নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে অনুকরণীয় বাংলাদেশ

মহাশূন্য থেকে বিশাল এ ধরিত্রীর সর্বত্রই এখন নারীর জয়জয়কার। এরই ধারাবাহিকতা আমাদের এ উন্নয়নশীল বাংলাদেশেও। ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলোতেও আজ নারীরা অবলীলায় পদচারণা করে চলেছে তাদের নিজস্ব মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে। বাংলাদেশের নারীর চারপাশে নানা সঙ্কট। রাজনৈতিক সহিংসতা ও শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই এগিয়ে যাচ্ছে তারা। এগিয়ে চলেছে আপন শক্তিতে, অর্জন করেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে সঙ্গে নারীরা আজ বিমান চালাচ্ছে জয় করেছে এভারেস্টেও। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে এগিয়ে আছে নারীরা। শিক্ষা-দীক্ষায়, ক্রীড়ায়, নৈপুণ্যে পুরুষের পাশাপাশি সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। সামরিক বাহিনীতেও তাদের সুদৃঢ় অবস্থান। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন এখন একটি আলোচিত বিষয়। দীর্ঘ সময় পুরুষশাসিত সমাজে মনে করা হতো নারীরা শুধু ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকবে পরিবার ও সন্তান সামলাবে। এক কথায় নারীদের খুব দুর্বল ভাবা হতো। এমনকি পঞ্চাশের দশকের আগে অনেক উন্নত দেশে নারীর ভোটাধিকার ছিল না। আবার অনেক দেশে ভোট দেয়ার সুযোগ থাকলেও প্রার্থী হিসেবে নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি ছিল না। সত্তরের দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়া প্রায় সব দেশেই নারী ভোটাধিকার পায়। সৌদি আরবের নারীদের ২০১৫ সালে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পৌর নির্বাচনে তারা প্রথমবারের মতো ভোট দেন। বর্তমানে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নারীরা এখন বাইরে আসতে শুরু করেছে। চাকরি-বাকরি, খেলাধুলাসহ নানা কাজে অংশ নিচ্ছে দেশ-বিদেশে। তবে বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে অনুকরণীয়। বিশ্বের সবচেয়ে উদার গণতন্ত্র আর বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এখনও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি কোন নারী। যদিও এবার অনেকে মনে করেছিলেন হিলারি হয়ত বা প্রথমবারের মতো আমেরিকায় নারী প্রেসিডেন্ট হবেন কিন্তু তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হেরে যান। অথচ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের এই অবস্থায় পৌঁছার বহু আগেই দেশ পরিচালনায় নেতৃত্বে এসেছেন বাংলাদেশের নারী। গত প্রায় ২৬ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদের বাইরে থাকা প্রধানবিরোধী দলের নেতাও নারী। জাতীয় সংসদের উপনেতা, স্পীকার , একাধিক মন্ত্রী, এমপি, সচিব, রাষ্ট্রদূত, ব্যাংকের এমডি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন নারী। এমনকি বিভিন্ন বাহিনীতেও নারী সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। তবে অন্য যে কোন পেশার চেয়ে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি। বিশ্বে আর কোন দেশের রাজনীতিতে নারীর এত উচ্চাসন নেই। এর স্বীকৃতি মিলছে বিশ্বজুড়েও। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ অনেক উন্নত দেশকেও পেছনে ফেলেছে। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সূচকে দেশের অবস্থান নবম এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অষ্টম। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে শীর্ষে রয়েছে আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নিকারাগুয়া, আয়ারল্যান্ড ও রুয়ান্ডা। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী নারীর অগ্রগতির নানা সূচকে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি নারীর স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। নারীর ক্ষমতায়ন একটি মৌলিক বিষয়। তারাও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উপার্জন ক্ষমতা ও রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার রাখেন। নারী শিক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে নন্দিত। প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিশু ভর্তির হার বিবেচনায় বিশ্বে এ দেশের অবস্থান আরও ৬২ দেশের সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রথম। নারীর মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে রয়েছে। তবে উচ্চশিক্ষায় অনেক পিছিয়ে। অনেকে ধারণা করেন নিরাপত্তার অভাবে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা স্তরে পা রাখার আগেই বেশির ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। তাছাড়া দারিদ্র্যতাসহ নানা কারণে উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর হার কম বাংলাদেশে। অর্থনৈতিক কর্মকা-েও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে বাংলাদেশে। তবে তা এখনও কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছায়নি। নারীর অগ্রযাত্রার মধ্যেও নারী উন্নয়নে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে দেশে।

এখনও ঘর থেকে বের হলে নিরাপত্তাহীন তারা। মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে নারীরা আরও উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে যাবে। শুধু দেশে নয় বিদেশেও বহু বাঙালী নারী তাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তিন বাঙালী কন্যা বর্তমানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও প্রতিনিধিত্ব করছেন। বর্তমানে নারীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মেয়েরা দেশে ও বিদেশে আরও বহু সুনাম বয়ে নিয়ে আসবে। তাদের হাত ধরে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে সামনের দিকে।