এবার হাজার টন আম রপ্তানি করার আশা

ফলের রাজা আমে কার্বাইড ও ফরমালিন মেশানোর কারণে গত তিন বছর আম রপ্তানিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল এবার সে রকম আশঙ্কা নেই। সরকার ও আম ব্যবসায়ীদের দাবি, আমের সার্বিক মান অনসুরণ করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বেঁধে দেওয়া সব শর্তই পূরণ করা হচ্ছে এবার। গত ২৬ এপ্রিল কৃষি মন্ত্রণালয়ে ইইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে আম ব্যবসায়ী ও সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ আম রপ্তানির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ইইউয়ের দেওয়া শর্ত প্রতিপালনসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় চলতি বছর এক হাজার টন আম রপ্তানি করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। আগামী ১৫ মে আম রপ্তানি শুরু হবে ইউরোপের দেশগুলোতে। চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। ৭ জুলাইয়ের পর আর আম রপ্তানি করা যাবে না। ২৬ এপ্রিলের ভিডিও কনফারেন্সে দুই পক্ষের মধ্যে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে আম রপ্তানি করা হয়েছিল প্রায় ৬০০ টন। গত বছর কমে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩০০ টন। আমে কার্বাইড ও ফরমালিন মেশানো নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয় বিদেশিদের মধ্যে। আদালতের মাধ্যমে অবশ্য সেই ধারণা পাল্টেছে। সে কারণে এ বছর রপ্তানির পরিমাণ বেড়ে এক হাজার টনে উন্নীত হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও রপ্তানিকারকরা একে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশের আম নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা ছিল বিদেশিদের, সেটি ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। এখন বাংলাদেশের আমের চাহিদা বাড়ছে ইউরোপের দেশগুলোতে। তবে আগে দেশের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (রপ্তানি) আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচিত চাষিরা কোন প্রক্রিয়ায় আম চাষ করেছে, সেটি জানতে চেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আমরা তাদের জানিয়েছি এবং নিশ্চয়তা দিয়েছি—আম স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ হবে। তারা আশ্বস্ত হয়েছে। তবে তারা চূড়ান্ত সংকেত দেবে ৮ মে। ’ আনোয়ার হোসেন আরো বলেন, ‘তারা (ইইউ) জানতে চেয়েছে, কত টন আম দেওয়া যাবে। আমরা জানিয়েছি, অভ্যন্তরীণ প্রচুর চাহিদা রয়েছে। সে চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এক হাজার টন রপ্তানি করা যাবে। অবশ্য তাদের চাহিদা আরো বেশি ছিল। আগামী ১৫ মে থেকে আম রপ্তানি শুরু হবে। ’

এদিকে গত সপ্তাহে দেশব্যাপী কালবৈশাখী ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে আমের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন, বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আম রপ্তানিতে তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তা ও রপ্তানিকারকরা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বারি) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, শিলা বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে গুটি আমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে রপ্তানিতে তার কোনো প্রভাব পড়বে না। তা ছাড়া আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অনেক কম। এ বছর শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেড় কোটি আমে ব্যাগিং করা হয়েছে। মেহেরপুর থেকে গত বছর আম রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ১২ টন। এ বছর সেটি বেড়ে ২০০ টনে উন্নীত হচ্ছে। আম রপ্তানি নিয়ে কাজ করা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থা সলিডারিডেড নেটওয়ার্ক এশিয়ার কর্মকর্তা মুজিবুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, কালবৈশাখী ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গে আমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুরের দিকে আমের কোনো ক্ষতি হয়নি। তিনি বলেন, ‘আম রপ্তানির জন্য আমরা চাষী নির্বাচন করেছি। এবং তাদের সব সময় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছি। আম বাগানে ব্যাগিং পদ্ধতি রাখা হয়েছে। ফলে আমের ক্ষতি হয়নি। রপ্তানিতে তেমন প্রভাব পড়বে না। ’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে বাগানে উৎপাদিত আম বিদেশে পাঠানো হতো। তবে গত বছর থেকে চাষি নির্বাচন করা হয়েছে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বা চুক্তিভিত্তিক আম উৎপাদনের জন্য। সাতক্ষীরার চারটি উপজেলা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে আম উৎপাদন করা হচ্ছে। সেখান থেকে আম সংগ্রহ করে পাঠানো হবে শ্যামপুরে কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউসে। রপ্তানিমুখী পণ্যের মান ঠিক রাখতে ১৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর শ্যামপুরে কেন্দ্রীয় মোড়কজাতকরণ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সেখান থেকে আমের ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট (পিসি) দেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এরপর আম পাঠানো হবে বিদেশে।

আম নেওয়ার আগে ইইউয়ের শর্ত ছিল, আম উৎপাদনের সব পর্যায়ের তথ্য লিপিবদ্ধ করতে হবে। ফাইটোস্যানিটারি মানদণ্ড অনুসরণ করে আম উৎপাদন করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে পোকামুক্ত, বালাইমুক্ত আম। এ ছাড়া ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, ইইউয়ের দেওয়া সব শর্তই তারা পূরণ করে এসংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে তাদের কাছে। আগামী ৮ মে তারা ওই প্রতিবেদনের জবাব দেবে। ইইউ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার আশা করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

আম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জহিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বছর ২০০ থেকে ৩০০ টন আম রপ্তানি আশা করছি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের যেসব শর্ত দিয়েছে, আমরা সেগুলো প্রতিপালন করেছি। বালাইমুক্ত আম উৎপাদনে বাগান নির্বাচন থেকে শুরু করে চাষিদের কন্ট্রাক্ট ফার্মিং, গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ) অনুসরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। ’ আগামী ১৫ মে থেকে আম রপ্তানি শুরু হবে বলে জানান তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র মতে, এ বছর হিমসাগর, ল্যাংড়া, লক্ষ্মণভোগ, আম্রপালি আম রপ্তানি করার কথা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আম রপ্তানি হবে যুক্তরাজ্যে। এ ছাড়া ইতালি, স্পেন, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, গ্রিসসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে আম রপ্তানি করার কথা। ৭ জুলাইয়ের পর আর আম রপ্তানি না করতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে ইইউ। তাদের অনুরোধের পরিপ্র্রেক্ষিতে ৭ জুলাইয়ের পর থেকে আম রপ্তানি বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।