কক্সবাজারে এশিয়ান রেল, ঝিনুক আদলে স্টেশন

কক্সবাজার থেকে: ট্রেনে চড়ে কক্সবাজারে আসতে না পারার আক্ষেপ ঘুচে যাচ্ছে এবার। শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্যান্য দেশ থেকেও রেলপথে আসা যাবে বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্র সৈকতে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

নতুন এ পরিকল্পনায় রামু হবে জংশন। সেখান থেকে একটি লাইন চলে যাবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের পাশে। আরেকটি লাইন পূর্ব দিকে মিয়ানমারের কাছে গুনধুম যাবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রেল নেটওয়ার্ক ট্রান্স এশিয়া রেলওয়েতে যুক্ত হবে বাংলাদেশের রেলপথ। এ রেলওয়ে নেটওয়ার্ক মায়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-ইরান হয়ে যাবে ইউরোপের তুরস্ক পর্যন্ত।

পুরো প্রকল্প শেষ হতে বছর পাঁচেকও সময় লাগবে না। ২০২০-২২ সালের মধ্যেই সব কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে প্রথম দফায় দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার রেললাইনের কাজ শুরু হবে। তখন ঢাকা থেকে সরাসরি রেলগাড়ি আসবে সমুদ্র সৈকতের শহরে।

আর সৈকতের স্টেশনটি হবে ঝিনুকের আদলে। যাতে এটিকে সমুদ্র সৈকতের স্টেশন বলে সহজেই চেনা যায়।

বিশাল ঝিনুক আকৃতির কক্সবাজার স্টেশনে ঝিনুকের ভেতরেই হবে প্লাটফর্ম এবং যাত্রী আসা- যাওয়া ও বসার লাউঞ্জ।

পুরো প্রকল্পটিকে সরকারের ফাস্টট্র্যাক প্রকল্প হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরেই। আর এর মনিটরিং চলছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই। রামু রেল স্টেশনের জন্য নির্ধারিত স্থান। ছবি: সাব্বির

১ এপ্রিল (শনিবার) প্রকল্প এলাকা কক্সবাজার-রামু-দোহাজারী ঘুরে দেখা গেছে, রেললাইনের ‘রুট এলাইনমেন্ট’ পিলার দিয়ে আলাদা করা হয়েছে। চলছে জমি অধিগ্রহণ কাজ। উঁচু নিচু টিলা, বনভূমি ও সমতল সবুজ প্রান্তর পেরিয়ে রেললাইনটি শেষ হবে সমুদ্রতীরের একেবারে কাছে। এজন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও বনবিভাগের অনাপত্তিপত্র নেয়া হয়েছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় জানায়, এ পথে ১৪০ কিলোমিটার নতুন ‘সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ’ রেললাইন নির্মাণ করা হবে। বনভূমির যেসব স্থানে বণ্যপ্রাণী ও হাতির বিচরণ এলাকা, সেসব স্থান চিহ্নিত করে ‘প্যাসেজ’ নির্মাণ করে দেবে রেলওয়ে। ৯টি রেলস্টেশন থাকবে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত। এগুলো হচ্ছে দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ, রামু ও শেষ স্টেশন সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এই স্টেশনস্থল এখনও ধানি জমি। জমিটি রেলওয়ে চিহ্নিত করে রেখেছে। স্থানীয়ভাবে এই জায়গাটির নাম চৌধুরীপাড়া। রামু থেকে চৌধুরীপাড়ায় কক্সবাজার স্টেশনে আসতে রেললাইন দু’বার সড়ক ক্রসিং করবে। একবার লিংক রোড মোড় ও আরেকবার বাইপাস মোড় অতিক্রম করেই কক্সবাজার শহরে আসবে রেললাইন।

আবার রামু থেকে দোহাজারী যেতে হাতির বিচরণ এলাকা অতিক্রম করতে হবে। প্যাসেজ দিয়ে নির্বিঘ্ন চলাচল করতে পারবে হাতি।

প্রকল্পের সবশেষ অগ্রগতি জানিয়ে প্রকল্প কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, চলতি বছরের জুলাই মাসে এডিবির সঙ্গে প্রকল্প চুক্তি হলে আগস্ট মাসেই শুরু হবে কাজ।কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। ছবি: সাব্বির
তিনি আরও জানান, দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণকাজ দুটি ভাগে বিভক্ত করে দরপত্র আহবান করা হয়েছে।

প্রথম ভাগে দোহজারী থেকে চকোরিয়া পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার ট্র্যাক নির্মাণ, রেলের সিগন্যালিং ও টেলিকম্যুনিকেশন কাজ করা হবে। যাতে ব্যয় হবে ৩৬৪১.৪৮ কোটি টাকা।

দ্বিতীয় ভাগে চকোরিয়া থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার ট্র্যাক নির্মাণ এবং কক্সবাজারে আইকনিক ইন্টারমডাল টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করা হবে যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫৯১.২০ কোটি টাকা।

পুরো এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ১৮০৩৪.৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবি সহায়তা দেবে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দোহাজারী-কক্সবাজার-রামু-গুনধুম রেললাইন প্রকল্প পরিচালক মো মফিজুর রহমান বাংলানিউজকে জানান, দরপত্র বাছাই শেষে সম্মতির জন্য এডিবির কাছে পাঠানো হয়েছে। আর কনসালট্যান্ট নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। এডিবির সম্মতির পর ‘প্রাইস বিডিং’ করা হবে। সর্বনিম্ব দরদাতা ঠিক করে সেটি আবার এডিবিতে পাঠানো হবে। তারপর মন্ত্রিসভায় চুড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন করলে ঠিকাদারকে ওয়ার্ক ওর্ডার দেয়া হবে। এখন এই প্রক্রিয়াগুলো চলছে। এরপরই শুরু হবে কাজ।

বাংলাদেশ সময়: ১১১০ ঘণ্টা, এপ্রিল ২, ২০১৭