সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে

২০১৬ সালে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে। গেল বছর নিট এফডিআই এসেছে ২৩৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৮ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে নিট এফডিআই এসেছিল ২২৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। ফলে গেল বছরে নিট এফডিআই বেড়েছে প্রায় ৯ কোটি ৭৩ লাখ ডলার বা ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ সময় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ এসেছে টেলিকমিউনিকেশন খাতে। আর সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভে প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে শীর্ষে থাকা ২০ দেশের নাম ও সর্বোচ্চ বিনিয়োগ আসা ২০টি খাতের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে বর্তমানে অন্তত ১৭টি খাতে কর অবকাশ সুবিধা পাচ্ছেন বিদেশিরা। তাদের মুনাফা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও বিধি-বিধান শিথিল করা হয়েছে। মুনাফাসহ শতভাগ মূলধন ফেরত নেয়ার পাশাপাশি নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় যন্ত্রপাতির অবচয় সুবিধা, শুল্কমুক্ত যন্ত্রাংশ আমদানি এবং রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বিদেশিরা। পাশাপাশি রয়েছে সস্তা শ্রমের সহজলভ্যতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সুযোগ-সুবিধার জন্যই বিদেশিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে তারা টেলিকমিউনিকেশন, টেক্সটাইল, জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ এবং ব্যাংক-বীমায় বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এর জন্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জমি সংকট, গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাব, অবকাঠামো সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে দায়ী করেন তারা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছেÑ এটি দেশের জন্য ভালো খবর। তবে এতে অতি উৎসাহী হওয়ার কিছু নেই। ছোট একটি দেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কম্বোডিয়ার মতো দেশে বছরে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আসে, সেখানে বাংলাদেশে আসছে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি ডলার। তাছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ ইয়ার টু ইয়ার একটু বেশি ভেরিয়েশন হয়। এজন্য আগামীতে কী হয়, সেটিই দেখার বিষয়। তিনি মনে করেন বিদ্যমান অবকাঠামো সমস্যার সমাধান, দুনীতি রোধ ও জমির সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের খুব উন্নতি হয়েছে তা নয়। তারপরও বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে, যা দেশের জন্য ইতিবাচক। তিনি আরও বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে দেশি বিনিয়োগও বাড়ার কথা। কিন্তু দেশি বিনিয়োগে সে রকম গতি আসছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১১ সালে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রথমবার ১০০ কোটি ডলার অতিক্রম করে। ওই বছর এর পরিমাণ ১১৩ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরের ৩ বছরও প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও তা শত কোটি ডলারের ঘরেই আটকে ছিল। এর পরের বছর ২০১৪ সালে এফডিআই প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। তবে ২০১৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ বাড়ে এবং প্রথমবার ২০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করে। ২০১৫ সালে নিট বিদেশি বিনিয়োগ আসে প্রায় ২২৪ কোটি ডলার, যা ২০১৪ সালের চেয়ে ৪৪ শতাংশ বেশি। ২০১৬ সালেও এফডিআই প্রবৃদ্ধির হার ইতিবাচক ধারায় ছিল। এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পরিস্থিতি নিয়ে প্রতি বছর প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড)। সর্বশেষ গেল বছরের ২২ জুন ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের নিট এফডিআই বেড়েছিল প্রায় ৪৪ শতাংশ। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এবারও চলতি বছরের জুনে ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতে পারে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের চেয়ে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গেল বছর দেশে যে পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, তার অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে বহুজাতিক কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগ হিসেবে। এর পরিমাণ ১২১ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ১১৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। এ সময় একদম নতুন বিনিয়োগ এসেছে (ইক্যুইটি মূলধন) ৯১ কোটি ১৩ লাখ ডলার। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। এছাড়া গেল বছর আন্তঃকোম্পানি ঋণ হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ২০ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালেও রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) চেয়ে অ-রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এ সময় ইপিজেড এলাকায় বিনিয়োগ এসেছে ৪১ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। ২০১৫ সালে যার পরিমাণ ছিল ৪০ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। অন্যদিকে ২০১৬ সালে নন-ইপিজেড এলাকায় বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৯১ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ২০১৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ১৮২ কোটি ৮৭ লাখ ডলার।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, গেল বছর সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে টেলিকমিউনিকেশন খাতে। এর পরিমাণ ছিল ৫৭ কোটি ২৭ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার এসেছে টেক্সটাইল খাতে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৬ কোটি ৭৯ লাখ ডলার এসেছে বিদ্যুৎ খাতে। এছাড়া গ্যাস ও জ্বালানি খাতে ১৬ কোটি ৬৩ লাখ, ব্যাংকিং খাতে ১৬ কোটি ৬০ লাখ, ট্রেডিং খাতে ৮ কোটি ৮৩ লাখ, খাদ্য খাতে ৮ কোটি ৬৫ লাখ, সিমেন্ট খাতে ৪ কোটি ৩৯ লাখ, কেমিক্যাল ও ওষুধ খাতে ৪ কোটি ৩৭ লাখ, কৃষি ও মৎস্য খাতে ৪ কোটি ৩১ লাখ, বীমা খাতে ২ কোটি ৬২ লাখ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে ২ কোটি ৫২ লাখ, তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে ২ কোটি ২০ লাখ, নির্মাণ খাতে ৫৫ লাখ, সার খাতে ৫৩ লাখ এবং অন্যান্য খাতে ৪০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। অন্যদিকে গেল বছর সর্বোচ্চ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে। এর পরিমাণ ৬৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৩ কোটি ডলার এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ২১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এছাড়া নরওয়ে থেকে ১৬ কোটি, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১৫ কোটি ১৩ লাখ, হংকং থেকে ৯ কোটি ৮৪ লাখ, নেদারল্যান্ডস থেকে ৮ কোটি ৮৮ লাখ, ভারত থেকে ৭ কোটি ৯২ লাখ, চীন থেকে ৬ কোটি ১৪ লাখ, জাপান থেকে ৪ কোটি ৮২ লাখ, তাইওয়ান থেকে ৪ কোটি ৫৮ লাখ, মালটা থেকে ৪ কোটি ৪৭ লাখ, ব্রিটিশ ভার্জিন দীপপুঞ্জ থেকে ৪ কোটি ১৯ লাখ, মালয়েশিয়া থেকে ৩ কোটি ৮৬ লাখ, থাইল্যান্ড থেকে ৩ কোটি ৫১ লাখ, মরিশাস থেকে ৩ কোটি ২৩ লাখ, সুইজারল্যান্ড থেকে ২ কোটি ৬৩ লাখ, জার্মানি থেকে ২ কোটি ১৮ লাখ, সৌদি আরব থেকে ১ কোটি ৮২ লাখ, ফ্রান্স থেকে ১ কোটি ৩৭ লাখ এবং অন্যান্য দেশ থেকে ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে।