মাসে ৩০ কেজি চাল ও নগদ পাঁচ শ’ করে টাকা দেবে সরকার

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওড়াঞ্চলের ছয় জেলায় তিন লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি করে বিনামূল্যে চাল ও ৫০০ টাকা অর্থ সহায়তা দেবে সরকার। ১০০ দিন পর্যন্ত এ সহায়তা দেয়া হবে। এছাড়া পরবর্তী ফসল না ওঠা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার সহযোগিতা দেয়া হবে। সচিবালয়ে রবিবার হাওড় এলাকায় সৃষ্ট বন্যার বিষয়ে গৃহীত কার্যক্রম ও করণীয় সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তিনি বলেন, অনেকে ঢাকায় বসে ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছেন। গত ২৫ দিনে কোন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা হাওড়াঞ্চলে গিয়ে পরিদর্শনও করেননি, এক ছটাক গম বা চাল নিয়েও হাজির হননি। খালেদা জিয়াকে অনুরোধ করব, আপানার শরীর খারাপ, অসুস্থ যেতে পরবেন না। যারা মোটাসোটা লোক আছে তাদের পাঠান। তারা দেখে আসুক। অতীতেও আমরা দুর্যোগ মোকাবেলা করেছি। আমাদের আমলে দুর্যোগে কোথাও কেউ না খেয়ে থাকেনি আর থাকবেও না। এদিকে পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, বাঁধ ভেঙ্গে হাওড়ের মানুষের দুর্গতির পেছনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হবে। দুর্নীতি পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বর্তমান বিপদে এ থেকে শিক্ষা নেয়া ছাড়া করার কিছু নেই। হাওড়ে বাঁধ ভাঙ্গার পেছনে যে পরিমাণ আর্থিক দুর্নীতির কথা পত্রিকায় লেখা হচ্ছে তা সঠিক নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।

গত ২৯ মার্চ থেকে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেটের হাওড়াঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে বোরো ফসল। হাজার হাজার মাছ মরে ভেসে উঠেছে। মাছ খেয়ে মারা গেছে হাঁসও। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী বলেন, গত মাসের ২৯ তারিখে পাহাড়ী ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে হাওড়াঞ্চল প্লাবিত হয়। হাওড়াঞ্চলের ছয় জেলার মধ্যে চারটি (সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও সিলেট) জেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অধিকাংশ কৃষকের বেশিরভাগ ফসল নষ্ট হয়েছে। সেখানকার মানুষ একটি ফসলের ওপর নির্ভরশীল। আর ১০-১২ দিনের মধ্যে তারা ফসল ঘরে তুলতে পারতেন। আগাম বন্যা ও বৃষ্টির কারণে তা নষ্ট হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, আজ থেকে শুরু করে ৩১ জুলাই পর্যন্ত তিন মাস ১০ দিন অর্থাৎ ১০০ দিনের কর্মসূচী আমরা হাতে নিয়েছি। আমরা তিন লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে ভিজিএফের আওতায় মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেব। পরিবার ১০ থেকে ২০ হাজার বাড়তেও পারে। এখানে ৩৩ থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন চাল বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। শুধু চাল দিলেই হবে না; তেল, ডাল, নুন, মরিচ কেনার জন্যও টাকা দরকার। সে লক্ষ্যে মাসে ৫০০ করে টাকাও দেয়া হবে। এতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

মায়া বলেন, যারা রিলিফ নেবেন না, যাদের আর্থিক অবস্থা একটু ভাল, সেখানে ছয় জেলায় এক লাখ ৭১ হাজার ৭১৫ পরিবারকে ওএমএসের মাধ্যমে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেয়া হবে। এছাড়া সুলভমূল্যের ১০ টাকা কেজি দরের চালও আমরা অব্যাহত রাখব। খাদ্যের কোন অভাব নেই। কেউ না খেয়ে থাকবে না। ত্রাণের কাজ চালু রেখেছি। খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জে ৮০ থেকে ৮৬ ভাগ এলাকা পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করেছে, তার ভিত্তিতে তারা ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছে।

সেখানে তিন থেকে ছয় মাস খাদ্য দিয়ে সহায়তা করার দাবি ছিল। আমরা বলেছি তিন মাসও না, ছয় মাসও না; যতক্ষণ পর্যন্ত পানি না নামবে, আপনারা ঘরে ফিরে না যাবেন, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে না পারবেন, ততক্ষণ খাদ্য ও নানান সাহায্য আমরা অব্যাহত রাখব। পরবর্তী ফসল না ওঠা পর্যন্ত এ কাজ চালিয়ে যাব, বলেন ত্রাণমন্ত্রী।

ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে কমিটি

সভায় একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের একজন করে যুগ্ম-সচিব এ কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকবেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম-সচিব কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটি দুর্যোগে কী ক্ষয়ক্ষতি, কী করণীয় সবকিছু সরেজমিন দেখে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পেশ করবে। সে পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ব্যবস্থা নিতে থাকব।’

দুর্যোগে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মায়া বলেন, আমরা অনেকে ঢাকায় বসে ফাঁকা আওয়াজ দেই। গত ২৫ দিনে কোন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা হাওড়াঞ্চলে গিয়ে পরিদর্শনও করেননি, এক ছটাক গম বা চাল নিয়েও হাজির হননি। খালেদা জিয়াকে অনুরোধ করব, আপানার শরীর খারাপ, অসুস্থ তাই যেতে পরবেন না। যারা মোটাসোটা লোক আছে তাদের পাঠান। তারা দেখে আসুক।

দুর্গত এলাকা ঘোষণার অবস্থা হয়নি

হাওড়াঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আমি আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করব আপনারা ওই এলাকায় যান। আমরা গেছি, আমরা আবার যাব। ওখানে এমন অবস্থা তৈরি হয়নি যে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হবে। সেখানে অভাব আছে, অভাব আমরা মিটিয়ে দিচ্ছি। কষ্ট আছে, আমরা কষ্ট লাঘবে চেষ্টা করছি।

হাওড়ে ১০৭৬ টন মাছ মারা গেছে

হাওড়ের পানিতে তেজস্ক্রিয়ার বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পানির অবস্থা নিয়ে কোন তথ্য দিয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব মাকসুদুল হাসান খান বলেন, পানিতে পিএইচের (অম্লতা বা ক্ষারতা) স্বাভাবিক মাত্রা ৬ দশমিক ৫ থেকে ৯ পিপিএম। ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত এ মাত্রা ছিল ৫ বা এর নিচে। অক্সিজেনের মাত্রা ছিল দশমিক ০২ পিপিএম। প্রাথমিক পরীক্ষার ফল অনুযায়ী ফসল পচে যাওয়া এবং কিছু কীটনাশক থাকার জন্য মাছ মারা যায়।

পানির পিএইচ ও দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং এ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিষক্রিয়ার জন্য মাছ মারা গেছে। সচিব বলেন, আমরা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। বিসিএসআইআর (বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ) আমাদের সঙ্গে একমত হয়েছে যেম এ কারণেই মাছগুলো মরেছে। এক হাজার ৭৬ টন মাছ মারা গেছে জানিয়ে মৎস্য সচিব বলেন, হাঁস মারা গেছে তিন হাজার ৮৪৪টি।

২ লাখ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট

ফসলের ক্ষতির বিষয়ে কৃষি সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্ বলেন, প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটা চালের হিসাবে ছয় লাখ টনের কাছাকাছি হতে পারে। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। হাওড়ের বাইরে বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হবে। তাই এখানে যেটা ক্ষতি হচ্ছে সেটা পুষিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, আউশ ও আমন চাষের এলাকা বাড়িয়ে দেব। বিভিন্ন প্রণোদনা দেব। এতে উৎপাদন বেড়ে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে কৃষি সচিব বলেন, ধানের ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে মাত্রা ২৮৮ হেক্টর জমিতে। এটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। এতে উৎপাদনে কোন ক্ষতি হবে না। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি পেলে কঠোর ব্যবস্থা

এদিকে পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, বাঁধ ভেঙ্গে হাওড়ের মানুষের দুর্গতির পেছনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি আছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হবে। দুর্নীতি পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বর্তমান বিপদে এ থেকে শিক্ষা নেয়া ছাড়া করার কিছু নেই। হাওড়ে বাঁধ ভাঙ্গার পেছনে যে পরিমাণ আর্থিক দুর্নীতির কথা পত্রিকায় লেখা হচ্ছে, তা সঠিক নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ওই এলাকায় বাঁধ ছিল ৬ দশমিক ৫ মিটার উচ্চতার। কিন্তু পানির উচ্চতা ছিল সাড়ে আট মিটারের মতো। এ রকম পানির চাপ থাকলে অনেক সময় টেকসই বাঁধও টেকে না। কিছু কথা উঠেছে। ক্লাইমেট চেঞ্জের ব্যাপারটা আসছে, আগাম বৃষ্টির প্রশ্ন আসছে। সুতরাং এগুলো থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে পুরো বিষয়টা পর্যালোচনা করতে হবে। বাঁধের উচ্চতা কত রাখব, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের দুর্বিপাক না হয় সেজন্য আমরা এক মিটার হাইট বাড়াব কি-না, বাড়ালে পরিবেশগত অসুবিধা কী হতে পারে, সেটাও দেখতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, ওই এলাকায় বিআর-২৯ ধানের চাষ হয়, যা কেটে ঘরে তুলতে ১৬০ দিন সময় লেগে যায়। সেখানে অন্য প্রজাতির ধান উৎপাদন করা যায় কি-না তাও ভাবতে হবে। বর্ষায় হাওড় এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঘটনা প্রতি বছরই ঘটে। কিন্তু এবার এপ্রিলের শুরুতে উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বাঁধ ভেঙ্গে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওড় এলাকা প্লাবিত হয়।

হাওড়াঞ্চলের দুর্বল ও অসমাপ্ত বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবন ও ফসলহানির পেছনে বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিকে দায়ী করে ঢাকায় মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশ হয়েছে। সুনামগঞ্জের হাওড়ে ২৮টি বাঁধ নির্মাণ না করে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়ার পর ইতোমধ্যে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও খতিয়ে দেখছে জানিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, পত্র-পত্রিকায় যেভাবে ফলাও করে লেখা হচ্ছে ৮০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে, এটা ঠিক নয়। ওই প্রকল্পই ২০ কোটি টাকার। গত বছর সেখানে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় প্রায় ৫০ শতাংশ টাকা কর্তন করা হয়েছিল। কী ধরনের দুর্নীতি গত বছর হয়েছিল জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, বাঁধের কাছ থেকে মাটি কাটার নিয়ম নেই। ওই ধরনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল। এ বছরও যদি কিছু হয়ে থাকে তাহলে আমরা তদন্ত করে দেখব।

গত ২০ বছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ২৯ মার্চ ওই এলাকা প্লাবিত হওয়ার নজির সেখানে নেই। কিন্তু এ বছর ২৯ মার্চ থেকে পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত চার দিনে বাঁধের ওপর অতি উচ্চতায় পানি প্লাবিত হয়। তিনি বলেন, সিলেট-সুনামগঞ্জ এলাকায় বাঁধের জন্য ইতোমধ্যে ৮১২টি জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে। ৫২০টি জায়গায় কৃষকরা নিজেরাই নৌকায় যাতায়াতের জন্য কেটে দিয়ে থাকেন। এটাই সেখানকার রীতি। পরে তারা নিজেরাই আবার বাঁধ ঠিক করে নেন।