ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বৈশাখী উৎসব প্রসঙ্গে কিছু কথা

গল শুক্রবারের (২১-০৪-১৭) দৈনিক সংবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৮ দিনব্যাপী বৈশাখী উৎসব শুরুর খবরটি জেনে কিছু স্মৃতি রোমন্থন ও কথা বলার তাগিদ বোধ করলাম। কারণ আমার জন্মও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি গ্রামে। আলোচ্য উৎসবে ব্যারিস্টার আবদুল রসুল ও শহীদ ধীরেন্দ্র দত্তের জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা সভা দিয়ে শুরু হওয়ায় কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করি। কারণ এ দু’জন মনীষী ব্যক্তি আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন এবং আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ হওয়ায় এক ধরনের আত্মীয়তাও বোধ করি। ব্যারিস্টার রসুলের জন্ম আমাদের গ্রামে। নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক গ্রামটিকে তিনি তার জন্ম দ্বারা ধন্য করেছেন। রসুল সাহেব এবং বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত চিরায়ত বাংলার সুযোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে আমার হৃদয়ে বিশেষ আসনে অধিষ্ঠিত। চিরায়ত বাংলা বলতে আমি বুঝাচ্ছি সেই বাংলাকে যে বাংলা বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সাধনায় গড়ে উঠেছে। যার মাটিও মানুষ এবং ইতিহাস ও সংস্কৃতি এক এবং অভিন্ন। পাকিস্তান আন্দোলন ও ভারত বিভাগের পথ ধরে বাংলা বিভক্ত হয়েছে বটে। তবে তার ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিভক্ত হয়নি, কারণ ভূগোল ও পরিবেশ আমাদের একটি এবং অভিন্ন পরিচয়কে মুছে দিতে পারবে না। সেটা হলো বাঙালিত্ব। এ কথাটিই প-িত প্রবর ডক্টর মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ পাকিস্তানের শুরুর দিকে বলেছিলেন এই বলে, ‘আমাদের বাঙালি পরিচয়টি কোন দাড়ি-টুপি বা টিকি দিয়ে ঢাকা যাবে না’।
ব্যারিস্টার রসুলের সংক্ষিপ্ত জীবনে (মাত্র ৩৯ বছর বয়সে মারা যান) বহু অর্জন আছে। তারমধ্যে অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলিম ব্যারিস্টার এবং বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে প্রথম বিসিএল বা ইধপযবষড়ৎ ড়ভ পরারষ ঈধংি তার শিক্ষাগত যৌগ্যতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। বিশেষ করে ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্ববঙ্গের এবং অখ্যাত গ্রামে এবং তুলনামূলকভাবে পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়ের এক সামন্তবাদী (জমিদার) পরিবারের সন্তান বিদ্যা অর্জনের জন্য সুদূর বিলাতে যান এবং সেখান থেকে দিগগজ ব্যারিস্টার হয়ে আসা একটি ব্যতিক্রমধর্মী ব্যাপার বটে। তাছাড়া তার স্ত্রী ছিলেন ব্রিটিশ। সে মানুষটি দেশে ফিরে ব্রিটিশবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, প্রথম বঙ্গ ভঙ্গের বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সাম্রাজ্যবাদী-ব্রিটিশদের একটি প্রধান নীতি ছিল, বিভক্তিকরণের মাধ্যমে শাসন বা উরারফব ধহফ জঁষব। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯০৫ সালে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানকে বিভক্ত করার মানসে বাংলাকে বিভক্ত করার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন ইংরেজ সরকার।
তার বিরুদ্ধে তৎকালীন বাংলায় ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে উঠে। আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়। কারণ তখন তারাই শিক্ষা দীক্ষায় এগিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লার নেতৃত্বে একদল ব্রিটিশ সেবক মুসলমান নেতা পশ্চাৎপদ মুসলমান সমাজকে পরামর্শ দেন যে বঙ্গবিভাগ মুসলমানের জন্য কল্যাণকর হবে। তারা মুসলমানদের প্রতিনিধি সেজে বাংলা বিভাগে ব্রিটিশের সহায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। যে ক্ষুদ্রসংখ্যক মুসলমান নেতা তখন বঙ্গ বিভক্তির বিরুদ্ধে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে একাত্মতা, ঘোষণা করেন, তারা পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন ব্যারিস্টার রসুল। তার সঙ্গে আরও যে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন, তারা হলেন বর্ধমানের মৌলভি আবুল কাসেম, সিরাজগঞ্জের কবি ও বাগ্মী ইসলাম হোসেন সিরাজি এবং টাঙ্গাইলের স্যার আবদুল হালিম গজনভি প্রমুখ। তারা ছিলেন স্যার সলিমুল্লার মুসলিম লীগের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ক্ষুদ্রসংখ্যক মুসলমান, যারা বিশ্বাস করতেন, ধর্মীয় পার্থক্য সত্ত্বেও আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে আমরা বাঙালি। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতাকারী মুসলমানদের প্রধান নেতা যে রসুল সাহেব ছিলেন, সে সত্যটি তখনকার ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রতিবেদনে ও উল্লেখ আছে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদী এই মুসলমান নেতা ১৯৩০ সালে বরিশালে অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। সভাপতি হিসেবে তার নামটি সুপারিশ করেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর। কংগ্রেসের বরিশাল অধিবেশনে প্রদত্ত রসুল সাহেবের বক্তৃতাটির দুটো বিশেষ দিক উল্লেখ করার মতো। একটি হলো ভারতে ইংরেজ শাসনের অবসান চেয়ে ঐড়সব জঁষব বা ভারতবাসীর স্বশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি। অন্যটি হলো বাঙালি মুসলমানদের পরিচিতি নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের দোদুল্যমানতা। সেটি হলো তারা কি বাঙালি, না বাংলার বাইরে থেকে আগত আরব দেশের মানুষ। তাদের এই অবাস্তব চিন্তাকে তিনি সমালোচনা করেন এবং পায়ে তলার মাটির দিকে তাকিয়ে বাংলা এবং বাঙালি পরিচয়টিকে সত্য বলে ধারণ করতে আহ্বান জানান। পরবর্তীতে বর্ধমানে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম লীগ সম্মেলনে তাকে সভাপতি করার মাধ্যমে তাকে হিন্দুদের দোসর বলে অপবাদ দেয়ার কলঙ্ক থেকে বাংলার মুসলমান নেতৃবৃন্দ মুক্তিলাভ করেন। সত্যিকার অর্থে ব্যারিস্টার রসুল ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি এবং মুসলমান। তাই খাঁটি জাতীয়তাবাদীও বটে।
ব্যারিস্টার রসুলের পরামর্শেই বাবু ধীবেন্দ্র নাথ দত্ত রাজনীতিতে যোগ দেন। তার আত্মজীবনীতে ধীরেন্দ্র বাবু স্পষ্টতই লিখেছেন, তার রাজনীতির দীক্ষাগুরু ব্যারিস্টার রসুল। ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে বাংলাও বিভক্ত হয় তখন ধীরেন্দ্র বাবু বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন পরিষদে কংগ্রেসের ডেপুটি লিভার বা উপ-প্রধান ছিলেন। দেশ বিভাগের পর তিনি সহজেই তখনকার বাংলার রাজধানী কলকাতায় থেকে যেতে পারতেন এবং সেখানকার একজন হোমরা চোমরা হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানেই থেকে গেলেন। বিশ্বাস করতে হয়, দেশ ও মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা থেকেই তার এই থেকে যাওয়া। তিনিই প্রথম পাকিস্তানি শাসকদের দরবারে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। তার দাবি এবং ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই আমরা ৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ছিনিয়ে এনেছি।
ধীবেন্দ্র বাবুর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটে যখন তিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী। বোধ হয় সেটা ১৯৫৬ সাল হবে। আমাদের এলাকার অর্থাৎ সরাইল নাসির নগরের রাস্তাঘাটের সমস্যার ব্যাপারে কথা বলতে বড় ভাই আবু হামেদের সঙ্গে তাঁর ঢাকার মন্ত্রী পাড়ার বাসায় যাই। আবু হামেদ সাহেব এবং আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র। পরবর্তীতে হামেদ সাহেব সাহবাজপুর হাই স্কুলসহ এলাকার কয়েকটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ধীরেন্দ্র বাবুর অমায়িক এবং আন্তরিক ব্যবহার আমার তরুণ মনে দাগ কাটে। স্বল্প সময়ের অবস্থানকালে তিনি পাকিস্তান পাকিস্তানি রাষ্ট্রের পূর্ববাংলা ও বাঙালির উন্নয়ন বিরোধিতার একটি সংক্ষিপ্ত অথচ সুন্দর ব্যক্তব্য দিলেন। রাসুল সাহেবের মতোই তার শিষ্য ধীরেন্দ্র নাথ দও ছিলেন খাঁটি বাঙালি। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশও বাঙালি জাতি গঠনের তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
ব্যারিস্টার রসুলের ব্যাপারে আমার কৌতূহল ও শ্রদ্ধার শেষ নেই। তার গ্রামেই আমার জন্ম। শৈশব কাল থেকেই তার জ্ঞান এবং গুণের কথা পরিবার এবং গ্রামবাসীর মুখে কিংবদন্তির মতো শুনেছি। ছেলে বেলায় আমাদের পাশের গ্রাম চিতনার এক হিন্দু বাউলকে রসুল সাহেবের গুণ কীর্তন করে গান গাইতে দেখেছি। আমার বাবা ছিলেন রসুল সাহেবের পরম ভক্ত। রসুল সাহেব মারা গেলে তিনি কলকাতা ছেড়ে আমাদের গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। অথচ তখন জীবন ও জীবিকার সন্ধান আমাদের গ্রামের অনেক মানুষ কলকাতাবাসী ছিলেন। বাবার মতে রসুল সাহেবের বহু গল্প শুনেছি। শুনেছি মওলানা আবুল কালাম আজাদের গল্প। বিশেষ করে মওলানা আজাদের ঈদের দিনে কলকাতার গড়ের মাঠে ঈদের খুতবার কথা। অল্প বয়স থাকায় সব কথা মনে নাই। তবে রসুল সাহেবের একটি উক্তি ছিল, চরিত্রহীন মানুষ পশুর সমান। জমিদার পরিবারের সন্তান রসুল সাহেব যেমন ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক তেমনি ছিলেন প্রজাবান্ধব এবং গরিবের বন্ধু। মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিতেন। জমিদার সুলভ কোন অহঙ্কার তার মধ্যে ছিল।
তাই ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত মহাশয় রসুল সাহেবের মত স্বদেশ প্রেমিক বিদ্বান এবং জাতীয়তাবাদি বাঙালির শিষ্য হবেন সেটা বিস্মিত হওয়ার কিছু নয়। গুণীই গুণের কদর বুঝে। আজ বহু যুগ পরেও ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী তাদের দুজন মনীষী ব্যক্তিকে ভুলে নাই দেখে আমার মত অশীতিপর এক ব্যক্তি অতিশয় আনন্দ বোধ করে। উৎসবের উদ্যোক্তদের প্রতি, বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের পুরোধা জয়দুল হোসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং অভিনন্দন জানাই। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এবং দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান আমার পরম স্নেহ ও ভালোবাসার পাত্র। সংবাদের লেখা প্রকাশে তার সহযোগিতার কথা এ সুযোগে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। অনুষ্ঠানে তার যে ভাষণ, ‘বাঙালি পরাজিত হওয়ার জাতি নয়, তার সঙ্গে আমি একমত। তবে আমার প্রত্যাশা এবং প্রার্থনা, আমরা যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথ ধরে একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক এবং উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্যকে জয় এবং গণতান্ত্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। তাহলেই ব্যারিস্টার রসুল বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন হবে।