সম্ভাবনার নাম ফলের রাজা আম

কাঁচা ও পাকা আম উভয়ই জনপ্রিয় ও শরীরের জন্য উপকারী। আম খেতে পছন্দ করে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। দেশি ফলের মধ্যে শীর্ষ জনপ্রিয় এই ফলটি জাতীয় ফলের খেতাব না পেলেও এর জনপ্রিয়তা সবসময়ই তুঙ্গে। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই আমের ফলন হলেও রাজশাহীর আমের আছে অনেক সুনাম। আনন্দের সংবাদ হলো বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আমের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে রপ্তানি তালিকায় নতুন যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের কৃষিজ পণ্য আম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন আশার পথ উন্মোচন করেছে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম আম উৎপাদনকারী দেশ। বেশি রপ্তানি না হলেও, বিশ্বের অনেক দেশে যেখানে বাংলাদেশিরা আছেন তাদের চাহিদা পূরণে সরবরাহকৃত বাংলাদেশের আম বিভিন্নভাবে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। আমের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন এস এম মুকুল

বিশ্ববাজারে বাংলার আম
আশা জাগানিয়া খবরটি হলো_ গত বছর বাংলাদেশের ল্যাংড়া ও আম্রপালি যুক্তরাজ্যে প্রথমবারে রপ্তানি হয়েছে। এ খবরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর ও পশ্চিমের জেলাগুলোর আমচাষিদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি হয়। এবছর দেশের ৭ জেলার ৯ উপজেলা থেকেও আম রপ্তানি করা হবে। এফএওর তথ্য মতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আম রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনাটি হলো_ বাংলাদেশের আম যখন পাকে তখন বিশ্ববাজারে অন্য কোনো দেশের আম আসে না। যুক্তরাজ্যের ক্রেতারা বিশ্বের অন্যতম সুস্বাদু ফল হিসেবে বাংলাদেশের আমকে বেশি পছন্দ করেন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারলে বছরে ১ হাজার টন আম রপ্তানি করা সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে সাতক্ষীরার আম রপ্তানি শুরুর পর প্রতি সপ্তাহে ৪ মণ করে অন্য জেলার আম যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি হবে। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও আম পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আম উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আম হতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজার মিলিয়ে গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৮২১ টন আম রপ্তানি হয়েছে। বাংলাদেশ আম উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী সমিতি এ বছর তিন হাজার টন আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা করছেন।

আমনির্ভর জুসশিল্প
রাজকীয় ফল আম পুষ্টিগুণের জন্য তো বটেই লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবেও জাতীয় অর্থনীতি শক্ত ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ আম উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী সমিতি হিসেবে, দেশে বর্তমানে আমের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার। আম ফলের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে জুসশিল্প। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমের জুস এখন রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বর্তমানে দেশ ও রপ্তানি মিলে জুসের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার। জুসের বাজারে প্রাণ-আরএফএল, আকিজ, একমি, সজীব, ট্রান্সকম ও পারটেক্স গ্রুপ এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের জুস রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। আরব আমিরাত, আবুধাবি, দুবাই, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান ছাড়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশ ইতালি, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশি জুসের বাজার রয়েছে।

আমের হাট কানসাট
দেশের এবং রাজশাহী জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম বা হাট কানসাট। সড়কপথে এটাই সবচেয়ে বড় আমের বাজার। কানসাটের বিস্তর এলাকাজুড়ে মৌসুমে বসে বিশাল আমের বাজার। প্রতিদিন শত শত ট্রাক আম এখান থেকে যায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র। এরপরেই গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর বাজার আমের অন্যতম মোকাম। তবে এখানে বরেন্দ্র অঞ্চলে উৎপাদিত গুটি আমের আধিক্য বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় প্রত্যেকটি পাইকারি আমের বাজারে ৪০ কেজিতে ১ মণের স্থলে ৪৫ থেকে ৫০ কেজিতে ১ মণ হিসেবে আম বিক্রি হয়। অবাক করা বিষয় হলো_ শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে কেন্দ্র করে বছরে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। বছরে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ছয় কোটি টাকার দুই লাখ আমের চারা। আমবাগান বৃদ্ধির পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত কর্মজীবীর সংখ্যাও বাড়ছে। আমের মৌসুমে এখানে ৮ থেকে ১০ লাখ লোক আমগাছ পরিচর্যা, বাগান পরিষ্কার রাখা, আম সংগ্রহ, বিক্রি ও পরিবহন ইত্যাদি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।

রঙিন আম বাহারি নাম
রং, স্বাদ, ঘ্রাণের কারণে আমকে বলা হয় ফলের রাজা। আমে আছে_ পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সালফার, ক্লোরিন, কপার, আয়োডিন, ক্যারোটিন বা ভিটামিন ‘এ’-এর পূর্বসূরি উপাদান, ভিটামিন বি-১, বি-২, সি এবং খনিজ উপাদান যেমন ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এমন প্রোটিন, অাঁশ ও ক্যালোরির পরিমাণও রয়েছে বেশি। আম শরীরের রক্ত পরিষ্কার রাখে, পটাশিয়ামের অভাব পূরণ করে, লিভার ভালো রাখে, এসিডিটি নিয়ন্ত্রণ করে, ত্বক উজ্জ্বল করে, দাঁতের রোগ প্রতিরোধ করে, ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে, কিডনির সমস্যা নিরসন করে। ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফজলি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, ক্ষীরসাপাত এজাতীয় কিছু আম ছাড়া সব আমকেই গুটি জাতের আমের কাতারে ফেলা হয়। সচরাচর পাওয়া যায় এমন আমের মধ্যে আছে ফজলি, গোপালভোগ, মোহনভোগ, জিলাপিভোগ, লক্ষণভোগ, বৃন্দাবনী, চন্দনী, হাজিডাঙ্গ, বোম্বাই ক্ষীরভোগ, মিছরিভোগ, সিঁদুর প্রভৃতি। এ ছাড়া গিরিয়াধারী, বউভুলানী, জামাইপছন্দ, বাদশাভোগ, রানীভোগ, দুধসর, মিছরিকান্ত, বাতাসা, মধুচুসকি, রাজভোগ, মেহেরসাগর, কালিভোগ, সুন্দরী, গোলাপবাস, পানবোঁটা, দেলসাদ, কালাপাহাড় প্রভৃতি জাতের। প্রচলিত আছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩০০ জাতের আম পাওয়া যায়। তবে তার অনেক এখন বিলুপ্তপ্রায়। এসব জায়গা দখল করেছে মলি্লকা, আম্রপালি প্রভৃতি জাতের আম।

আম তত্ত্ব
প্রচলিত আদি প্রজাতি ছাড়াও বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বেশকিছু জাতের আম ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সুদর্শন, সুস্বাদু জনপ্রিয়তার কারণেই আম ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের জাতীয় ফল। বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ হিসেবে আমগাছের স্বীকৃতি নতুন আশা জাগিয়েছে। সরকারি হিসেবে মৌসুমে দেশের মানুষ গড়ে তিন কেজি করে আম খায়। বাংলাদেশের মাথাপিছু আম উৎপাদনের পরিমাণ দেড় কেজি। ভারত ও পাকিস্তানে এ হার যথাক্রমে ১১ ও ৬ কেজি। তানজানিয়ায় মাথাপিছু উৎপাদন ৭ কেজি, সুদানে সাড়ে ৭, ফিলিপাইনে ৬ ও জায়ারে ৫ কেজি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের হিসাবে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৮০০ জাতের আম চাষের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর বাইরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ১১টি ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ২১টি আমের জাত উদ্ভাবন করেছেন।

আমের রাজধানী
আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থানকারী চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমচাষ হয়। পরের অবস্থানটি রাজশাহীতে ১৬ হাজার ৫১৯ হেক্টর জমিতে আমচাষ হয়। একারণে এই দুই জেলাকে আমের রাজধানী বলা হয়। তবে আশির দশক থেকে চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, নড়াইলেও বাণিজ্যিকভাবে আমচাষ বিস্তার লাভ করে। গত কয়েক বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামেও আমচাষ দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। এর প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে_ বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে এ বছর প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আমচাষ হয়েছে। এ ছাড়া পঞ্চগড়, নাটোর, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও, পাবনা, দিনাজপুর, রংপুর, যশোর, গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুরেও বাণিজ্যিকভাবে আমচাষ হচ্ছে বলে জানা গেছে। জানা গেছে, জেলায় সবচেয়ে বেশি আমের চারা বিক্রি হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়। এখানে স্বউদ্যোগে শতাধিক বিশেষায়িত নার্সারি গড়ে উঠেছে। ২৫০ প্রজাতির আমের মধ্যে বেশির ভাগেরই চারা পাওয়া যায় এই উপজেলার শাহবাজপুর এলাকার ধোবড়া বাজারে। এখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও দেশের তিন পার্বত্য জেলায়ও আমের চাষ হচ্ছে। একই প্রজাতির হলেও আবহাওয়া ও মাটির পার্থক্যের কারণে আম পাকার সময় ৭ থেকে ১০ দিনের ব্যবধানে হয়। বর্তমানে দেশের ২৫টি উপজেলার চাষিদের আমচাষে সহায়তা দিচ্ছে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন_ আম রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে হলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে অধিক উৎপাদনশীল আমগাছ লাগাতে হবে। উন্নতজাতের মিষ্টি ও সুস্বাদু আমের চাষ বাড়াতে হবে। আমচাষে কৃষকদের সতর্কতা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আমচাষিদের জন্য সহজশর্তে ঋণ প্রদানের ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

উৎপাদনের অগ্রগতি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হারে আমের ফলন বাড়ছে। ২০১২ সালে দেশে ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান ছিল। এ বছর আমচাষ হয়েছে ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০০৫ সালেও বাংলাদেশে মাত্র আড়াই লাখ টন আম উৎপাদন করে বিশ্বের ১৪তম উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ছিল। বিশ্বের অষ্টম আম উৎপাদনকারী দেশটি গত দুই বছরের মধ্যে উৎপাদন বেড়ে ১০ লাখ টনে উন্নীত হয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম স্থানে। জানা গেছে_ দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি আমগাছ রয়েছে। আশার খবর হলো_ কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রতিবছর নতুন করে আট হাজার হেক্টর জমি আমচাষের আওতায় আসছে। বছরপ্রতি আম উৎপাদন বাড়ছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন। উল্লেখ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী একটি প্রতিষ্ঠান নাটোরে ১০০ কোটি টাকায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন আম কেনার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এ মৌসুমে আম সংগ্রহ ও পাল্পিং কার্যক্রম শুরু করেছে। নাটোরে প্রতিষ্ঠানটির কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় এখানে প্রায় ৫ হাজার লোকের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।