রোকসানা রেজাঃ প্রথম বাঙালি নারী পাইলট

ইকবাল বাহার চৌধুরী

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে আমরা থাকতাম অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায়। বাবা মুহাম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী বাংলার আইনসভার সদস্য ছিলেন। মা আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ছিলেন শিক্ষাবিদ, বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। আমরা পাঁচ ভাইবোন। চার বোন সেলিনা, শাহীন, নাসরিন ও তাজিন, আর ভাই বলতে আমি একাই। তাজিন জন্মেছে দেশ বিভাগের পরে ঢাকায়, আর বাকি আমাদের সবার জন্ম কলকাতার মুসলিম-প্রধান পার্ক সার্কাস অঞ্চলে। ১৯৪৭ সালে আমি আর সেলিনা প্র্যাট মেমোরিয়াল স্কুলে পড়তাম। আমি কিন্ডার গার্টেনে আর আমার বড় বোন সেলিনা বোধহয় দু ক্লাস উঁচুতে।

ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলো ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে। কলকাতা থেকে অনেক পরিবারের মতো আমরাও পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাব। সবারই মন খারাপ। আমাদের বাড়ি ছাড়তে হবে। স্কুল ছাড়তে হবে। কলকাতা ছেড়ে স্থায়ীভাবে চলে যেতে হবে ঢাকায়। বাড়িতে প্রস্তুতি শুরু হলো জিনিসপত্র গোছগাছের। বড় বড় বাঙ্ সুটকেস রেডি করা হলো। আমরা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা যাবো ঠিক হলো। তারিখ মনে নেই তবে জানতাম আমরা প্লেনে যাবো। সেই যুগে প্লেনে কোথাও যাওয়া বিরল ব্যাপার ছিল। কলকাতা থেকে দিলি্ল অথবা বিদেশে যাওয়ার জন্যই প্লেনে চড়া হতো। দিলি্লতেও বেশির ভাগ লোক যেত রেলে।

নির্ধারিত দিনে আমরা দমদম বিমান বন্দরে গেলাম। ওরিয়েন্ট এয়ারোওয়েজের একটি বিমানে বাবা, মা, এবং ভাই বোনেরা ঢাকায় পেঁৗছালাম। বিমানবন্দর থেকে গিয়ে উঠলাম ২৪ পুরানা পল্টনে, আমার ফুপু শামসুন্নাহার মাহমুদ ও ফুপা ড: ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বাড়িতে। ওই বাড়ির পাশেই এক সময় থাকতেন বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু ও তার পরিবার। আমার ফুপুর ঐ দোতালা বাড়ির সামনে ছিল ‘মাই স্টুডিও’ নামে হিমাংসু বাবুর ছবি তোলার দোকান। কলকাতা থেকে প্লেনে চড়ে ঢাকায় পুরানা পল্টনের এই বাড়ি যাওয়ার সময় প্রথম বিমান ভ্রমণের উত্তেজনা আর অভিজ্ঞতার কথা তখন বারবার মনে হয়েছে আমাদের সবার।

ঢাকায় আসার পর বাবা পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন এবং মা ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৭ সালে প্রথম বিমান ভ্রমণ আর সেই সময়কার ঢাকা শহর আর পুরানা পল্টনের কথা কোনদিন ভুলব না। ফুপুর বাড়ির সামনেই ছিল একটি দোকান, নাম ‘মনের মতন’। চাল, ডাল ছাড়াও পাওয়া যেত মুড়ি, মিষ্টি, বাকরখানি, আরো অনেক কিছু। ওখানকার চমচম আমরা খুব ভালোবাসতাম। পুরানা পল্টনের কাছেই ছিল রিটয রেস্তোরাঁ সেলিমাবাদ রেস্তোরাঁ, ডিএসএ গ্রাউন্ড, এবং ব্রিটানিয়া সিনেমা হল।

ঢাকাতে সম্ভবত ১৯৪৮ সালে ইস্ট পাকিস্তান ফ্লায়িং ক্লাব গঠন করা হয়। খুব অল্প সংখ্যক ছেলেরাই সেই যুগে এই ক্লাবের সভ্য হতো। আর মেয়েদের ফ্লায়িং ক্লাবে যোগদানের তো প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের পুরানা পল্টন এলাকায় পরে আলি রেজা সাহেব সপরিবারে বাস করতেন। তিনি ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তার বেশ কয়েকটি সন্তান। এদের একজন রোকসানা রেজা। আমার চেয়ে সম্ভবত দশ কি বারো বছর বড়। অত্যন্ত সুন্দরী, স্মার্ট, লম্বা, আর আকর্ষণীয় ছিলেন রোকসানা রেজা। সম্ভবত ১৯৫০ সালের দিকে বাবা সিলেট যাবেন। একেবারে ছোটবেলায়, দেশবিভাগের আগে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হবে না ভারতের সঙ্গে থাকবে, সেই নিয়ে গণভোট হয়েছিল। গণভোটের সময় বাবা পূর্ব পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে কাজ করেছিলেন। সে কারণেই সিলেটের নাম বহুবার শুনেছি বাবা এবং তার বন্ধুদের মুখে। ১৯৫০ সালে সিলেট যাবার আগে বাবা বললেন তিনি প্লেনে যাবেন এবং ইচ্ছে করলে আমি ওই প্লেনে করে তার সাথে যেতে পারি।

আমি মহাখুশি। রাজি হয়ে গেলাম। তখন ঢাকা-সিলেট কোন ফ্লাইট ছিল না। আমরা যাবো ফ্লায়িং ক্লাবের ছোট্ট প্লেনে। বাবা আর আমি ছাড়া ঐ বিমানে যাবেন ফ্লায়িং ক্লাবের ইন্সট্রাক্টর ক্যাপ্টেন রশীদ এবং রোকসানা রেজা। রোকসানা রেজা তখন পাইলট হবার জন্য শিক্ষা গ্রহণ করছেন। আমাদের সিলেট নিয়ে যাবেন ক্যাপ্টেন রশীদ। তিনিই বিমান চালাবেন। ফেরার পথে তিনি রোকসানা রেজাকে প্লেন চালানো শেখাবেন। নির্ধারিত দিনে আমরা ফ্লায়িং ক্লাবের প্লেনে সিলেট রওনা হলাম। আমার কী উত্তেজনা। মনে নানা প্রশ্ন। রোকসানা রেজা আদর করে প্লেনে বসালেন। সংক্ষেপে প্লেন সম্পর্কে, কীভাবে প্লেন চালাতে হয়, ওপরে উঠতে হয়, স্পিড দিতে হয়, আমাকে বললেন। এর কিছুটা বুঝলাম, কিছুটা বুঝতে অসুবিধা হলো আমার। ১৯৪৭ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় প্লেনে যাত্রা আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। এবার দ্বিতীয়বার প্লেনে চড়া। তবে এটা ছোট বিমান, যাত্রী মাত্র আমরা চারজন। নির্ধারিত সময়ে সিলেটে পেঁৗছে গেলাম।

আমাদের নামিয়ে ক্যাপ্টেন রশীদ এবং রোকসানা রেজা ঢাকার পথে রওনা হলেন। আমরা বিমানবন্দর থেকে কোথায় গেছি মনে নেই। তবে কিছুক্ষণের ভেতরেই দুঃসংবাদ এলো। বাবাকে জানানো হলো বিমান দুর্ঘটনার কথা। ফ্লায়িং ক্লাবের ঐ বিমানটি সিলেট ত্যাগ করার দশ মিনিট পর ক্র্যাশ করেছে। ৩০০০ ফুট উঁচু থেকে ২১০ মাইল বেগে বিমানটি মাটিতে আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে দুই পাশের দরজা খুলে যায়। ক্যাপ্টেন রশীদ আর রোকসানা রেজা ছিটকে পড়েন প্লেন থেকে, প্রাণে বেঁচে যান। বাবার সঙ্গে আমি সিলেট হাসপাতালে তাদের দেখতে যাই। তারা আহত হন তবে গুরুতর নয়।

রোকসানা রেজা পরবর্তী সময়ে পাইলট হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। ১৯৫০ দশকের গোড়ার দিকে মেয়েরা পাইলট হবে এটা ভাবাই যেত না। বাংলাদেশে এখন কয়েকজন নারী পাইলট হয়েছেন। এদের কেউ কেউ বিমানবাহিনীর পাইলট। এটা আনন্দের কথা। গৌরবের কথা। তবে এক্ষেত্রে মেয়েদের পথ দেখিয়েছেন রোকসানা রেজা। তাকে সালাম জানাই, অভিবাদন জানাই। তার স্মৃতি ভোলবার নয়।