এশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন বাঘ বাংলাদেশ

তলাবিহীন ঝুড়ির সেই গল্পকে জাদুঘরে পাঠিয়ে এশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন বাঘ বা ‘এশিয়ান টাইগারস’ হিসেবে যেসব দেশের নাম উচ্চারিত হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম দেশটির নাম বাংলাদেশ। ১৯৬০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুবাদে একসময় ‘এশিয়ান টাইগারস’ বা ‘এশিয়ার বাঘ’ বলতে সাধারণত হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানকেই বোঝাত। এই ধারণা এখন অনেক পাল্টেছে। কেননা এক দশক ধরে এশিয়ায় যে কয়েকটি দেশের অর্থনীতি সবচেয়ে ভাল অবস্থায় রয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম একটি। কোন নিজস্ব বা দেশীয় বিশ্লেষণ নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিজনেস ইনসাইডারের সহযোগিতায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘দেয়ার কুড বি এ্যা নিউ ‘এশিয়ান টাইগার’, হেয়ারস হোয়াই’ শীর্ষক নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে এশিয়ার অর্থনীতির নতুন বাঘ হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাবের সম্ভাবনার কথা। বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও সূচকে দেখা গেছে, বিশ্বের দ্রুত উন্নতি লাভ করা ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ এশিয়ার ১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কারণ বাংলাদেশ তার ধীরগতির অর্থনৈতিক অগ্রগতি আর ভারতের তুলনায় অর্ধেক আয় নিয়েও প্রায় সমান উন্নতি করেছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নতির মাপকাঠিতে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বস্ত্র শিল্পে অসামান্য সাফল্য লাভ এবং ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাংলাদেশ তার অগ্রগতিকে অব্যাহত রাখতে পেরেছে।

একটি দেশের মানুষের আশাবাদী হওয়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করে যেমন- জাতির মননে জয়ের স্বপ্ন দেখানো এবং তার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া। দেশের টাকায় পদ্মা সেতুর মতো এত বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ বাংলাদেশের জনগণের মানসপটে নতুন নতুন স্বপ্ন পূরণের আশাবাদ জাগ্রত করেছে। মেট্রোরেল, সর্বোচ্চ গতির ইলেক্ট্রিক ট্রেন, ফ্লাইওভার নির্মাণ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, মোবাইল, ইন্টারনেট, মহাকাশযান প্রভৃতি উন্নয়ন প্রকল্প দেশের তরুণ সমাজকে সমৃদ্ধির পথে আন্দোলিত করছে। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে- যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইন ও গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আর দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েনের পরও আশাবাদী বাংলাদেশের মানুষ। আশাবাদ গ্যালাপের সূচকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়ে আশাবাদী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আমরা জানি, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সিঙ্গাপুরের চেয়ে বাংলাদেশের ধনী দেশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি চীনের চেয়েও উন্নয়ন করতে পারে বাংলাদেশ। সিঙ্গাপুরের চেয়ে বাংলাদেশের ধনী রাষ্ট্র হওয়া খুব সম্ভব। এর কারণ আশপাশের দেশগুলোকে তাদের যোগাযোগ রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশকে মাধ্যম হিসেবে না নেয়ার কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশের যে সব বেঙ্গল রয়েছে কিন্তু চীনের নেই। তারপরও চীন শক্তিশালী দেশ।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করলে দেখা যাবে গত পঞ্চাশ বছর আগে জাপানও অতিদরিদ্র অর্থনৈতিক অবস্থানে ছিল। জাপানীরা পৃথিবীর অনেক মানুষের কাছ থেকে ‘অতি পরিশ্রমী’ হিসেবে বিদ্রুপও শুনেছে। কিন্তু দরিদ্র অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে পরিশ্রম করে গেছে। জাপানের উত্থান নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন হলোÑ ‘প্রতিকূলতাই জাপানীদের জন্য আশীর্বাদ। ক) একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ এলাকায় বিপুল জনগণের বসবাস ছিল জাপানীদের প্রথম আশীর্বাদ। বাঁচার তাগিদে প্রচ- রকমের কর্মপ্রেরণা এবং প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল তাদের মধ্যে। খ) কোন প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকাটা ছিল জাপানীদের জন্য দ্বিতীয় আশীর্বাদ। ফলে জাপানীরা সারা পৃথিবীর অঢেল সম্পদ আহরণে সচেষ্ট হয়েছিল। গ) দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে সব শিল্প কারখানা ধ্বংস হয়ে যাওয়াটা ছিল জাপানীদের জন্য তৃতীয় আশীর্বাদ। পরে নতুন এবং অত্যাধুরিক পদ্ধতিতে তারা শিল্প কারখানা গড়ে তুলল। আমরা জানি- চায়নারা রাষ্ট্রের কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা এ চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে। এটাই চায়না শিল্প বিপ্লবের অন্যতম ভিত্তি। আশির দশক থেকে চীনে ছোট ছোট ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়। ফলে বাজার অর্থনীতির দ্রুত প্রসার ঘটে। চীন তার বাজার উš§ুক্ত করে দেয় বিদেশি পুঁজি ও টেকনোলজির জন্য। বিদেশী বিনিয়োগের জন্য বিশেষ কিছু শিল্প এলাকা তৈরি করে। এর ফলে লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। যা চীনকে একটি কৃষিনির্ভর রাষ্ট্র থেকে শিল্পনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে। সমাজ ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় ৩টি বিষয়কে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে চায়না নেতৃত্ব- ১. দুর্নীতি, ২. শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের সম্পদের ব্যবধান এবং ৩. পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা। কম দাম, গ্রহণযোগ্য মান, প্যাকিং ও পণ্যের বৈচিত্র্যে চীন এখন একচেটিয়া ব্যবসায়িক প্রাধান্য বিস্তার করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীন বিশ্বের ৩০ শতাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করবে।

সিঙ্গাপুরের কথা চিন্তা করলে দেখা যাবে মাত্র ৫০ বছর আগেও সিঙ্গাপুর ছিল একটি হতদরিদ্র দেশ। তখন সিঙ্গাপুরকে ‘কলোনি অব কুলিজ’ বলে উপহাস করা হতো। কালপরিক্রমায় সেই দেশটির মাথাপিছু আয় এখন প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি। গত চল্লিশ বছরে সিঙ্গাপুরে জাতিগত বা ধর্মীয় কোন দাঙ্গা হয়নি। সামান্যতম উস্কানিও সেখানে কঠোরভাবে দমন করা হয়। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ নিজের লেখা বইতে বলেছেন- মালয়েশিয়া যখন সিঙ্গাপুরকে পৃথক করে দিল, তখন মনে হলোÑ ‘ইট বিকাম এ হার্ট উইদাউট বডি’। সেই অনিশ্চিত সিঙ্গাপুর এখন দুনিয়ার ‘সিটি স্টেট’ হিসেবেই পরিচিত। মালয়েশিয়ার দিকে তাকালে ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত দারিদ্র্যপীড়িত বৃক্ষমানব দেশ। মাহাথির মোহাম্মদ মন্ত্রীদের কাছে ব্যবসায়ী সমাজের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করলেন। এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ মালয়েশিয়াকে বাণিজ্যবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করে। ফলে দেখা গেছে, শুধু টিন ও রাবার রফতানিকারক দেশ মালয়েশিয়া মাত্র দুই দশকে ইলেক্ট্রনিক, ইস্পাত, যন্ত্রপাতি এমনকি মোটরগাড়ি রফতানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

আমাদের দেশেও শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশ ও জনগণের সম্পদ। একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে শুধু মালিক বা উদ্যেক্তারা লাভবান হয় না। লাভবান হয় দেশের মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র। আমাদের দেশের ইতিবাচক শিল্প-উদ্যোক্তাদের নিয়ে ১০ বছরের একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলেÑ পাল্টে যাবে দেশের চেহারা। দেশের জনগণ এবং দেশের সম্পদকে কাজে লাগানো। দেশের অপচয়, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, কালো টাকার লাগাম টেনে ধরা। উন্নত দেশগুলো যদি আমাদের দেশের কালো টাকা সাদা করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারবোনা। কালো টাকা উপার্জনের লাগাম টেনে ধরে এ পর্যন্ত দেশে যে পরিমাণ কালো টাকা আছে আগামী ১০ বছরের জন্য বিনা বাঁধায় সেসব টাকা খাতওয়ারি বিনিয়োগ সুবিধা দেয়া দরকার। শিল্প-কল-কারখানা গড়ে তুলতে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ সহায়তা দেয়া। কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সুবিধা ও তাদের ন্যায্য মূল্য দিয়ে উৎপাদন বাড়ানো। তরুণ সমাজকে উপযোগী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। নতুন, তরুণ, দেশপ্রেমী এবং ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন নেতৃত্ব সৃষ্টি করা। সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা। আমরা জানি, দারিদ্র্য দূর করার উপায় হলো ভাল জিনিস সস্তায় উৎপাদন করে বিক্রয় করা। চায়নারা সেটা করে দেখাতে পেরেছে। অথচ আমরা কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরাকে শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি না। জিঞ্জিরা দুই নম্বর বা নকল জিনিস তৈরির এলাকা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। যারা নিজেদের চেষ্টায় নকল পণ্য তৈরি করতে পারছে তাদের সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে উন্নতমানের দেশীয় পণ্য তৈরির কাজে লাগানো। ধোলাই খালের অশিক্ষিত শ্রমিকদের প্রশিক্ষিত করে ধোলাই খালকে শিল্প এলাকায় পরিণত করা। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এসব কিছুই সম্ভব। দেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শিল্প পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ধ্বংস হতে যাচ্ছে। এসব শিল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয়া দরকার। এভাবে ছোট ছোট শিল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রাখলে মানুষেরা খেতে পারবে।