শিক্ষাঙ্গনে বর্ষবরণ, সংস্কৃতির প্রসারে নতুন মাত্রিকতা

ইউনেস্কো কর্তৃক মঙ্গল শোভাযাত্রা স্বীকৃতি পাওয়ায় সরকার খুব ঘটা করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্ষবরণের নির্দেশনা দেওয়ায় এ বছর বাংলা নববর্ষ এবং নৃজাতিগোষ্ঠীদের বর্ষবরণে দেশব্যাপী একটি নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে, শিশু-কিশোর এবং তরুণরা নানা পশু-পাখির ছবি আঁকা কাগজ, রং লাগানো মুখোশ সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে প্রকৃতির নানা প্রতীকীর্তিকে ব্যবহারের মাধ্যমে আনন্দ অনুভবের প্রকাশ ঘটানো। এ বছর দেশের বৃহত্তর শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ পেয়ে বেজায় খুশি। গ্রামগঞ্জে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তারা যখন শোভাযাত্রা বের করেছে তাদের অভিভাবকগণ সন্তানদের আনন্দ প্রকাশের দৃশ্য তখন ভালোভাবে অবলোকন করেছেন। শিশুদের হাসি-খুশির সুযোগ এমনিতেই নাগরিক বা গ্রামীণ জীবনে কমে এসেছে, খেলাধুলা এবং এক সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ কমে গেছে, সেখানে এবার শিক্ষাঙ্গনে বর্ষবরণের সুযোগ তাদেরকে বেশ পুলকিত করেছে, আনন্দ দিয়েছে। এই শিশু-কিশোররা এভাবে দিন পালনের অনেক কিছুই হয়তো এখন বুঝবে না, তবে নতুন বছরে সাজগোজ করা, আনন্দ করা, প্রতীক ও মুখোশ পরার গভীর তাৎপর্য ধীরে ধীরে তাদের মনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আবহে শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ত করা গেলে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী উদার চিন্তার প্রতিফলন তাদের মধ্যে ঘটার সুযোগ থাকে।

নিকট অতীতে বর্ষবরণ ছিল বড় বড় শহর কেন্দ্রিক, এর আগে গ্রামীণ সমাজে মেলা কেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ নতুন বছর পালনের ঐতিহ্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করায় এক সময় গ্রামাঞ্চলের মেলা বসার ঐতিহ্য প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়, এর সঙ্গে পাপ-পুণ্যের ভয়ভীতি ঢুকিয়ে আসলে জাতীয় ঐতিহ্য বিযুক্ত জনগোষ্ঠী গড়ার কাজটিই একটি সংকীর্ণ জনগোষ্ঠী এতোদিন করেছে। অথচ ইরান, আফগানিস্তানসহ মুসলিম প্রধান অনেক দেশেও নিজ নিজ নববর্ষ পালনের ঐতিহ্য রয়েছে, সেগুলো বেশ আনন্দ, উৎসাহের সঙ্গে তারা পালন করেও থাকে। ধর্মীয় উৎসবের বাইরেও প্রত্যেক জাতির জীবনে জাতীয়ভাবে পালনের মতো অনেক উৎসব এবং দিবস থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু সংকীর্ণ চিন্তাধারার মানুষজন নিজেদেরকে, সমাজ ও রাষ্ট্রকেও তাদের অন্ধ বিশ্বাসে পরিগণিত করতে প্রায়শই ধর্মকে ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশে নববর্ষ পালনেরও নানা ফতোয়ার ভয়ে অনেকেই নিজেদের ঐতিহ্যকে বরণ করার উদ্যোগ থেকে … থেকে আসছে। দীর্ঘদিনের এমন অবস্থা ওই সব মানুষকে সংকীর্ণ, সাম্প্রদায়িক, আধুনিকতাবিরোধী ভাবাদর্শের পথে পরিচালিত….। সে কারণেই বর্ষবরণে অনেকের মধ্যেই … থাকার অভ্যাস লক্ষ্য করা গেছে। এখন ঢাকার বা নগর কেন্দ্রিক নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা যখন বের হয় তখনও এর মধ্যে ভিন্ন ধর্মের গন্ধ খোঁজার চেষ্টা হয়। অথচ ১৯৮৫ সালে প্রথম সূচিত আনন্দ শোভাযাত্রা, নব্বইয়ের দশকে এসে মঙ্গল কামনা থেকে মঙ্গলশোভাযাত্রা নাম ধারণ করার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পৃক্ততার কানাকড়ি সম্পর্কও খুঁজে পাওয়ার সুযোগ নেই। জাতীয় উৎসবগুলোতেও মানুষের মধ্যে কোনো মঙ্গল কামনা থাকলে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশুদের অংশ গ্রহণে নববর্ষের প্রথম দিন গ্রামগঞ্জে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে গোটা সমাজে অশুভের বিরুদ্ধে, শুভের পক্ষে অংশ নেওয়ার যে ধারা এ বছর সূচিত হয়েছে আগামী বছরগুলোতেও আরও সুশৃঙ্খল ও বর্ণিলভাবে উদযাপনের মাধ্যমে তা জাতীয়ভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্ভব ও বিকাশের প্রকৃত ইতিহাস, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারে। সেটিই শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক সকল মহলের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

লেখক: মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়