জোড়া এক হাজার টাকা ও লাভবার্ড পাখি জোড়া বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়। জাহিদ হোসেন জানান, তিনি ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব পাখির বাচ্চা সংগ্রহ করেন। এক জোড়া খরগোশের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা এবং এক জোড়া বড়

খরগোশ

বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা করে। জাহিদ হোসেন নিজেই এখন উৎপাদন করছেন কোয়েল পাখির বাচ্চা। ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটানোর কাজে ব্যবহার করছেন নিজের তৈরি ইনকিউবেটর। এই ইনকিউবেটর নিয়ে উপজেলা বিজ্ঞান মেলায় অংশগ্রহণ করে জাহিদ আত্মপ্রকাশ করেছেন ক্ষুদে বিজ্ঞানী হিসেবে।

থানাপাড়া গ্রামের ফরিদ আহাম্মদের সংসারে চার সন্তানের মধ্যে জাহিদ হোসেন সবার বড়। লেখাপড়ায় মেধাবী হলেও পরিবারের অভাবের কারণে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করতে পেরেছেন।

জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত হয়ে একটি কাজের সন্ধানে রাস্তায় রাস্তায় অনেকদিন ঘুরেছি। আমার কপালে কোথাও কোনো কাজ জুটেনি। শেষ পর্যন্ত কোয়েল পাখি আমার ভাগ্য ফেরাল।’

জাহিদের খামারের সহযোগী ও তার স্ত্রী সাথী বেগম বলেন, তাদের অনেক পরিশ্রমের ফলে অভাবের সংসারে এখন সুখের পরশ লেগেছে। অথচ বছর খানেক আগেও সুখ ছিল নাগালের বাইরে। তিনি আরও বলেন, ‘আর্থিক সমস্যার কারণে আমার স্বামীর ইচ্ছা থাকলেও লেখাপড়া করতে পারেনি। তাই আমাদের ছেলে ও মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’

তিনি আরও জানান, জাহিদ পাখি সংগ্রহ করতে এলাকার বাইরে থাকলে খামারের পুরো দায়িত্ব তাকেই পালন করতে হয়। নানা প্রকার পাখির কলকাকলিতে কখন সময় চলে যায় বুঝতেও পারেন না।

এদিকে ছেলের সাফল্যে খুশি জাহিদের বাবা ফরিদ আহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘অভাবের কারণে জাহিদকে লেখাপড়া করাতে পারিনি। পারিনি টাকা-পয়সা দিয়ে কোনো ব্যবসা ধরিয়ে দিতে। তারপরও পরিশ্রমী জাহিদ নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নিয়েছে। বাবা হিসাবে সন্তানের এই সাফল্যে সুখ অনুভব করছি। দোয়া করছি নিজের পরিশ্রমে গড়ে তোলা এই পাখির খামারের মাধ্যমে জাহিদ হোসেন আরও এগিয়ে যাক।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জহুর লাল চাকমা জানান, ‘প্রতিটি ঘরে জাহিদ হোসেনের মতো পরিশ্রমী সন্তান থাকলে দেশের যুবসমাজ বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে বেশি দিন সময় লাগবে না।’