পেঁয়াজ চাষে নতুন আশা

জাত কৃষক বজলু মিয়া। বয়স ৫০ ছুঁই ছুঁই। বাপ-দাদার আমল থেকেই চাষাবাদ করে ভাত-কাপড়ের জোগানের ব্যবস্থা। অভাব-অনটনে বাবা আশ্রাফ আলী চাষাবাদের জমি খুইয়ে ফেলার পরও পেশা পরিবর্তন করেননি বজলু। বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে স্ত্রী আর পাঁচ সন্তানের ভরন-পোষণ করে চলছেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার ইসলামপুর টেক এলাকার কৃষক বজলু এবার পেঁয়াজের আবাদ করে বাজিমাত করেছেন। খরচের দ্বিগুণ লাভের কারণে পেঁয়াজ চাষে নতুন আশা খুঁজে পেয়েছেন তিনি। তার এ সফলতায় এলাকার আরও অনেকেই পেঁয়াজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

জানা যায়, সোনাফলা মাটি হিসেবে রূপগঞ্জের সুখ্যাতি থাকলেও শিল্পায়নের খেসারত হিসেবে বর্তমানে চাষাবাদে লোকসান গুনছেন রূপগঞ্জের চাষিরা। এ কারণে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন তারা। উপজেলা কৃষি অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ১০ বছর আগেও রূপগঞ্জে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার হেক্টর। বর্তমানে তা কমে ১৬ হাজারে ঠেকেছে। এ অবস্থায় গেল বছর সেপ্টেম্বরে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অদিফতরের কাঞ্চন বীজাগারের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের সঙ্গে পরিচয় হয় বজলুর। আলতাফ হোসেন পেঁয়াজ চাষের ওপর সরকারের বিশেষ প্রণোদনা প্রস্তাব শোনায় বজলুকে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পেঁয়াজ চাষ করলে সরকার বীজ, সার থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক খরচ; এমনকি পেঁয়াজ উঠানোর পর রাখার জন্য মাচা পর্যন্ত তৈরি করে দেবেÑ এমন প্রস্তাবে ইসলামপুর এলাকার আরেক কৃষক তারাজুদ্দিনের ছেলে ফটিক মিয়ার সঙ্গে যৌথ অংশীদারির ভিত্তিতে ৫০ শতক জমি বর্গা নিয়ে বজলু শুরু করেন পেঁয়াজ চাষ।
আলতাফ হোসেন জানান, প্রতি বছর দেশের বাইরে থেকে প্রচুর পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। এজন্য কৃষককে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ বাড়াতে সরকার গেল বছর বিশেষ প্রণোদনা প্রস্তাব দেয়। এ প্রস্তাবের আওতায় সার, বীজ থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক খরচ; এমনকি পেঁয়াজ উঠানোর পর রাখার জন্য মাচা পর্যন্ত সরকারের তরফে তৈরি করে দেয়া হয়। কৃষক যাতে অন্তত নিজেদের খাবারের পেঁয়াজটুকু ফলন করে খায়। এতে কিছুটা ঘাটতি পূরণ হয়Ñ এটাই সরকারের উদ্দেশ্য। সরকারের এ প্রস্তাবের কথা শুনে বজলুসহ আরও কয়েকজন ইসলামপুর, বিরাব, রানীপুরা ও খালপাড় এলাকায় এ প্রস্তাবের আওতায় পেঁয়াজের চাষ করে বাজিমাত করেন।
কৃষক বজলু জানান, গেল বছর অক্টোবরে জমি প্রস্তুতের পর নভেম্বরের প্রথম দিকে তারা ৫০ শতক প্রদর্শনীসহ আরও ৩ বিঘা জমিতে ফটিক মিয়ার সঙ্গে যৌথ অংশীদারির ভিত্তিতে বারি-১ জাতের পেঁয়াজের চাষ করেন। সরকার থেকে পাওয়া ৩ কেজি বীজসহ প্রদর্শনী জমির জন্য মোট ১৬ হাজার টাকা খরচ পান তারা। মার্চের শেষ সপ্তাহে এসে তারা জমি থেকে ফসল তোলেন। ৫ মাসে কামলা (শ্রমিক) ও পানিসহ তাদের ৫০ শতক জমিতে খরচ হয় আরও সাড়ে ৩ হাজার টাকা। তারা এ জমি থেকে পেঁয়াজ পেয়েছেন ৪৬ মণ; যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪০ হাজার টাকা। অন্যান্য জমি থেকেও একই পরিমাণ ফসল উঠেছে। খরচের দিগুণ লাভের কারণে তারা পেঁয়াজ চাষে আশা খুঁজে পেয়েছেন। তারা উভয়েই এ বছর আরও ১০ বিঘা জমি বর্গা নিয়েছেন আগামী মৌসুমে পেঁয়াজ চাষের জন্য।
ফটিক জানান, তাদের দেখাদেখি এলাকার কৃষক জয়নাল আবেদীন, আহাদ আলী, শফিকুর, মামুন, সামাদ হোসেনসহ আরও অনেকেই পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুরাদুল হাসান বলেন, রূপগঞ্জের চাষিরা অব্যাহত লোকসানের কারণে চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এ অবস্থায় পেঁয়াজ চাষে তারা আবারও নতুন স্বপ্ন দেখছেন। পেঁয়াজ চাষের জন্য দোঁ-আশের সঙ্গে পলি ও বালি মাটির মিশ্রণে যেমন উর্বরা জমির প্রয়োজন, রূপগঞ্জের মাটিও ঠিক তেমনি। এখানে পেঁয়াজ চাষের বিপুল সম্ভাবনা আছে।