ময়লার ভাগাড়ে হচ্ছে ফুলবাগান

চট্টগ্রাম নগরীর ডিসি হিলের পাশেই আছে ন্যাশনাল প্রাইমারি স্কুল। সে স্কুল ঘেঁষে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ছিল ময়লার ভাগাড়। দুই মাস আগে সে ময়লার ভাগাড় সরিয়ে তাতে করা হয় ফুলের বাগান। জামালখান ওয়ার্ডের এজি চার্চ স্কুলের সামনে ফুটপাত ছিল ডাস্টবিন। মলমূত্র আর ময়লার গন্ধের কারণে এ ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতেন না কেউ। এখন সে ডাস্টবিন নেই। তাতে নির্মাণ করা হচ্ছে বাগান ও দৃষ্টিনন্দন যাত্রী ছাউনি।

শুধু এ দুইটি স্থানই নয়, চসিকের উদ্যোগে ডোর টু ডোর ময়লা সংগ্রহ কার্যক্রম শুরুর পর নগরীর সড়কের ওপর থেকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে ডাস্টবিন। ডাস্টবিনের স্থানে নির্মাণ করে দেয়া হচ্ছে ফুলের বাগান। এমন চিত্র দেখা গেছে, নগরীর দিদার মার্কেট, রহমতগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি এলাকায়। নালার পাড়ে, রাস্তার মোড়ে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকত আবর্জনা। ঘরের সামনে, মাঠের ধারে বর্জ্য ফেলা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। দুই থেকে তিন দিন পর সিটি করপোরেশনের আবর্জনাবাহী গাড়ি এসে নিয়ে যেত এসব বর্জ্য। মনিটরিংয়ের অভাবে কখনও কখনও এসব আবর্জনা খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকত সপ্তাহখানেক। ছয় মাস আগেও চট্টগ্রাম নগরীর আবর্জনা ব্যবস্থাপনার চিত্র ছিল এমন। কিন্তু সাড়ে তিন মাসে এ চিত্র পাল্টে গেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার।
ঘরে ঘরে পাঠানো হয়েছে আট লাখ আবর্জনা রাখার বিন। প্রতিটি ওয়ার্ডের নির্দিষ্ট এলাকার জন্য রয়েছে আবর্জনা পরিবহনের ভ্যান। বিকাল ৩টা থেকে কলিং বেল চেপে দুয়ারে হাজির সেবক। বাসা থেকে ময়লা নিয়ে যাচ্ছেন তারা। এভাবে সিটি করপোরেশনের ‘ডোর টু ডোর’ আবর্জনা সংগ্রহ কার্যক্রম স্বস্তি এনেছে নগরবাসীর জীবনযাত্রায়।
এ প্রকল্পের আওতায় রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত নগরজুড়ে আবর্জনা অপসারণ করছে চসিকের সেবকরা। সঙ্গে মাঠে থাকছেন চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের সব কর্মকর্তা। বাড়তি ১ হাজার ৩০০ শ্রমিক আবর্জনা অপসারণের কাজে রাত কাটান সড়কেই। তারা প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ঘর থেকে সরাসরি ময়লা সংগ্রহ করছেন। পরে এসব আবর্জনা ভোরের আলো ফোটার আগেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশনে।
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকি বলেন, বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন চসিকের দায়িত্ব নিয়েই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে ঢেলে সাজিয়েছেন। ডোর টু ডোর আবর্জনা সংগ্রহকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তিনি। আগে দিনের বেলা ময়লা সংগ্রহ হতো বলে দুর্গন্ধ ছড়াত। এখন নগরবাসী ঘুমে থাকতেই ময়লা অপসারণ হয়ে যাচ্ছে। সকালে উঠে মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ডাস্টবিন অপসারণ করে নির্মাণ করা হচ্ছে ফুলের বাগান।
শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় নগরী প্রবর্তক মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে, কোদাল-বেলচা হাতে ডাস্টবিন থেকে ময়লা তুলে ট্রাকে তুলছেন চসিকের সেবকরা। বিষয়টি মনিটরিং করছেন একজন ইন্সপেক্টর। তিনি জানান, দিনের বেলা গাড়ির জ্যাম থাকে সড়কজুড়ে। উপচেপড়া ময়লার ট্রাকের এ সময় ছোটাছুটি দেখতে খুবই খারাপ দেখাত। এছাড়া গাড়ি চলাচল বেশি থাকায় ময়লা অপসারণে সময় লাগত বেশি। রাতে যানবাহন না থাকায় ৩০ মিনিটে একটি ট্রাক ডাম্পিং স্টেশন কিংবা নির্ধারিত স্থানে ময়লা রেখে এখন ফিরে আসতে পারে। আগে সময় লেগে যেত কয়েক ঘণ্টা। এছাড়া দিনে প্রখর রোদের কারণে সেবকদেরও কাজ করতে বেগ পেতে হতো। এখন এ সমস্যাটি হয় না। চসিকের আবর্জনা অপসারণের বিষয়ে ১৬নং চকবাজার ওয়ার্ডের কাতালগঞ্জে বাসিন্দা পারভিন আক্তার বলেন, এক বছর আগেও রাস্তার মোড়ে মোড়ে পড়ে থাকত আবর্জনা। দুর্গন্ধের কারণে পথচারীদের হাঁটতে হতো নাকে হাত দিয়ে। আর ডাস্টবিনের পাশে যাদের বাসা তাদের কষ্ট ছিল সীমাহীন। তিন মাস ধরে ঘর থেকে আবর্জনা নিয়ে যাচ্ছেন সিটি করপোরেশনের লোকজন। সবচেয়ে ভালো দিক হলো রাতের মধ্যে ডাস্টবিন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। এদিকে প্রত্যেক ওয়ার্ডে চসিকের উদ্যোগে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। যেখানে ময়লা ধ্বংস করা হবে। প্রাথমিকভাবে ছয়টি ওয়ার্ডে চালু হবে এ স্টেশন। ওয়ার্ডগুলো হলো ৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর, ৮ নম্বর শুলকবহর, ২২ নম্বর এনায়েত বাজার, ২৩ নম্বর পাঠানটুলী, ৩১ নম্বর আলকরণ ও ৩৬ নম্বর গোসাইলডাঙ্গা।
চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি শৈবাল দাশ সুমন জানান, চট্টগ্রাম শহরকে ডাস্টবিনমুক্ত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করার ফলে ডাস্টবিনমুক্ত নগরী উপহার দেয়া সম্ভব হবে। বাসা থেকে সেবকরা রিকশা ভ্যানের মাধ্যমে আবর্জনা সংগ্রহ করে গাড়িতে নিয়ে আসবেন। গাড়ি আবর্জনা নিয়ে চলে যাবে ডাম্পিং স্টেশনে। আবর্জনা অপসারণের এ নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়নে চট্টগ্রামে শিল্প গ্রুপগুলোর কাছ থেকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সহায়তা নেয়া হবে। এছাড়া চসিকের নিজস্ব অর্থায়ন তো আছেই। তিনি জানান, ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ছয়টি ওয়ার্ডে জরিপ করা হয়েছে। ছয়টি ওয়ার্ডে মোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ঘর ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব বাসা ও প্রতিষ্ঠান থেকে আবর্জনা সংগ্রহ করতে ৩৮৪টি রিকশা ভ্যান, ৭৬৮ জন সেবকের প্রয়োজন হবে। এ কাজে এ ছয় ওয়ার্ডে নতুন করে ৬০০ সেবক নিয়োগ দিতে হবে। চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডোর-টু-ডোর ময়লা অপসারণ কার্যক্রম চালুর ঘোষণা দেয় চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। আর্থিক সমস্যা ও প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন শুরু করতে গিয়ে এপ্রিল মাস লেগে যায়।
২০১৬ সালের ৯ মার্চ ডোর টু ডোর ময়লা অপসারণ প্রকল্পটি চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় এবং পরবর্তী সময়ে একই বছরের ১৫ মার্চ সাধারণ সভায় অনুমোদন হয়। গেল বছর ১ আগস্ট থেকে ঘরে ঘরে বিন বিতরণ শুরু করে চসিক। আট লাখ বিন কাউন্সিলরদের সহযোগিতায় চসিক ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১ হাজার ৩০০ শ্রমিকও নিয়োগ দেয়া হয়।