মসলার উৎপাদন ২০ বছরে আট গুণ

রসনাবিলাসী বাঙালির রসুইঘর ভরে থাকে নানা মসলার ঘ্রাণে। রান্নায় স্বাদ বাড়াতে ব্যবহার করা হয় নানা জাতের মসলা। দেশে প্রায় ৫০ ধরনের মসলা ব্যবহার হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন এসব মসলার চাহিদার বেশির ভাগটাই পূরণ করা হতো আমদানির মাধ্যমে। তবে দিন বদলেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সারা বছর যে পরিমাণ মসলা ব্যবহার হয় তার ৬০ শতাংশ এখন দেশেই উত্পাদিত হচ্ছে। গত ২০ বছরে দেশে মসলার উত্পাদন বেড়েছে আট গুণ। যদিও বেশ কিছু জাতের দামি মসলা এখনো আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। আবার অবৈধ পথেও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে হরেক মসলা। এ ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর আরো সুযোগ থাকলেও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, দেশে মসলার বাজার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার। এ ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থানীয়ভাবে মসলার উত্পাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য তাঁরা গবেষণা ও উদ্ভাবন জোরদারের পাশাপাশি এ খাতে ব্যাংকের অর্থায়ন সহজলভ্য করার পক্ষপাতী।

বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, দেশে যেসব মসলার ব্যবহার হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আদা, হলুদ, মরিচ, রসুন, পেঁয়াজ, কালোজিরা, গোলমরিচ, জাউন, শলুক, মৌরি, পেস্তাবাদাম, জয়ফল, জয়ত্রি, ভ্যানিলা, লবঙ্গ, ডালফিরিঙ্গি, রাঁধুনি, আলুবোখারা, বিলাতি ধনিয়া, ধনিয়া, চিপস, সাদা এলাচ, কালো এলাচ, দারচিনি, জাফরান, তেজপাতা, জিরা, মেথি, শাহি জিরা, পার্সলে, কাজুবাদাম, পানবিলাস, দইং, কারিপাতা, পাতা পেঁয়াজ, লেমনগ্রাস, ভাদুরি পাতা, পুদিনা, কিশমিশ, অলস্পাইস, শটি, আমআদা, চৈঝাল ও একানি উল্লেখযোগ্য।

জানা গেছে, একটা সময় জিরার বাজার পুরোটাই ছিল চোরাই পথে আমদানির ওপর। তবে এখন বৈধ পথে আমদানির পরিমাণ বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চাহিদা পূরণের কাছাকাছি। দেশে বছরে ১৫ হাজার টন জিরার চাহিদা রয়েছে। জিরার বৈধ বাজারও এখন প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, চাহিদার বিপরীতে ২০১২-১৩ অর্থবছরে জিরা আমদানির পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৮৭৮ টন। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আমদানি হয় পাঁচ হাজার ৭৩২ টন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সাত হাজার ৫৫৩ টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আমদানি ৭৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ২৪২ টনে। তবে জিরা চাষের ওপর জোর দেওয়া হলে আমদানির পরিমাণ ধীরে ধীরে আরো কমিয়ে অনা যেত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বগুড়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ মসলা গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার মসলার বাজার তৈরি হয়েছে। সারা বছর যে পরিমাণ মসলা ব্যবহার হয় তার ৫৮-৬০ শতাংশ এখন দেশেই উত্পাদিত হয়। বাকি ৪০-৪২ শতাংশ মসলা ব্যবহার করা হয় বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর মধ্যে দেশে উত্পাদিত মসলার পরিমাণ ৩৫ লাখ টনেরও বেশি। তবে ঠিক কী পরিমাণ মসলা সারা বছর ব্যবহার করা হয় সে তথ্য প্রতিষ্ঠানটির কাছে নেই।

মসলার দেশি উত্পাদন ও বাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে মসলা গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রকল্প পরিচালক কলিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৯৯৫-৯৬ সালে যে পরিমাণ মসলা চাষ হতো, বর্তমানে তার চেয়ে আট গুণ বেশি চাষ হচ্ছে।

মসলার উত্পাদন বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে কলিম উদ্দিন বলেন, পরিবর্তনশীল জলবায়ু মোকাবেলার জন্য স্বল্প সময়ে অধিক উত্পাদনক্ষম ও উচ্চ গুণাগুণসম্পন্ন জাত, উন্নত উত্পাদন পদ্ধতি ও মানসম্পন্ন বীজ উত্পাদন, ফসল সংগ্রহোত্তর ও সংরক্ষণজনিত ক্ষতি কমানোর কলাকৌশল উদ্ভাবন, জিরা, এলাচ ও দারচিনির জাত উন্নয়ন, পেঁয়াজ ও মরিচের হাইব্রিড জাত উন্নয়ন গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত উন্নত প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে উপযোগিতা যাচাই করে, প্রশিক্ষণ, প্রকাশনা ও প্রচারের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আদা, হলুদ, মরিচ ও ধনিয়া পাতার মাটিবিহীন চাষ শুরু হয়েছে। চর, লবণাক্ততা, খরা, বরেন্দ্র, পাহাড় ও হাওর এলাকা উপযোগী মসলার জাত উন্নয়ন, চাষ সম্প্রসারণ ও উত্পাদন বৃদ্ধি করে কৃষকের জীবনযাত্রার মান ও পুষ্টি উন্নয়নে কাজ হচ্ছে। বর্তমানে বসতবাড়ির আঙিনা, ছাদ, নতুন ফলবাগান, পতিত জমি উপযোগী মসলার জাত ও প্রযুক্তি মডেল উদ্ভাবন করা হয়েছে। ফলে অনেকগুলো পণ্যের আমদানিনির্ভরশীলতা কমিয়ে অনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশ কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মসলার উত্পাদন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৯ লাখ টন। পাঁচ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৯ হেক্টর জমিতে এসব মসলার চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কাঁচা মরিচ উত্পাদন হয়েছে ছয় লাখ ৫৮০ টন, শুকনা মরিচ দুই লাখ ২৬ হাজার ৩১১ টন, পেঁয়াজ ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ৫৪৪ টন, রসুন পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ৮৩৩ টন, আদা দুই লাখ ২৩ হাজার ২৪৩ টন, হলুদ তিন লাখ ১৫ হাজার ৪২২ টন, দারচিনি সাড়ে ৯ টন, তেজপাতা দুই হাজার ১৫৩ টন, কালোজিরা ১২ হাজার ৯১৯ টন, ধনিয়া ৭০ হাজার ৪৬৫ টন, গোলমরিচ ছয় টন এবং অন্যান্য মসলার উত্পাদন হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৭ টন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হলুদ, দারচিনি ও গোলমরিচ আমদানি হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টন। এর বাজারমূল্য প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে তিন হাজার ৭৯১ টন হলুদ আমদানি হয়েছিল, যা পরের বছর বেড়ে আট ৫৮১ টনে পৌঁছায়। ২০১৫ সালের তুলনায় দারচিনি আমদানি কিছুটা বেড়েছে। ওই বছরে আমদানি হয়েছিল ৯ হাজার ৪৮১ টন। ২০১৬ সালে আমদানি হয়েছে ১০ হাজার ২৮৬ টন। আর ২০১৬ সালে গোলমরিচ আমদানি হয়েছে এক হাজার ১৪১ টন।

পেঁয়াজের দেশি উত্পাদনের পাশাপাশি চাহিদা মেটাতে বৈধ পথে প্রচুর পরিমাণ আমদানিও করা হয়ে থাকে। আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ দেশের বাজারে সারা বছরই পাওয়া যায়। এ ছাড় অন্যান্য পণ্যের মধ্যে লবঙ্গ ও এলাচ আমদানির তথ্য পাওয়া যায়নি ২০১৬ সালে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, এ দুই মসলার বেশির ভাগই চোরাই পথে দেশে নিয়ে আসা হয়, যা দিয়েই পূরণ হয় চাহিদা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের অধ্যাপক ড. এ কে এম জাকির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন মসলা ফসলের উত্পাদনের জন্য আমাদের জলবায়ু ঠিক আছে। কিন্তু সমস্যা হলো জমির সহজলভ্যতা। কারণ আমাদের কৃষকরা প্রথমত তাদের ভাতের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করে। এরপর মাছ বা শাকসবজি। এগুলোর অভাব পূরণ হলে তখন অন্যদিকে নজর দিতে পারে তারা। সবাই এখন ফলের বাগান করছে। এর পাশেই চাইলে মসলার চাষ করাও সম্ভব। এ জন্য কৃষকদের মাঝে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আমাদের পলিসি লেভেল থেকে এসব ঠিক করতে হবে। কারণ মসলা প্রচুর লাভজনক ফসল, এটা তো জানাতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতাও প্রয়োজন পড়বে। ’

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে মসলাজাতীয় পণ্যে সরকারি ভর্তুকির আওতায় ডাল, তৈলবীজ, মসলা (আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ, জিরা) ও ভুট্টা চাষে ৪ শতাংশ সুদে চাষিদের ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো এ খাতে ঋণ বিতরণে মনোযোগী নয়। ফলে মসলা ফসলের আমদানি না কমে ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মসলা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১১৯ কোটি ডলার। প্রতিটি ব্যাংকের এ খাতে ঋণ বিতরণে বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সেটা পূরণ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের গত জানুয়ারি পর্যন্ত ২০টি ব্যাংক মসলা চাষে এক টাকাও ঋণ বিতরণ করেনি। ৯০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকগুলো মাত্র ৩০ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন বলেন, সরকার ঋণের ব্যবস্থা করেছে ঠিকই; কিন্তু তার যে পর্যাপ্ত দেখাশোনা ও প্রচারের জায়গা রয়েছে সেটাতে অনেক পিছিয়ে আছে। এসব জায়গায় কাজ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিংও জোরদার করতে হবে।