দারিদ্র্য ওদের দমিয়ে রাখতে পারেনি

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার আট অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। দরিদ্রতা ওদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। শিক্ষাজীবনে এ সাফল্য ওদের এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়কে আরও সূদৃঢ় করেছে। তারপরও ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আট অদম্য শিক্ষার্থী।
মনিষা আক্তার মণি: বসতভিটা নদীগর্ভে যাওয়ার পর পাউবোর বাঁধে আশ্রয় নেয় মনিষা আক্তার মণির পরিবার। তার বাবা আব্দুল মতিন অন্যের বাড়িতে কাজ করে পাঁচজনের সংসার চালান। দরিদ্রতা মণিকে দমাতে পারেনি। সে থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ভোকেশনাল শাখা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। মেয়ের লেখাপড়ার জন্য খরচ করার সাধ্য নেই মণির পরিবারের। পরিবারের সাধ্য না থাকলেও মণির ইচ্ছা ভালো চাকরি করে পরিবারের অভাব ঘোঁচাবে। মেয়ের ভালো ফল পেয়ে মা বেবী বেগম খুশি হলেও মেয়ের পরবর্তী পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত।
মিতা আক্তার: মিতা আক্তারের বাবা নেই। বড় ভাই আবুল কালাম আজাদ দিনমজুরের কাজ করে দুই ভাইবোন ও মায়ের খরচ চালান। অভাব অনটন দমাতে পারেনি মিতা আক্তাকে। অর্ধাহারে অনাহারে থেকেও সে থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ভোকেশনাল শাখা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এখানেই থামতে চায় না মিতা। বড়ো হয়ে চিকিৎসক হতে চায় সে।
জাহানারা আক্তার মুন: নদী ভাঙা পরিবারের সন্তান জাহানারা আক্তার মুন। নদীগর্ভে বাড়ির ভিটা বিলীন হওয়ার পর তার বাবা মিন্টু খাস জায়গায় ঘর তুলে তিন মেয়ে, এক ছেলেকে নিয়ে সস্ত্রীক বসবাস করছেন। আয় বলতে লন্ড্রি ব্যবসার পাশাপাশি পানের দোকান থেকে যা আয় আসে তাই। সংসার চালানোই দায় সেখানে সন্তানের পড়াশোনায় তেমন ব্যয় করার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু কোনো কিছুই হার মানাতে পারেনি জাহানারা আক্তার মুনকে। সে এবার চিলমারী উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। মুনের ইচ্ছা বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। কিন্তু কলেজে ভর্তির টাকা কীভাবে জোগাড় করবেন বাবা সে নিয়েও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুন।
পপি রায়: উপজেলার সামসপাড়া এলাকার লাইব্রেরি ব্যবসায়ী দিলিপ চন্দ্র রায়ের মেয়ে পপি রায় এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। পপি স্বপ্ন দেখে উচ্চশিক্ষা নিয়ে চাকরি করে পরিবারে অভাব ঘোচাবে। দিলিপ রায়ের সামান্য আয় দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। ইচ্ছা থাকলেও মেয়ের পড়াশোনার পেছনে খরচ করার তেমন সামর্থ্য নেই তার।
রজিফা আক্তার: শরীফের হাট এমইউ উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে রজিফা আক্তার। রাফিজা স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। পিতার সামান্য মুদি ব্যবসা ও মায়ের দর্জিকাজ করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কোনোরকমে চলে রজিফাদের সংসার। সন্তানকে কতদূর পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে সে নিয়ে রাতদিন ভাবেন বাবা রুহুল আমিন। কিন্তু কোনো কূলকিনারা পান না।
নুর রাফসান সিদ্দিক সিয়াম: উপজেলার ডেমনার পাড় এলাকার রাশিদুল আলম বাদল ও নুর হাওয়া সিদ্দিকার বড় ছেলে নুর রাফসান সিদ্দিক সিয়াম এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় এ ইউ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। সিয়ামের ইচ্ছা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের মানুষের সেবা করা।
মুসতান সিরাতুন জান্নাতী বর্ণ: মুসতান সিরাতুন জান্নাতি বর্ণ এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। চার ভাইবোনের মধ্যে সে বড়। বাবা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মচারী। সামান্য আয় দিয়ে দুই মেয়ের লেখাপড়াসহ চারজনের সংসার কোনোরকমে চলে। প্রবল ইচ্ছা থাকলেও মেয়ের পড়াশোনার পেছনে খরচ করার তেমন সামর্থ্য নেই তার বাবার।
হাবিবা আক্তার হ্যাপি: থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল শাখা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে হাবিবা আক্তার হ্যাপি। উপজেলার সবুজপাড়া এলাকার মো. হারুন অর রশিদ ও গৃহিণী কসভান বেগমের তৃতীয় মেয়ে হাবিবা আক্তার হ্যাপি। হারুন অর রশিদ সামান্য একজন মাছ বিক্রেতা। বাজারে মাছ বিক্রয় করে যা আয় হয় তাই দিয়ে তিন মেয়েসহ পাঁচজনের সংসার চালাতে হয় তাকে। মেয়ের লেখাপড়ার জন্য খরচ করার সাধ্য নেই হ্যাপির পিতার।
অাঁখি খাতুন: একই স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে অাঁখি খাতুন। সে দক্ষিণ সাদুল্লাহ ডম্পরমোড় এলাকার চটি ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম ও গৃহিণী শিরিনা বেগমের মেয়ে। আমিনুল ইসলাম সামান্য একজন কাঁচামাল বিক্রেতা। বাজারে একটি চটি দোকানও চালান। তবে রোজগার খুব একটা হয় না। আর যা হয় তা দিয়ে চারজনের সংসার চালাতে হয়। মেয়ের লেখাপড়ার জন্য খরচ করার সাধ্য নেই তার। কিন্তু স্বপ্ন দেখে মেয়েকে নিয়ে।