৮০ হাজার কোটি টাকার ভারতীয় বিনিয়োগ আসছে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার (প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের আশ্বাস মিলেছে। মূলত বিদ্যুৎ, জ্বালানি, লজিস্টিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের এ আশ্বাস পাওয়া গেছে। গতকাল সোমবার নয়াদিল্লির হোটেল তাজ প্যালেসে বাংলাদেশ-ভারত ব্যবসায়ী সম্মেলনে বেসরকারি খাতে ১৩টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।

কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিসিআই), ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) ও অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বারস অব কমার্স অব ইন্ডিয়ার (অ্যাসোচেম) সহযোগিতায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সম্মেলনের আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

বিশেষ অতিথি ছিলেন ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। সম্মেলনে এফবিসিসিআই সভাপতি মাতলুব আহমাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ২৩৭ জনের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ভারতের প্রায় ১৫০ ব্যবসায়ীর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা করে।

স্বাক্ষরিত চুক্তি ও এমওইউগুলো হলো—১. বাংলাদেশের রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কম্পানি লিমিটেড এবং এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মধ্যে ফ্যাসিলিটি চুক্তি, ২. মেঘনা ঘাটে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে প্রথম পর্যায়ে ৭১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয়ে ভারতের রিলায়েন্স পাওয়ার এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বাস্তবায়ন ও ক্রয় চুক্তি, ৩. ত্রিপুরা থেকে আরো ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে ভারতের এনটিপিসি বিদ্যুৎ ভেপার নিগম লিমিটেড এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সম্পূরক চুক্তি, ৪. নেপাল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে ভারতের এনটিপিসির সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সমঝোতা স্মারক, ৫. ঝাড়খণ্ডে এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে আদানি পাওয়ার (ঝাড়খণ্ড) লিমিটেড এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে ক্রয় চুক্তি, ৬. ভারতের পেট্রোনেট এলএনজি লিমিটেড এবং বাংলাদেশের পেট্রোবাংলার মধ্যে ‘হেডস অব আন্ডারস্যান্ডিং’, ৭. কুতুবদিয়া দ্বীপে ৫০০ এমএমএসসিএফডি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের লক্ষ্যে রিলায়েন্স পাওয়ার ও পেট্রোবাংলার মধ্যে এমওইউ, ৮. এলএনজি সহযোগিতার লক্ষ্যে ইন্ডিয়া অয়েল করপোরেশন লিমিটেড এবং বাংলাদেশের পেট্রোবাংলার মধ্যে এমওইউ, ৯. ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে ডিজেল বিক্রি ও ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি, ১০. কনটেইনার পরিবহনে কনটেইনার কম্পানি অব বাংলাদেশ এবং কনটেইনার করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার মধ্যে এমওইউ ১১. চেন্নাইয়ের তামিলনাড়ু ভেটেরিনারি সায়েন্স ইউনিভার্সিটি এবং চট্টগ্রামের ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটির মধ্যে সমঝোতা স্মারক, ১২. ভারতের বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতন ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশের খুলনায় অবস্থিত নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির মধ্যে এমওইউ এবং ভারতের টাটা মেডিক্যাল সেন্টার ও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব মেডিক্যাল সার্ভিসেসের মধ্যে এমওইউ।

সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে আর্থসামাজিক অগ্রগতির বর্ণনা দেন ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ সুবিধা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। তিনি ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের তাদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক জোন মোংলা, ভেড়ামারা, মিরসরাইয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি ভারতের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসহ এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার চিত্রও তুলে ধরেন।

ইতিবাচক ফলের আশা শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতবিনিময় এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে উভয় দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে বলে মনে করেন দুই দেশের শিল্পপতি-ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি নিরসনে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের বোঝাপড়ার বিষয়টিও এবার অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে। তবে বাংলাদেশে শিল্প ও বাণিজ্য বিকাশে যেসব সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে তার সফল বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে একাধিক কমিটি গঠন করা প্রয়োজন বলেও তাঁরা মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে নয়াদিল্লি এসেছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, এমসিসিআইয়ের সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির, এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক প্রবীর কুমার সাহা, বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান মোরশেদ আলম, গ্যাটকো গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম খালেদ, বাংলাদেশ নিট ডায়িং মালিক সমিতির সহসভাপতি আবুল হাসনাত কবির প্রমুখ।

অনুষ্ঠান শেষে আবদুল মাতলুব আহমাদ দুই দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের এমন সম্মেলন আয়োজন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল বলে অভিমত দেন। তিনি বলেন, এবার বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৪০ জন ব্যবসায়ী-শিল্পপতি দিল্লিতে এসেছেন। এত বড় বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদল আর কখনো কোনো দেশে যায়নি। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ এবং ভারতে বাংলাদেশে বাজার সৃষ্টিতে এ ধরনের উদ্যোগ অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির সম্মেলন সম্পর্কে বলেন, এভাবে দুই দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের পরস্পরের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। বাংলাদেশ সরকার এখন বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশের বিষয়টি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু নীতি সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব নীতি সহায়তা কার্যকর, সফলভাবে বাস্তবায়ন ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করতে একাধিক কমিটি গঠন করা দরকার। তবেই সরকারের উদ্দেশ্য সফল হতে পারবে।

এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক প্রবীর কুমার সাহা বলেন, ভারতে বাংলাদেশের পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। এ বাজারকে কাজে লাগাতে দুই দেশের ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের মধ্যকার যোগাযোগ এবং আলাপ-আলোচনা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। এবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এত বেশিসংখ্যক ব্যবসায়ী আসায় এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসার ফলে সে কাজটি ভালোভাবে হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

গ্যাটকো গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম খালেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে বিশালসংখ্যক ব্যবসায়ী-শিল্পপতিকে নিয়ে আসা এবং এখানে বাংলাদেশ ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আরো বেশি বিনিয়োগ করার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন তা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আস্থার সৃষ্টি করবে। এটা এই সফরের সবচেয়ে সফল দিক।

বাংলাদেশ নিট ডায়িং মালিক সমিতির সহসভাপতি আবুল হাসনাত কবির বলেন, দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যত বেশি আলাপ-আলোচনা হবে ততই বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আমাদের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও পণ্য উত্পাদন, মান ও লেনদেন সম্পর্ক ধারণা পাবে। বাণিজ্য বিকাশে তা দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্যই প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে দিল্লিতে নিয়ে এসে সে সুযোগ সৃষ্টি করে দিলেন।