নতুন কলকারখানায় চাঙ্গা অর্থনীতি

শিল্প খাতে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে উত্তরের জেলা বগুড়া। গেল শতাব্দীর ষাটের দশকে ‘শিল্পনগরী’ হিসেবে খ্যাত বগুড়ায় মাঝে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও বর্তমানে নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে উঠছে। অঞ্চলভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসারের পাশাপাশি জেলার প্রতিটি সড়ক-মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠছে বড় বড় কলকারখানা। প্রতি বছর অনেক নারী-পুরুষ যুক্ত হচ্ছেন এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে।

শুধু শহরেই নয়, শিল্পায়ন হচ্ছে গ্রামাঞ্চলেও। বিপুল অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগের কারণে জেলার অর্থনীতিও এখন বেশ চাঙ্গা। স্থানীয় চেম্বার নেতা, উদ্যোক্তা, শিল্প মালিক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে গত প্রায় দেড় দশকে বগুড়ায় শিল্প খাতে অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, যার সিংহভাগের জোগান এসেছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। এসব কলকারখানায় উৎপাদিত বেশ কিছু পণ্য বিদেশেও রফতানি হচ্ছে, যার পরিমাণ বছরে ৩৮ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩০ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

শিল্প খাতে বগুড়ার ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বগুড়া জেলার অর্থনৈতিক শুমারি-২০১৩ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ জেলায় কুটির শিল্প, মাইক্রো শিল্প, ক্ষুদ্র শিল্প, মাঝারি এবং বৃহৎ ধরনের মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮০৬টি শিল্প

প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ ২০০৩ সালে বগুড়ায় মোট শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৬৮ হাজার ৬৮৩টি। সে হিসাবে এক দশকে জেলায় উল্লেখিত পাঁচ ধরনের মোট ৩৪ হাজার ১২৩টি নতুন কলকারখানা নির্মিত হয়েছে। তবে স্বাধীনতার আগে বগুড়ায় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৫৪২টি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর এ জেলায় ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি, ৫৬ শতাংশ শিল্প গড়ে উঠেছে।

২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত বিবিএসের বগুড়া জেলার সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বগুড়া জেলায় গড়ে ওঠা মোট কলকারখানার মধ্যে ৭৮ শতাংশই কুটির শিল্প। এ জেলায় কুটির শিল্প রয়েছে ৮০ হাজার ৬৭২টি। এ ছাড়াও মাইক্রো শিল্প রয়েছে ২ হাজার ৬২২টি, ক্ষুদ্র শিল্পের সংখ্যা ১৯ হাজার ৩০৩টি, মাঝারি শিল্প ১৩০টি এবং বাদবাকি ৭৯টি বৃহৎ ধরনের শিল্প। বিবিএসের শুমারি প্রতিবেদন বলছে, বগুড়ায় গড়ে ওঠা মোট শিল্প-কলকারখানার মধ্যে ৬৫ শতাংশ বা ৬৬ হাজার ৯৯২টি প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে গ্রামাঞ্চলে। বাকি ৩৫ হাজার ৮১৪টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে শহরে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গেল দেড় দশকে অর্থাৎ ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বগুড়ায় ব্যক্তি উদ্যোগে বড় যেসব শিল্প গড়ে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- জুট মিল, পেপার মিল, রাইস ব্রান অয়েল মিল, অটো রাইস মিল, অটো ব্রিকস, টাইলস কারখানা, ফ্লাওয়ার মিল, অয়েল মিল, ওষুধ কারখানা, সেচযন্ত্র প্রস্তুতকারক ফাউন্ড্রি ইন্ডাস্ট্রি, কলকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্র এবং যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেটাল ইন্ডাস্ট্রি। রয়েছে পোলট্র্রি খাতের ফিডমিল এবং স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজও। অঞ্চলভিত্তিক গড়ে ওঠা কুটির শিল্পের মধ্যে রয়েছে চিকন সেমাই ও লাচ্ছা সেমাই কারখানা, দইয়ের কারখানা, নাইলনের ব্যাগের কারখানা, সিমেন্টের খুঁটি ও কাচের শিশি তৈরির কারখানা, সোয়েটার কারখানা, রিকশার পার্টস সংযোজন কারখানা, প্লাস্টিকের খেলনা তৈরির কারখানা, হ্যাচারি, মুরগির খামার, ছাপাখানা, ব্রেড ও বিস্কুট ফ্যাক্টরি, মাদুর শিল্প, টুপি শিল্প ও তাঁত শিল্প। এসবের পাশাপাশি শহরে নির্মিত হয়েছে তারকা খচিত একাধিক হোটেল-মোটেল এবং গড়ে উঠেছে একাধিক আবাসন প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রমমূল্য কম এবং শিল্প স্থাপনে জমির সহজলভ্যতার কারণেই বগুড়ায় শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন বলেন, ‘এ জেলার শ্রমিকদের মজুরি ঢাকা বা চট্টগ্রামের তুলনায় কিছুটা সস্তা। তাছাড়া বগুড়ার উদ্যোক্তারা বরাবরই চ্যালেঞ্জ নিতে জানেন। জেলায় বিরাজমান ব্যবসাবান্ধব পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে তারা নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসছেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত বগুড়া তার হারানো গৌরব আবার ফিরে পেতে শুরু করেছে।’

কলকারখানা সম্প্রসারণে বগুড়ার ফাউন্ড্রি ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। কারণ কলকারখানায় ব্যবহৃত নানা ধরনের হুইল (চাকা), পিনিয়াম ও ডাইসসহ অনেক ধরনের যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্পে বা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে তৈরি হয় এবং সেগুলো খুবই সহজলভ্য। এসব যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ নতুন কলকারখানা নির্মাণে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। তাছাড়া ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি যমুনা নদীতে ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’ উদ্বোধনের পর রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে বগুড়ার যোগাযোগ সহজ হওয়ায় উৎপাদিত পণ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হয়।

বগুড়া আজাদ পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এখানকার ফাউন্ড্রি শিল্প কিংবা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কর্মরত কারিগররা এতটাই দক্ষ যে, তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ একবার দেখালে তারা সেটি হুবহু নিখুঁতভাবে তৈরি করে দিতে পারেন। চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি এসব সহায়তা সহজে পাওয়া যায় বলেই শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা এ অঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে বগুড়াকেই এগিয়ে রাখেন।’

বগুড়াভিত্তিক ফাউন্ড্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফওএবি) সহসভাপতি আব্দুল মালেক বলেন, ‘ফাউন্ড্রি শিল্প আমাদের কাছে মাদার ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে পরিচিত। কারণ অন্যান্য শিল্পে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় যন্ত্র বা যন্ত্রাংশের সিংহভাগই বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্পে তৈরি করা হয়।’

ফিরে দেখা সেই বগুড়া :গেল শতাব্দীর ষাটের দশকে বগুড়ায় ‘ভাণ্ডারী গ্রুপ’ ও ‘জামিল গ্রুপ’ নামে দুই শীর্ষ শিল্প গ্রুপের অধীনে কটন স্পিনিং মিল, আয়রন ফ্যাক্টরি, গ্গ্নাস ফ্যাক্টরি, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, অয়েল মিল, বিড়ি ফ্যাক্টরি, সোপ ফ্যাক্টরি ও জাহেদ মেটালসহ অর্ধশত কলকারখানা গড়ে উঠেছিল। তাজমা সিরামিক নামে একটি সিরামিক কারখানাও চালু হয়েছিল। ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নানা কারণে একে একে রুগ্ণ হতে শুরু করে। আশির দশকের মাঝামাঝি নাগাদ একে একে সবগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

যেভাবে ঘুড়ে দাঁড়ানো : ষাটের দশকে গড়ে ওঠা আয়রন বা মেটাল শিল্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের কেউ কেউ ব্যক্তি উদ্যোগে নিজ নিজ বাড়িতে লৌহজাত পণ্য তৈরির ছোট ছোট কারখানা গড়ে তোলেন, যা ফাউন্ড্রি বা ঢালাই কারখানা নামেই পরিচিত। এসব কারখানায় প্রথমে সরিষার তেলের ঘানি তৈরি করা হয়। পরে রান্নার কড়াই, পণ্যের ওজন মাপার বাটখারা, কৃষি কাজে ব্যবহৃত কোদাল এবং মাছ ধরার জালের কাঠিসহ আরও কয়েক ধরনের পণ্যের উৎপাদন শুরু হয়। বগুড়া শহরের সূত্রাপুর এলাকার প্রাচীন ফাউন্ড্রি কারখানা ‘হক মেটালে’র স্বত্বাধিকারী হুমায়ুন হক জানান, উৎপাদিত এসব পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেলে পরে ফাউন্ড্রি কারখানার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বাড়ে উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণও।

আশির দশকের শেষ দিকে সেচযন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে গেলে বগুড়ার ফাউন্ড্রি শিল্পের উদ্যোক্তারা ওই যন্ত্রের সঙ্গে ব্যবহৃত পানি উত্তোলক ‘সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প’ তৈরি শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে হস্তচালিত নলকূপও তৈরি করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে সব ধরনের হুইল (চাকা), পাওয়ার ট্রিলারের (কলের লাঙল) বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ, লেদ মেশিনের যন্ত্রাংশ, করাত কল (স’ মিল), চিড়া তৈরির কল, অটো রাইস মিলের যন্ত্রাংশ, ফ্লাওয়ার মিলের যন্ত্রাংশ, টেক্সটাইল মিলের যন্ত্রাংশ, মোটরগাড়ির স্প্রিং, ব্রেক ড্রাম, গ্রান্ডিং মেশিন, অয়েল মিল ও জুট মিলের যন্ত্রপাতি তৈরি শুরু হয়। বর্তমানে শহর এবং শহরতলিতে অন্তত বড় ধরনের ৩৯টি ফাউন্ড্রি কারখানা গড়ে উঠেছে। বলা যায়, ফাউন্ড্রি শিল্পের হাত ধরেই শিল্পনগরী বগুড়া আবারও যেন প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে।

বড় শিল্পের সংখ্যা ও বিনিয়োগের পরিমাণ :বগুড়া চেম্বারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ২৪টি জুট মিল, ২৮টি অটোরাইস মিল, ৫টি পেপার মিল, ৩টি অটো ব্রিকস কারখানা, ৩০টি কোল্ড স্টোরেজ, ২টি রাইস ব্র্যান অয়েল মিল ও একটি টাইলস কারখানা গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া আরও দুটি টাইলস কারখানা, একটি গ্গ্নাস ফ্যাক্টরি, একটি রাইস ব্র্যান অয়েল মিল এবং চারটি পেপার মিল নির্মাণাধীন রয়েছে।

বগুড়া ব্যাংকার্স ক্লাবের সহসভাপতি ও ব্যাংক এশিয়ার রিজিওনাল ম্যানেজার মোজাফফর রহমান জানান, বগুড়ায় সরকারি-বেসরকারি মোট ৪৪টি ব্যাংক এবং আরও ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শিল্প খাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। চেম্বার নেতাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বগুড়ায় নির্মিত কলকারখানায় বছরে নানা ধরনের অন্তত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হয়।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসার :বগুড়ায় গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোর মধ্যে জেলার আদমদীঘির তাঁত শিল্প এবং শেরপুর ও ধুনট এলাকায় গড়ে ওঠা জালি টুপি (কুরুশ কাঁটা দিয়ে তৈরি) পল্লীর বিস্তৃতি ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। এই শিল্পের উদ্যোক্তা ‘জুয়েল ক্যাপ ডিপো’র স্বত্বাধিকারী জুয়েল আখন্দ জানান, উৎপাদিত এসব টুপির প্রায় ৮০ ভাগই বিদেশে বিক্রি হচ্ছে।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন জানান, বগুড়ায় কলকারখানায় উৎপাদিত অনেক পণ্য এখন বিদেশে রফতানি হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো_ পাটজাত পণ্য, রাইস ব্র্যান অয়েল এবং জমি সেচ কাজে ব্যবহৃত পানির পাম্প। গত বছর বগুড়া থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ রফতানি আরও কয়েকগুণ বাড়বে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।