পায়রা কর্মচঞ্চল মানুষের পদচারণায় মুখরিত

দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা এখন কর্মচঞ্চল মানুষের পদচারণায় মুখরিত রয়েছে। এখানে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। দিনরাত চলছে উন্নয়ন কর্মের ধারা। স্থানীয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানের অন্তত হাজার মানুষ এ কর্মযজ্ঞে শামিল হয়েছেন। হয়েছে এখানকার হাইলা-কামলা শ্রেণীর অন্তত পাঁচশ’ অদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান। যেসব মানুষ কৃষিজমিতে কাজ করার পর থাকত বেকার। এসব পরিবারে ফিরছে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য। ২০১৩ সালের ১৯ নবেম্বরে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতের ছোঁয়ায় শুরু হওয়া পায়রা বন্দরের এ কর্মযজ্ঞের ধারা চলবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। পূর্ণাঙ্গ গভীর বন্দরে উন্নীতের এ ধারা বইছে এ জনপদে। মাত্র চার বছর আগে সন্ধায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত জনপদ, শিয়ালের ডাক ছাড়া কিছুই শোনা যেত না। রাতে তো দূরের কথা দিনেও পদচারণা ছিল না কোন মানুষের। ফেলনা নদীর পাশের বনজঙ্গলে ঘেরা কলাপাড়ার টিয়াখালীর এ জনপদ এখন পরিণত হয়েছে আলোকিত জনপদে। ফ্ল্যাড লাইটের আলোর ঝলকানিতে চোখ কুচকে যায়। যেখানে চায়ের পিয়াস মেটানোর সুযোগ ছিল না, সেখানে এখন কফির তেষ্টা মেটায় মানুষ। নিত্য পদচারণা থাকছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীর। ফেলনা, অনাবাদি জমি পরিণত হয়েছে সোনার খনিতে।

আনুষ্ঠানিকভাবে এ বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট। এরপর থেকে নৌপথে মূল চ্যানেলে পণ্যবাহী মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাশ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ফি মাসে অন্তত পাঁচ থেকে ৮টি জাহাজ পণ্য খালাস করছে। কর্মব্যস্ত যেমন এ বন্দরের নৌপথ, তেমনি কর্মব্যস্ত বন্দর এলাকার স্থলপথ। ইতোমধ্যে অন্তত ১৩ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়েছে এ বন্দর থেকে।

প্রাথমিকভাবে ১৬ একর জমিতে পায়রা বন্দর প্রকল্প এলাকা নির্মাণ করা হয়। বন্দরের পরিচালক (নিরাপত্তা) লেফটেন্যান্ট কেএম জাহাঙ্গীর আলম জানান, ইতোমধ্যে ভূমি উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত করে সেখানে প্রশাসনিক ভবন (অস্থায়ী) নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মিত হয়েছে পানি শোধনাগার, যেখান থেকে দৈনিক দুই হাজার টন নিরাপদ পানি সরবরাহ করা যাবে। কাস্টমসসহ নিরাপত্তা ভবন নির্মিত হয়েছে আগেই। নদীরপাড় ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে অফিস ভবন। স্থাপিত হয়েছে লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য খালাশের টার্মিনাল। বেইলিব্রিজসহ সংযোগ সড়ক নির্মিত হয়েছে। সোলার বাতিসহ বিদ্যুত সরবরাহ চালু করা হয়েছে। সাবমেরিন কেবল লাইন টানা হয়েছে। সাগর মোহনা থেকে মূল চ্যানেলের নেভিগেশনাল বয়া স্থাপন করা হয়েছে। স্থাপিত হয়েছে সিগন্যাল বাতি। সাগর থেকে চ্যানেলের ইনার সাইটে ২৮টি বয়াবাতি সেট করা হয়েছে। রামনাবাদ থেকে তেঁতুলিয়া নদীতে বরিশাল হয়ে ঢাকার মেঘনা নদীর হিজলা পর্যন্ত ৭০ মাইল নদী খনন করা হয়েছে। যেখানে পাঁচ মিটার নাব্য বজায় রাখা হয়েছে। এ চ্যানেলেও ৪৬টি বয়াবাতি স্থাপন করা হয়েছে। গোটা চ্যানেলটিতে ১০ মিটার নাব্য নিশ্চিতের লক্ষ্যে বেলজিয়ামের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়া চলছে। এখন চলমান রয়েছে পাঁচতলা মূল প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণ কাজ। যার একতলা সম্পন্ন করা হয়েছে। ৪২ হাজার বর্গফুট কয়েল হাউসের নির্মাণ কাজ ৬০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। দ্রুতালয়ে চলছে পায়রা বন্দরের সঙ্গে মহাসড়কের সরাসরি যোগাযোগে পাঁচ দশমিক ৬০ কিমি দীর্ঘ ফোরলেন সড়কের নির্মাণ কাজ। এজন্য ২৫৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়-বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বালুর পাইলিংয়ের ওপর কংক্রিটে নির্মাণ হচ্ছে এ সড়কটি। বন্দর সংলগ্ন ট্রাক স্টান্ডের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। বন্দর সার্ভিস সুবিধার জন্য বিভিন্ন ধরনের জলযান (হাই-স্পিড) নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। বন্দর প্রকল্প এলাকার বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ কাজ প্রায় ৭০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে চলছে সিএন্ডএফ এজেন্ট ক্লিয়ারেন্স এবং ইমিগ্রশনের কাজ। ইতোমধ্যে ৬২ জন বিদেশী নাগরিকের ইমিগ্রেশন সুবিধা দেয়া হয়েছে এ বন্দর থেকে।

পায়রা বন্দর চালু হওয়ায় এখানকার মৌসুমী কৃষি শ্রমিকসহ জেলে পরিবারের অদক্ষ শ্রমিকরা পেয়েছেন কর্মসংস্থান। লালুয়ার নয়াপাড়া গ্রামের ষাটোর্ধ জেলে ও কৃষি শ্রমিক সেলিম ফকির জানান, তিনি প্রায় তিন মাস এই বন্দরে সকাল-সন্ধ্যা কামলা দেন। দৈনিক ৩৫০ টাকা চুক্তিতে এ মানুষটি দিনের কাজ শেষে রাতে আবার মাছ ধরেন। চার জনের সংসারে এখন এ মানুষটির আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। শুধু সেলিম ফকির নয়, এমন অন্তত পাঁচশ’ অদক্ষ শ্রমিক পায়রা বন্দরের কর্মযজ্ঞে শামিল হয়েছেন। স্থানীয় কেউ কেউ পেয়েছেন গাড়ি চালকসহ নিরাপত্তার চাকরি। বিকল্প জীবিকার পথ পেয়ে এ মানুষগুলো আপাতত স্বস্তিতে রয়েছেন।

জানা গেছে, পূর্ণাঙ্গভাবে বন্দরের কার্যক্রম চালু করতে তিন বছর মেয়াদী উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ওয়্যার হাউস নির্মাণ, রামনাবাদ চ্যানেল থেকে কালীগঞ্জ নৌপথের বিভিন্ন স্পটে ড্রেজিং, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, হাইস্পিড, পাইলট ও টাগবোট সংগ্রহ, বয়া লেয়িং ভ্যাসেল, সার্ভে ভ্যাসেল, সার্ভিস পন্টুন স্থাপনসহ সেতু নির্মাণ। এর অধিকাংশ চলছে আবার অনেকটা সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া সাত হাজার একর জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক কাজও চলছে। পাশাপাশি এসব জমির মালিকদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে পায়রা বন্দর হতে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। পায়রা বন্দর এলাকায় নিরাপত্তার কোন শঙ্কা নেই। কারণ এখানে দেশের সর্ববৃহৎ শের-ই-বাংলা নৌঘাটি নির্মিত হচ্ছে। নৌপথ থাকছে নিñিদ্র নিরাপত্তায়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্লিয়ারিং এ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্সি তাদের ব্যবসার সম্প্রসার ঘটাতে জায়গা-জমি কিনেছেন। গড়ে উঠেছে একাধিক শ্রমিক সংগঠন। মোট কথা পায়রা বন্দরকে ঘিরে বিরাজ করছে সাগরপাড়ের কলাপাড়া অঞ্চলের মানুষের মাঝে এক ধরনের উচ্চাকাক্সক্ষা। যেন প্রত্যাশার সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষ প্রাপ্তির যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে। দেখছেন এর বাস্তব প্রতিফলন।