শুল্কমুক্ত হচ্ছে চাল আমদানি

বাজার স্থিতিশীল রাখতে চাল আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের শুল্ক তুলে দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মঙ্গলবার খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দেয়া হয়েছে। এনবিআর থেকে শিগগিরই এ সংক্রান্ত আদেশ জারির সম্ভাবনা আছে। এর পর থেকেই দেশে শুল্কমুক্ত চাল আমদানি শুরু হবে। এর আগে খাদ্য অধিদফতর চাল আমদানি শুল্ক তুলে দেয়ার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব দেয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. কামরুল ইসলাম মঙ্গলবার নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বের কোনো দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক নেই। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজি বন্ধ ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাল আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। এখন বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং বাজারে চালের সরবরাহ বাড়াতে আমদানি শুল্কমুক্ত করা হচ্ছে। এতে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি বাড়লে বাজারে চালের দাম কমবে।
এনবিআর চেয়ারম্যানকে লেখা চিঠিতে বলা হয়, বিগত কয়েক বছরে ধানের বাম্পার ফলনের কারণে বাংলাদেশ চালের ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়। এতে চালের মূল্য কমতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে দেশে চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়। এর অংশ হিসেবে সরকার চাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপ করে। এতে চালের দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে গিয়ে স্থিতিশীল হয়। কিন্তু চলতি বছর হাওর এলাকায় পাহাড়ি ঢল এবং অকাল ভারি বর্ষণে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ সিলেট বিভাগের হাওর অঞ্চলে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, ঝড় ও নিচু এলাকার ফসলডুবিসহ নানা কারণে টার্গেট অনুযায়ী বোরো ফসল ঘরে তোলার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে উত্তরবঙ্গ ছাড়া দেশের সর্বত্র বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এ সময় চালের দাম কমার কথা থাকলেও চলতি বছর কিছুটা ভিন্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বোরো ধান ক্ষতির সুযোগে চালের দাম বেড়ে বাজারে অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে বলা হয়, ঝড় ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় ফসলের গুণগত মান ও পরিমাণ নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও আলোচনায় এ পরিস্থিতি প্রতিকূলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। চিঠিতে বাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চাল আমদানিতে আরোপিত শুল্কের হার সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, আমরা প্রথমে আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে নামিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। পরে আমাদের মতামত চাওয়া হলে নানা বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব দেই। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
কেন শুল্ক তুলে দেয়া হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে বদরুল হাসান বলেন, হাওরের ক্ষয়ক্ষতিকে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা চালের বাজার অস্থিতিশীল করছে। হু হু করে বাড়ছে চালের দাম। গণমাধ্যমে হাওর এলাকার ক্ষয়ক্ষতির বিষয় ব্যাপক প্রচার হওয়ায় মানুষের মধ্যে মজুদ প্রবণতা বাড়ছে। যার পাঁচ কেজির প্রয়োজন তিনি ২০ কেজি মজুদ করছেন। ব্যবসায়ীরাও এ সুযোগে মজুদ বাড়াচ্ছেন। ২৫ শতাংশ শুল্ক থাকায় বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি একদম কমে গেছে। ফলে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই মূলত চাল আমদানি শুল্কমুক্ত করা হচ্ছে।
চালের আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে শুল্কহার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়। এর সঙ্গে ৩ শতাংশ যোগ হয় রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি)। ফলে ব্যবসায়ীদের ২৮ শতাংশ শুল্ক গুনতে হচ্ছে। এতে গত দেড় বছর ধরে চাল আমদানি প্রায় বন্ধ। ব্যবসায়ীরা শুল্ক কমানোর জন্য সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে বিভিন্ন সময় দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়নি। এবার হাওর এলাকায় অকালবন্যাসহ অতিবৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বোরো ধানের ক্ষতির বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে। এ অবস্থায় আমদানি শুল্ক তুলে দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। এ প্রসঙ্গে বলা হয় শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে বেসরকারি আমদানিকারকরা চাল আনবে। বাজারে সরবরাহ বাড়বে। চালের দাম কমবে। ফলে এ নিয়ে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পাবে না।
জানা গেছে, গত ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারের মোট মজুদ ছিল পাঁচ লাখ ১৩ হাজার টন। এর মধ্যে চাল রয়েছে তিন লাখ ২০ হাজার টন এবং গম এক লাখ ৯৩ হাজার টন। গত বছর এই সময়ে মোট মজুদ ছিল ১০ লাখ ৫৭ হাজার টন। এর মধ্যে চাল সাত লাখ ৫৮ হাজার টন এবং গম ২ লাখ ৯৯ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, অকাল বন্যায় নষ্ট হয়েছে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর বোরো ধান। এতে ছয় থেকে সাত লাখ টন চাল কম উৎপাদন হবে। তবে হাওর নিয়ে কাজ করা একাধিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মে’র মতে, হাওর এলাকায় বোরো ধানের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তাতে এবার প্রায় ১৫ লাখ টন চাল কম পাওয়া যাবে।

Views: 40