নীড় অর্থনীতি ফল উৎপাদনে শীর্ষে আম

ফল উৎপাদনে শীর্ষে আম

উঁচু ও লাল মাটি কাঁঠাল চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মাটির এ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই কাঁঠাল উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে সাভার, গাজীপুর, নরসিংদী ও টাঙ্গাইল অঞ্চল। এসব অঞ্চলের জোগানের ওপর ভর করে বরাবরই ফল উৎপাদনের নেতৃত্বে ছিল কাঁঠাল। ফল উৎপাদনের সে চিত্রে এখন পরিবর্তন এসেছে। কাঁঠালকে ছাড়িয়ে উৎপাদনের শীর্ষে এখন আম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয়েছে ১১ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৫ টন। একই সময়ে কাঁঠাল পাওয়া গেছে ১০ লাখ ৩১ হাজার ১৫৩ টন। এর আগে একবারই কেবল উৎপাদনে কাঁঠালকে ছাড়িয়েছিল আম।
শুধু কাঁঠাল নয়, সব ধরনের ফলের মধ্যেই আম উৎপাদন এখন সবচেয়ে বেশি। অন্যান্য প্রধান ফলের মধ্যে দেশে কলা উৎপাদন হচ্ছে প্রায় আট লাখ, তরমুজ তিন লাখ এবং আনারস ও পেয়ারা দুই লাখ টন করে। এছাড়া পেঁপে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় দেড় লাখ টন। অন্যান্য ফল মিলে দেশে ফলের উৎপাদন বছরে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন, সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোয় আবাদ বৃদ্ধি ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণের কারণেই মূলত আম উৎপাদন বাড়ছে।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি বছর ফলদ বৃক্ষের যে চারা বিতরণ করা হয়, তার সিংহভাগই আমের জাত। এছাড়া গত কয়েক বছর পাহাড়ি অঞ্চলে কাঠের গাছের পরিবর্তে ব্যাপক হারে আমগাছ লাগানো হয়েছে। নার্সারি উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি আমের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে চাহিদা সৃষ্টি করতে প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশ ঘটানো হচ্ছে।
তবে কাঁঠাল উৎপাদনও ধরে রাখতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের জাতীয় ফল হিসেবে এর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে নতুন জাত আনতে হবে। কেননা ভিটামিন ও পুষ্টি উপাদানে ভরপুর ফলটি স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী।
দেশে বিভিন্ন ধরনের ফলের মধ্যে সর্বাধিক উৎপাদিত আম ও কাঁঠাল।
বিবিএসের তথ্যমতে, দেশে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৮ লাখ ৪২ হাজার টন আম উৎপাদন হলেও কাঁঠাল উৎপাদন ছিল ১০ লাখ ৫ হাজার টন। ২০১০-১১ অর্থবছরে আম ৮ লাখ ৮৯ হাজার ও কাঁঠাল ৯ লাখ ৬২ হাজার টন উৎপাদন হয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে ২০১১-১২ অর্থবছরে। ওই অর্থবছর ৯ লাখ ২৮ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদন হলেও আম উৎপাদন হয় ৯ লাখ ৪৫ হাজার টন। পরের অর্থবছরে আম ও কাঁঠাল উৎপাদন ছিল প্রায় কাছাকাছি। ওই অর্থবছরে আম ও কাঁঠাল উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ও ৯ লাখ ৫৭ হাজার টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আম উৎপাদন ৯ লাখ ৯২ হাজার টন হলেও কাঁঠাল উৎপাদন ছিল ১০ লাখ ৪ হাজার টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও উৎপাদনে এগিয়ে ছিল কাঁঠাল। তবে গত অর্থবছর তাতে ছেদ পড়ে।
দেশে সবেচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হচ্ছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুরুল হুদা বলেন, এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি আম উৎপাদনের জন্য উপযোগী। পাশাপাশি কৃষকের আগ্রহ ও সরকারের সার্বিক সহায়তার কারণে আমের বড় উৎপাদন জোন হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। চলতি বছর জেলার পাঁচটি উপজেলায় আড়াই লাখ টন আম উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, গত বছর যা ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার টন। তবে এখন পর্যন্ত যে আবহাওয়া ও রোদ-বৃষ্টির সমন্বয় হচ্ছে, তাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আম উৎপাদন হতে পারে।
অন্যদিকে কাঠ হিসেবে কাঁঠালগাছের সুনাম থাকায় সহজেই তা বিক্রি হচ্ছে। অনেক কৃষকই কাঁঠালগাছ বিক্রি করে জমিতে অন্যান্য ফল ও ফসল আবাদ করছেন। তাছাড়া গাছটির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যায়ও দুর্বলতা রয়েছে। এসব কারণে উৎপাদনে আমের চেয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে ফলটি।
এছাড়া তুলনামূলক কিছু সুবিধাও আম উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করছে। বিশেষ করে আমের চারা উৎপাদন গ্রাফটিংয়ের মাধ্যমে করা সম্ভব হলেও কাঁঠালের ক্ষেত্রে ফলটির বীজের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে একটি আমের চারা দুই বছরে ফল দেয়ার উপযোগী হলেও কাঁঠালের ক্ষেত্রে এ সময় পাঁচ-সাত বছর লেগে যাচ্ছে। তাছাড়া আম যেকোনো ধরনের জমিতে আবাদ উপযোগী হলেও কাঁঠালের ক্ষেত্রে সেটি সম্ভব নয়। আর এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে আম উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশিষ্ট উদ্যানতত্ত্ববিদ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (এসএইউ) সাবেক উপাচার্য ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) অধ্যাপক ড. এএম ফারুক এ বিষয়ে বলেন, আমের ফুল থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহের আগ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আমের চারা উৎপাদন, বালাই ব্যবস্থাপনা, বিপণন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে বর্তমান জমিতেই আরো বেশি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। দেশের সব জেলায় আবাদ উপযোগী নতুন জাত উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে। মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে পাল্প মেকিং শিল্পকে আরো বিকশিত করার সুযোগ দিতে হবে। সব মিলিয়ে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এগিয়ে এলে আম উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুফলও আসবে।
এদিকে ধারাবাহিক উৎপাদন বৃদ্ধির সুবাদে আম উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দশে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) তথ্য বলছে, ভারত ১ কোটি ৫৫ লাখ টন আম উৎপাদন করে এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। পরের স্থানগুলোয় আছে যথাক্রমে চীন, কেনিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মেক্সিকো, ব্রাজিল, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়া।
দেশে আমের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে ফ্রুট ড্রিংকস শিল্প। বর্তমানে এ শিল্পে এগিয়ে এসেছে প্রাণ-আরএফএল, আকিজ গ্রুপ, একমি, সজীব, ট্রান্সকম ও পারটেক্সের মতো প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর উৎপাদিত আমের ১৫-২০ শতাংশ সংগ্রহ করছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সব জেলায় আম আবাদ বাড়াতে বিভিন্ন জাত উদ্ভাবনে গবেষণা হচ্ছে। এমনকি উপকূলীয় লবণাক্ত ভূমিতেও এখন মিষ্টি আমের চাষ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে বারোমাসি আম উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা করছে। এরই মধ্যে বারি আম-১১ নামের একটি জাত অবমুক্তের চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া দেশে শতাধিক প্রজাতির আম রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টির অধিক প্রজাতির আম টিকে আছে। এসব প্রজাতির মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষীরসাপাত (গোপালভোগ), হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, গোপালভোগ ও বোম্বাই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণ শর্করা, আমিষ, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-বি৬, পটাশিয়াম ও ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস রয়েছে। কাঁঠালের ক্ষেত্রে গালা ও খাজা নামে দুটি জাত সুপরিচিত হলেও এ দুটির মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের ‘রসখাজা’ জাতও পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উচ্চফলনশীল বারি কাঁঠাল-১ (২০০৮) ও বারি কাঁঠাল-২ (২০১০) দুটি জাত অবমুক্ত করেছে।