টেকসই উন্নয়ন ও সরকারের ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আমাদের জাতির পিতা। তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হলেন আধুনিক ও দ্রুত উন্নয়নশীল ডিজিটাল বাংলাদেশের স্থপতি। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলেন, সে অবস্থা থেকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় দেশ ও দেশের জনগণকে তুলে নেওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন তিনি। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে ক্রমেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের যে রোডম্যাপ প্রণয়ন করে চলেছেন তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে সত্যিকার সোনার বাংলা হয়ে উঠবে দেশ। এর জন্য প্রধানমন্ত্রী টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন এবং সে লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন।

তাঁর সরকারের সুপরিকল্পিত, সুসমন্বিত ও ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো মূলত শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে। এর মধ্যে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এসেছে। দেশে নৈরাজ্য, অরাজকতা, অগ্নি সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদী তত্পরতা চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিদেশিদের হত্যা করে বিনিয়োগের রাস্তা বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর পাঁয়তারা করা হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি ও তা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা এক মুহূর্তের জন্যও থমকে থাকেনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণেই। তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে সাফল্য দেখানো এবং বাংলাদেশের এমন সাফল্য দেখে জাতিসংঘ কর্তৃক ১৫ বছরমেয়াদি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়ন। বাংলাদেশে এখন জাতিসংঘ প্রণীত এসডিজি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এসডিজি মানেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। বলা চলে এমডিজির মতো এসডিজি বাস্তবায়নেও রোল মডেল হওয়ার জন্য বাংলাদেশের সব ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে টেকসই। আর টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে বলেই মাথাপিছু জাতীয় আয় ও বাজেটে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা হারে। একই কারণে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে নিম্ন আয় থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক উন্নতি অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্বীকৃতি অর্জন করায় সারা বিশ্বের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সাফল্য আজ অনেকটাই প্রমাণিত। এই সাফল্য ও স্বীকৃতির সমন্বয়ে শেখ হাসিনা সরকার রূপকল্প (ভিশন) ২০২১ অর্জনে বদ্ধপরিকর।

২০০৯ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের সফলতম পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রভৃতি অমানবিক সামাজিক ব্যাধি মোকাবেলায় সরকারের সাহসী পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার। যে দক্ষতা ও ক্ষিপ্রতায় গুলশান হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়া ঈদগাহে জঙ্গিদের দমন করা হয়েছে, জঙ্গিবাদের সহিংস পথ পরিহার করে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে, সর্বোপরি জঙ্গিবাদী মানসসৃষ্টির আশঙ্কা বন্ধ করার জন্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্য মুকুটের একটি বড় পালক হলো নারীর ক্ষমতায়ন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশি নারীর ক্ষমতায়নের এমন দৃষ্টান্ত আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর নিজের দেশ ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের এই চিত্র দেখে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়া সত্ত্বেও সমাজে ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা, কুসংস্কার থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নারীরা যে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরশীলতার পথ ধরে ক্রমাগত ক্ষমতায়িত হচ্ছে তাতে শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিকা কার্যকর প্রভাব রাখছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপি গ্রোথ দাঁড়িয়েছে ৭.২ শতাংশ, যা কিনা চলতি বছরেই সাড়ে ৭ শতাংশে স্থিরকৃত করা হয়েছে। এর মধ্যেই মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার অনুষঙ্গী হিসেবে ২০১৬ সালের জুনেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সাদা চোখে তাকালেও গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় যখন ইঞ্জিনচালিত রিকশা কিংবা ভ্যানের বহর দৃশ্যমান হয়, তখন দেশের অর্থনীতির গতি আঁচ করতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণের সময় যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল মাত্র চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট ও প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল তিন হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট, তা বর্তমানে ১৫ হাজার ৩৫১ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। এবং দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট ও ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অর্জনের মধ্য দিয়ে দেশকে বিদ্যুতে স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। একই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাশিয়ান ফেডারেশন নির্ধারিত ঠিকাদারের সঙ্গে তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রটি শিগগিরই বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের একটি সফল উদাহরণ হয়ে উঠবে।

উন্নয়নের প্রশ্নে শেখ হাসিনা নিজেকে স্বপ্নের চেয়ে বড় প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন পদ্মা বহুমুখী সেতু এখন মূর্তিমান বাস্তবতা। প্রমত্তা পদ্মাকে সেতুবন্ধে আবদ্ধ করার মাধ্যমে একদিকে যেমন রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার কানেক্টিভিটি সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে তেমনি দেশের জিডিপি গ্রোথ বছরপ্রতি ১.২ শতাংশ হারে বাড়াতে সাহায্য করবে। পদ্মা সেতুর মূল সেতু এখন প্রায় দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে দুটি সার্ভিস এরিয়া, কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের কাজ প্রায় ৪০ শতাংশ শেষ হয়েছে। মাওয়া পয়েন্টের সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়েছে, আর জাজিরা পয়েন্টের কাজ প্রায় ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। দেশের বৃহত্তম এ ভৌত অবকাঠামো পদ্মা সেতু আমাদের আত্মনির্ভরশীলতা ও আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হবে।

বৃহৎ স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রো রেল নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল নির্মাণে চীন সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক উদ্বোধন হয়েছে ২০১৫ সালেই। একই সঙ্গে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন মহাসড়কও সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। একই উদ্দেশ্যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এই ধারাবাহিকতায় প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শুরু হয়েছে। শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণের প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ হয়েছে।

একটি বাড়ি-একটি খামার প্রকল্পের অধীনে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক অনন্য অবদান। তাঁর বিশেষ আটটি উদ্যেগের একটি হচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্প। আশ্রয়ণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৩৮টি প্রকল্পের অধীনে সুফলভোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ৪০টি পরিবার। এই প্রকল্পের অধীনে এক লাখ ২২ হাজার পরিবারের মধ্যে ৯৭ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে।

জননেত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম ১৬২ মিলিয়ন মানুষের দেশের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন অত্যন্ত শক্ত হাতে, দৃঢ় ও সতর্ক পদক্ষেপে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এর মধ্যেই কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের কারণে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

সব মিলে উন্নয়নের প্রশ্নে বাংলাদেশের আর পেছন ফেরার অবকাশ নেই। এখন শুধু সামনে চলা। বাংলাদেশ এখন শুধু সাফল্যের খবর। এই সাফল্যের প্রয়াসকে আরো টেকসই করতে হলে সরকারের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। আর এই ধারাবাহিকতা রক্ষার কাজটি করতে হবে জনগণকেই।