‘আঘাতগুলো শক্তি জোগায়’

বিদেশ সফরের মাঝপথে দেশে ফিরে আসা মাশরাফি বিন মুর্তজার জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগে প্রতিবারই সেই ফেরার কারণ হয়েছে নিজের চোট। আর এবার ইংল্যান্ডের কন্ডিশনিং ক্যাম্প থেকে মাশরাফি ফিরে আসেন স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে। একই সময়ে ছেলে সাহেলের প্রচণ্ড জ্বর আর মেয়ে হুমায়রার চোখের সমস্যায় মাশরাফির দিন কেটেছে সীমাহীন উৎকণ্ঠায়। তবে ক্যারিয়ারে অসংখ্য চোট মোকাবেলা করা মাশরাফি পারিবারিক এ সংকটও কাটিয়ে উঠেছেন ভালোভাবেই। স্ত্রী সুমনা হক সুমী ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন। ছেলেও সুস্থ অনেকটা। শুধু হুমায়রার বাঁ চোখের সমস্যাটাই দুশ্চিন্তার কারণ। দলের সঙ্গে যোগ দিতে আয়ারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার ফ্লাইট ছিল গতকাল সন্ধ্যায়। দুপুরে তাই এক ফাঁকে মেয়েকে নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। তার আগে বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়ক সমকালের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন পরিবার, জাতীয় দল, আসন্ন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিসহ আরও অনেক কিছু নিয়ে

ষ অবশ্যই পরিবারই সবার আগে। তবু প্রস্তুতি ম্যাচটা যে খেলতে পারেননি, তাতে কতটা ক্ষতি হলো?

উত্তর :কতটা ক্ষতি হলো, সেটা নিয়ে আসলে ভাবছিই না। মূল ম্যাচের আগে যে আয়ারল্যান্ডে ফিরতে পারছি, এটাই বড় ব্যাপার। দলের সঙ্গে থাকলে অবশ্যই ভালো হতো। যে রকম ঠাণ্ডা আবহাওয়া দেখে এসেছি, তাতে ওই আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে ফেরাটা জরুরি ছিল। এখন মনে হচ্ছে, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। আমি আসতে পেরেছি, পরিবারকে সময় দিতে পেরেছি।

ষ ফিরে যাওয়ার সময়টা তো আরও পরেও হতে পারত…

উত্তর :হ্যাঁ, আরও পরেও হতে পারত। এমনকি আমার হয়তো আর দলের সঙ্গে যোগ দেওয়াই হতো না। আল্লাহর রহমতে এখন সবকিছু ঠিকঠাক আছে। সুমী (মাশরাফির স্ত্রী) এখন অনেকটা ভালো। আমি যদিও ধাক্কাটা এখনও পুরোপুরি সামলাইনি, তবে আশা করছি যে, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ষ ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তো খেলতে পারবেন না নিষেধাজ্ঞার কারণে। দর্শক হিসেবে দলের খেলা দেখতে কেমন লাগবে?

উত্তর :(হেসে) ভালোই হবে, চা-টা খাবো বসে, আরাম করে খেলা দেখব… না, এমনিতে বসে থাকা তো আর হবে না। হয়তো বোলিং প্র্যাকটিস করব। নিজেকে তো প্রস্তুত করতে হবে। একদিক দিয়ে এটা ভালো হয়েছে, সময়টা কাজে লাগাতে পারব।

ষ ওয়ানডে র‌্যাংকিংটা খানিক ওলট-পালট হয়েছে গত ১ তারিখ। আমরা এক পয়েন্ট হারালেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান বেড়েছে। ষ এটা কতটুকু স্বস্তির ব্যাপার?

উত্তর :এটা একটা বাড়তি সুবিধা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে আমাদের বর্তমান পয়েন্ট ব্যবধান ১২, পয়েন্টের এতটা ব্যবধান থাকা বেশ ভালো ব্যাপার। তবে আমার মনে হয়, যদি ব্যবধান আরও কম হতো, বা যদি আমরা পিছিয়েও থাকতাম, তবু সেটাকে খুব বড় করে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি ম্যাচে আমাদের জেতার জন্যই মাঠে নামতে হবে। জিততে না পারলে পয়েন্ট কমে যাবে, আমরাও নিচে নেমে যাব। আর ভালো খেলে বেশিরভাগ ম্যাচ জিততে পারলে এমনও হতে পারে যে, বিশ্বকাপের আগেই র‌্যাংকিংয়ে পাঁচ-ছয়ে ঢুকে গেলাম। তো সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়, চিন্তাটা হওয়া উচিত ম্যাচগুলোতে ভালো খেলা ও জেতা।

ষ ত্রিদেশীয় সিরিজে কিন্তু শঙ্কার জায়গাও রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে দুটো ম্যাচ হেরে গেলে বেশ ভালো রকম পয়েন্ট কমবে।

উত্তর :শঙ্কা তো থাকবেই। যখন আমরা র‌্যাংকিংয়ে সাতে উঠে এসেছিলাম, তখন তো শঙ্কা বা আশা কোনোটাই ছিল না। র‌্যাংকিংয়ে উপরে উঠলে আরও ভালো খেলার তাগাদা যেমন বাড়ে, তেমনই পিছিয়ে যাওয়ার ভয়ও থাকে। এগুলো স্বাভাবিক, এ ব্যাপারগুলো মেনে নিয়েই এগোতে হবে।

ষ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাংলাদেশের গ্রুপের অন্য তিন দল ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। বলা যায়, দুটি গ্রুপের মধ্যে এ গ্রুপটাই তুলনামূলকভাবে বেশি কঠিন। সেক্ষেত্রে কি কোনো একটা বা দুটো নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে ম্যাচকে পাখির চোখ করবেন?

উত্তর :না, লক্ষ্য হচ্ছে তিনটি ম্যাচেই নিজেদের সেরাটা দেওয়া। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য ওই তিন দলের সবগুলোই নিজেদের সেরা স্কোয়াড ঘোষণা করেছে। প্রত্যেক দলেই ব্যাটসম্যান ও বোলারদের প্রায় সবাই ফর্মে আছে। আর আবহাওয়া ও কন্ডিশন যেমন দেখে এসেছি, তাতে করে নির্দিষ্ট কোনো দলকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর কোনো সুযোগ নেই। হয়তো অনেকেই চিন্তা করবে যে নিউজিল্যান্ড তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ। কিন্তু এ ধরনের টুর্নামেন্টে ওরা সাধারণত সেরা চার দলের মধ্যে থাকে। গত বিশ্বকাপেও ওরা ফাইনাল খেলেছে। সেই হিসাবে নিউজিল্যান্ড সম্ভবত তিন দলের মধ্যে সবচেয়ে শক্ত প্রতিপক্ষ। তাই লক্ষ্যবস্তু ঠিক করা কঠিন।

ষ সেক্ষেত্রে লক্ষ্য কী হবে?

উত্তর :প্রথম ম্যাচ থেকেই আমাদের ভালো খেলতে হবে। যদি ভালো খেলতে পারি, তাহলে অবশ্যই সুযোগ তৈরি হবে। তবে একটা জায়গায় একটু দুশ্চিন্তা রয়েছে। টি২০ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ওই এক রানের পর থেকে আরও কয়েকটি ম্যাচ আমরা জিততে জিততেও হেরে গেছি। এটা নিয়েই আমার দুশ্চিন্তা। আমি চাইব, সুযোগ তৈরি হলে যেন সেই সুযোগ হাতছাড়া না হয়। অন্য সবকিছুর চেয়ে এটা নিয়েই আমার ভাবনা বেশি।

ষ জেতার কাছাকাছি গিয়ে হেরে যাওয়ার এ ব্যাপারটি কি মনস্তাত্তি্বক, নাকি স্কিলের ঘাটতি?

উত্তর :এটা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। তবে খেলার সময় তো আর আগের ম্যাচে কী হয়েছে, সেটা মাথায় থাকে না। যেটা হয়, আপনি যদি হারার কাছাকাছি গিয়ে কোনো ম্যাচ জিতে ফেলেন, তখন আত্মবিশ্বাসটা হয়ে পড়ে আকাশচুম্বী। কিন্তু যখন আপনি জেতা ম্যাচ হেরে যাবেন, তখন সেটার একটা বাজে প্রভাব পড়ে। আপনি বুঝতে পারছেন যে আপনি ভালো খেলছেন, কিন্তু খেলাটা শেষ করতে পারছেন না ঠিকঠাক। গতবছর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যে দুটি ম্যাচ আমরা হারলাম, সেগুলোর দিকে তাকালে বুঝতে পারবেন। নিউজিল্যান্ডে তো ওয়ানডে ও টি২০ দুই সিরিজেই এই ব্যাপারটি ঘটেছে। কিন্তু আমার মনে হয়, এখন সময় এসেছে চাপের মুখে ম্যাচ জিততে শেখার, সেটা যে কন্ডিশনে যে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই হোক না কেন। আমরা যে অন্য দলগুলোর চেয়ে খুব পিছিয়ে আছি, তা নয়। আমাদের সুযোগ তৈরি হচ্ছে; কিন্তু আমরা কাজে লাগাতে পারছি না।

ষ প্রধান নির্বাচক দল ঘোষণার সময় বলেছিলেন_ সব দলেই পেস বোলিং অলরাউন্ডার আছে, বাংলাদেশের পেস বোলিং অলরাউন্ডার হচ্ছেন মাশরাফি। এ ভূমিকাটায় নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন কী?

উত্তর :সত্যি কথা বলতে, পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে তৈরি করার সামর্থ্য আমার ছিল। কিন্তু সেই সামর্থ্যকে আমি কাজে লাগাতে পারিনি। তবে পুরো ক্যারিয়ার যদি দেখি, তবে আমি বিশ-ত্রিশ রান করায় বেশ কিছু ম্যাচ হয়তো বাংলাদেশ জিতেছে। আট বা নয় নম্বর ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে বিশ-পঁচিশ রান পাওয়াটা অনেক বড় ব্যাপার। দলের প্রয়োজনে ওই রানটা যদি করতে পারি, তাহলে খুব ভালো হবে।

ষ বিদেশ সফর থেকে অনেকবারই চোটের কারণে দেশে ফিরতে হয়েছে। ২০১৫ বিশ্বকাপ চলাকালেও আপনার ছেলে বেশ অসুস্থ ছিল। এবার তো পারিবারিক কারণে ফিরতে হলো। এটাও অবশ্যই ভালো কোনো ব্যাপার নয়, তবু এই অভিজ্ঞতাটা কেমন?

উত্তর :ভালো ব্যাপার এটাই ছিল যে, সিরিজ শুরু হওয়ার অনেক আগে দুর্ঘটনাটা হয়েছিল। খেলার সময় হলেও আমার আসতে হতো। আমার দুই বাচ্চা চার-পাঁচ দিন তাদের মায়ের কাছ থেকে আলাদা ছিল। একই সময়ে আমার ছেলেও অসুস্থ ছিল, মেয়েটারও কিছুদিন ধরে চোখে সমস্যা। পরিস্থিতি খুব কঠিন ছিল। হয়তোবা এই ছয়-সাত দিনে অনেক কিছুই বেশ স্বাভাবিক হয়ে গেছে; কিন্তু আমার আসাটা খুব জরুরি ছিল।

ষ শেষ প্রশ্ন, মাশরাফির সঙ্গেই বারবার এরকম হয় কেন?

উত্তর :সত্যি বলতে, এই ব্যাপারগুলো, এই আঘাতগুলো আমাকে আরও শক্তি জোগায়। সবকিছু ঠিক চললে সেই জীবনটা আবার কেমন জীবন? মাঝেমধ্যে কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে গেলে বোঝা যায়, জীবন আসলে কেমন। খেলার চেয়ে পরিবার অনেক বড়। এবারের ঘটনায় আমি নিজেও সেটা আরেকবার বুঝলাম।