বাঙালির সংস্কৃতিচেতনার উন্মেষ নববর্ষ

লেখক : চিন্ময় মুত্সুদ্দী সাংবাদিক, মিডিয়া বিশ্লেষক

১৯৫২ সালে বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এ কথা বলেছিলেন ভাষা আন্দোলনের পরিপ্র্রেক্ষিতে। ব্রিটিশ ভারতে পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমিতে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনধারাকে ‘হিন্দুয়ানি’র প্রভাবমুক্ত করার মানসে বাংলার লোকাচার থেকে দূরে সরে যেতে থাকে এক শ্রেণির বাংলাভাষী মুসলমান। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর এ ভুল ভাঙে অনেকের। এরই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলনকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। পরে ষাটের দশকে আইয়ুব খানের আমলে রবীন্দ্রসংগীত চর্চা নিষিদ্ধ করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা এর প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদের ইতিবাচক ধারায় ১৯৬৭ সালে ছায়ানট মহাসমারোহে নববর্ষ পালনের উদ্যোগ নেয়। বলধা গার্ডেনের মনোরম পরিবেশের এ আয়োজন পরের বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকে। ১৯৬৭ ও ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়ার সামরিক আইন উপেক্ষা করে অসংখ্য মানুষ যোগ দেয় নববর্ষ উদ্যাপনে। জনসমাগম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ অনুষ্ঠান রমনার বটমূলে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। এখনো তা অব্যাহত আছে।

হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালির প্রথম স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। প্রাচীন লোকাচার আর ঐতিহ্যে ফিরে আসার ব্যাকুলতা থেকেই নতুন করে নববর্ষ উদ্যাপনে বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত নব্বইয়ের দশক থেকে ক্রমেই উদ্যাপনের পরিধি বাড়িয়েছে। এ উদ্যাপন এখন ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে পালন করে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণে তিন দিনের বিজু উৎসব।

অর্থনৈতিক জীবনধারার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শহর ও গ্রামে ব্যবসায়ীদের হালখাতার প্রচলন ক্রমে কমে গেলেও ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক ঝালিয়ে নেওয়ার রেওয়াজটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। এখনো বছর শেষে চৈত্রসংক্রান্তিতে ঘরদোর, দোকানপাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নববর্ষ পালনের প্রস্তুতি নেয় অনেকে। আর বছরের পয়লা দিন ক্রেতাকে মিষ্টিমুখ করানোর রেওয়াজটা রেখে দিয়েছে অনেকেই। টেকনোলজির অগ্রগতিতে গ্রামবাংলার মেলা এখন কমে গেলেও সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বাঙালির সংস্কৃতিচেতনার নতুন উন্মেষের কারণে মেলার পৃষ্ঠপোষকতা বেড়েছে। সরকারি পর্যায়ে কুটির শিল্প সংস্থাসহ ব্যাংক, বীমা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এ রকম পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে এসেছে।

গ্রামবাংলার মেলা এখন শহর ঘুরে আবার গ্রামাঞ্চলে যাওয়া শুরু করেছে। গত কয়েক বছরে মেলার সংখ্যা বেড়েছে। পরিবর্তিত জীবনধারার কারণে কুটির শিল্পজাত দ্রব্যের পাশে স্থান করে নিচ্ছে যন্ত্রনির্ভর সভ্যতার দ্রব্যসামগ্রী। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি থেকে সাড়া পড়ে যায় নাগরিক ব্যবসায়ী মহলে। ১৯৬৯ বা ১৯৭০ সালে বলধা গার্ডেনে আয়োজিত ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে মুড়ি ও বাতাসা পেয়েছিলাম। এই রেওয়াজটি এখন আর নেই। দর্শক-শ্রোতার সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে উদ্যোক্তারা আর এখন কুলিয়ে উঠতে পারবে না। সেই গ্যাপটি এখন পূরণ করছে ব্যবসায়ীরা। অনুষ্ঠানস্থলের পাশেই বিভিন্ন আইটেমের সঙ্গে অসংখ্য শুকনো খাবারের বিক্রেতা এবং ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী রেস্টুরেন্ট দেখা যায় এখন। নগরীর সাততারা থেকে বড়, মাঝারি সব রেস্টুরেন্ট বৈশাখী খাবার অফার করে। ব্যবসায়ীরা দিবসটিকে ‘অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিং’-এর ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। পোশাক, গয়না ও খাবারের ব্যবসা দিনটিকে ঘিরে রমরমা হয়ে ওঠে। ক্রেডিট কার্ডধারীরা মোবাইল ফোনে নিয়মিত টেক্সট বার্তা পেতে থাকে ‘একটা কিনলে একটা ফ্রি’ বা শতকরা ২০ থেকে ৫০ ভাগ ছাড়!

বিশ্বায়ন, ডিজিটাল আবির্ভাব, জলবায়ু পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই বাঙালির জীবনে পরিবর্তন এনেছে। জীবনধারার পরিবর্তনের পাশাপাশি আচরণেও মানুষের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। নববর্ষ পালনে ভিড়ের মধ্যে নারী লাঞ্ছনার ঘটনা আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে। নতুন শতকে পরপর কয়েক বছর এমনটি ঘটেছে রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ও গুলশানে।   ন্যক্কারজনক এসব ঘটনায় পুলিশ সমালোচনার মুখে পড়ে। গত বছর প্রথমবারের মতো রাজধানীতে সব প্রকাশ্য অনুষ্ঠান বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করার সরকারি নির্দেশ সবাই মেনে চললেও এ পদক্ষেপের প্রতিবাদ করেছে অনেকে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তখনকার নির্বাহী সম্পাদক সুলতানা কামাল এটাকে মধ্যযুগীয় আচরণ বলে নিন্দা করেন। এর কিছুদিন পর আসক থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। ওয়ার্কার্স পার্টি বলেছিল, ‘বর্ষবরণে বিধিনিষেধ ধর্মান্ধতার কাছে আত্মসমর্পণ। ’ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট রবীন্দ্রসরোবরে তাদের অনুষ্ঠান বাতিল করে দেয়। তারা ৪টা থেকে ৭টা (৫টার পরিবর্তে) পর্যন্ত অনুষ্ঠান করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করলেও ডিএমপি তাতে রাজি হয়নি। জোটের বক্তব্য ছিল, দুপুরের তপ্ত রোদে অনুষ্ঠান করা বাস্তবসম্মত নয়। এবারও ডিএমপি আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছে বিকেল ৫টার মধ্যে সব প্রকাশ্য অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যাগ, পোঁটলা, মুখোশ, ছাতা, আগ্নেয়াস্ত্র, চাকু, ছুরি ইত্যাদি বহনেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একইভাবে এ নির্দেশের পাশাপাশি পহেলা বৈশাখ মোটরসাইকেলে চালকের সঙ্গে আর কেউ থাকতে পারবে না বলে সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ এবারও কড়াকড়ি থাকছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর মাত্রা বেড়েছে। চৈত্র মাসেই সিলেট ও কুমিল্লায় বিস্ফোরকসহ জঙ্গিদের একাধিক আস্তানার সন্ধান পাওয়া ও জঙ্গিদের আত্মহননের ঘটনায় জননিরাপত্তার লক্ষ্যে বাড়তি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে সরকার।

এ রকম রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও বাঙালি নববর্ষ পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় অনেক আগেই। মঙ্গল শোভাযাত্রায় আমরা দেখি বাঘের মুখ চিত্রিত রঙিন প্ল্যাকার্ড, মাটির সরায় আলপনা, নানা ধরনের মুখোশ ও খাঁচার ভেতর কাগজের পাখি। এ শোভাযাত্রার জন্য এখন কারো কাছে হাত পাততে হয় না। চারুকলার শিক্ষার্থীদের তৈরি করা বিভিন্ন সামগ্রী আগে থেকেই বিক্রি করা শুরু হয়। এবার দুই শিক্ষার্থীর তৈরি করা কাগজের পাখি বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকায়। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিনেছে এসব সামগ্রী। আর এসব বিক্রি করেই সংগ্রহ করা হয় বর্ষবরণ উৎসবের খরচ।

বাংলা বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। যে কারণে এ বছর দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হবে বলে ২৭ ফেব্রুয়ারি সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের খবরে বলা হয়। কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক তোলা হয়েছে এবারও। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের সরকারি নির্দেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছেন এক সভায়। এ দাবির পক্ষে যৌক্তিক কোনো কারণ তিনি দেখাতে পারেননি। এই মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু ১৯৮৫ সালে যশোরে, আয়োজক ছিল চারুপীঠ। ঢাকায় এটি শুরু করে চারুশিল্পী সংসদ ১৯৮৯ সালে। উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার জন্য একটি আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি করা। ফিরিয়ে আনা বাংলার লোকাচার। তারা সফল হয়েছে। বাঙালির লোকাচারের বিভিন্ন সামগ্রী, যেমন—নানা ধরনের মুখোশ, পশু-পাখির মুখ চিত্রিত প্ল্যাকার্ড, বড় পুতুল, মাটির সরা বহন করে যে শোভাযাত্রা, সেখানে ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী কর্মকাণ্ড খোঁজার কোনো মানে নেই। বাঙালি জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যাঁদের জ্ঞান বা ধারণা নেই তাঁরাই এমন উদ্ভট দাবি তোলেন।

বৈশাখে নববর্ষ উদ্যাপনকেই বিজাতীয় সংস্কৃতি বলে এর বিরোধিতা করেছিল পাকিস্তান সরকার। অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘পারস্যে যদি ইসলামপূর্ব নওরোজ উৎসব অব্যাহতভাবে চলে আসতে পারে, তার অনুকরণে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে যদি নওরোজ উৎসব অনুষ্ঠিত হতে পারে, তাহলে আমরা কেন বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করতে পারব না, বিশেষ করে বাংলা নববর্ষ যেখানে মোগলদের প্রবর্তন বলে সর্ববাদী সম্মত?’

ষাটের দশকে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া ছিল আন্দোলনের ব্যাপার। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদ্যাপন ও রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার মাধ্যমে বাঙালির সংস্কৃতিচর্চায় নবতরঙ্গের সূচনা। এরই ধারাবাহিকতায় ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠায় ও নববর্ষ পালনে উদ্যোগী ভূমিকা নিলেন মুখলেসুর রহমান (সিধু ভাই), বেগম সুফিয়া কামাল, ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন, জাহিদুর রহিম প্রমুখ। নববর্ষ পালনের সেই উদ্যোগ আজ জাতীয় উৎসবের রূপ লাভ করেছে। এ কৃতিত্বের দাবিদার ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতারা। একবিংশ শতকে রবীন্দ্রসংগীতের আরেক দিকপাল রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা তাঁর সুরের ধারা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে এ উৎসবে এনেছেন আরো অর্থবহ উপাদান। চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক আয়োজন দিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যরাত পর্যন্ত আবিষ্ট রাখেন। ২০০১ সাল থেকে চৈত্রসংক্রান্তির অনুষ্ঠান আয়োজন করছে সুরের ধারা। বিগত চার বছরে একই সঙ্গে নতুন বছরকে বরণ করার অনুষ্ঠানও যোগ করেছে। চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে ‘হাজারও কণ্ঠে বর্ষবরণ’ এ যাত্রায় নবতর সংযোজন। বন্যা মনে করেন, পহেলা বৈশাখ একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব।

ছায়ানটের এবারের পহেলা বৈশাখের বিষয় ‘আনন্দ। ’ সন্জীদা খাতুন গণমাধ্যমকে বলেছেন, গান মানুষের অন্তর স্পর্শ না করলে তাদের স্বার্থকেন্দ্রিকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা দূর হবে না।

বর্ষবরণে মঙ্গল শোভাযাত্রার এবারের স্লোগান, ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর’। স্লোগানের সঙ্গে মিল রেখে বড় সূর্যের প্রতিকৃতি তৈরি হয়েছে, যা শোভাযাত্রায় অনেকে মিলে বহন করবে। আয়োজকদের ভাষায়, ‘সূর্যের সামনের মুখ হবে রঙিন, হাস্যোজ্জ্বল। আর পেছনে থাকবে কালো রঙে কাদাকার অন্ধকার মুখ। আমরা পেছনে অন্ধকার রেখে আলোর দিকে এগিয়ে যাব। ’

১৪২৪ সনকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তার হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে।