বিশ্ব দেখল বাংলাদেশ পারে

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের হুমকিকে উড়িয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, আনন্দঘন ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহত্ আন্তর্জাতিক আয়োজন। ঢাকা ঘোষণার মধ্য দিয়ে গতকাল বুধবার শেষ হয়েছে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন-আইপিইউ’র পাঁচ দিনব্যাপী ১৩৬তম সম্মেলন। সম্মেলন সমাপ্তি ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। বিশ্বের ১৩১টি দেশের সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সংসদ সদস্যরাসহ আগত পর্যবেক্ষকরা পরস্পরকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে বিদায় নিলেন। টানা পাঁচদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একসাথে কাটানোর পর পরস্পরকে ছেড়ে যেতে কাউকে কাউকে কিছুটা আবেগাপ্লুত হতেও দেখা গেছে।

এবারের আইপিইউ সম্মেলনে গৃহীত ও ঢাকা ঘোষণার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলো হলো—সার্বভৌম কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপ নয় অর্থাত্ দুর্বলের উপর সবলরা চাপ দেবেন না; আইনিভাবে বৈধ কোনো সরকারকে সে দেশের ভেতর এবং বাইর থেকে ধাক্কা দেয়া যাবে না; বৈষম্য দূর করে সবার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রবৃদ্ধির সুফল হতদরিদ্র ও পশ্চাপদদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার অঙ্গীকার; সংসদসহ সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি; তরুণ ও কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ; বেকরাকত্ব দূর করতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুধা ও খরামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে হাতে হাত ধরে বিশ্বের একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতি। বিশ্বের সাবেক-বর্তমান সকল সংসদ সদস্য এবং নারী-শিশুসহ সকল মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রতিজ্ঞা। এছাড়া কিছু কিছু ইস্যুতে মতপার্থক্য দেখা গেলেও সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদসহ যে কোনো ধরনের চরমপন্থাকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করে বিশ্বে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্র ও সংসদীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কথা দিয়ে গেলেন বিশ্বের প্রতিটি দেশের সর্বোচ্চ ফোরাম তথা আইনসভার প্রতিনিধিরা। গণতন্ত্র বিদ্যমান ও বর্তমান সংসদের প্রতি বিশ্বের

পরিপূর্ণ আস্থা আছে প্রমাণ হলো: স্পিকার

সম্মেলন সমাপ্তির পরপরই সংবাদ ব্রিফিংয়ে আইপিইউর এবারের সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় সংসদের স্পিকা ড. শিরীন শারমিন চৌধরীর কাছে ইত্তেফাক প্রতিনিধির প্রশ্ন ছিল- এই অ্যাসেম্বলি থেকে বাংলাদেশের সবচেড়ে বড় অর্জন কি? অনেক ভেবে-চিন্তে শিরীন শারমিন বললেন ‘এই সম্মেলনের আয়োজক বর্তমান দশম জাতীয় সংসদ, দশম সংসদের আমন্ত্রণেই বিশ্বের সংসদ সদস্যরা বাংলাদেশে এসেছেন। এই সংসদের প্রতি যে দেশের মানুষের এবং বিশ্বের পরিপূর্ণ আস্থা আছে, সেটি এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হলো। বিশ্বের সর্বোচ্চ দুটি সংসদীয় ফোরাম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি এসোসিয়েশন-সিপিএ এবং আইপিইউ’র প্রধান পদে বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত করার মধ্য দিয়েও এটা প্রমাণ হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এদেশে গণতন্ত্র বিদ্যমান সেটিও আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি।

বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ

পেয়েছে বাংলাদেশ: সাবের হোসেন চৌধুরী

সম্মেলন থেকে অর্জনের বিষয়ে সমাপনী সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে আইপিইউ প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে সর্ববৃহত্ আয়োজন। অত্যন্ত সফলভাবে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা প্রমাণ করেছি, বাংলাদেশ বিশ্বকে নেতৃত্ব নিতে সক্ষম। বিশ্বকে এই বার্তা দিতে পারাটাই আমাদের বড় অর্জন। জাতি হিসেবে আমরা মর্যাদার উচ্চতর জায়গায় পৌঁছুতে পেরেছি। তাছাড়া বাংলাদেশ সম্পর্কে এতদিন পর্যন্ত অনেকের ধারণা ছিল- এটা তলাবিহীন ঝুড়ির সেই দেশ, এটা বন্যা-খরা-মঙ্গা ও দুর্যোগের দেশ; কিন্তু বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরা এসে দেখে গেলেন এসবকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ কত সামনে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বদলে দিতে পারাও এই সম্মেলন থেকে অনেক বড় পাওয়া।

ঢাকা ভাগ্যবান শহর: আইপিইউ’র সেক্রেটারি জেনারেল

আইপিইউ’র সেক্রেটারি জেনারেল মার্টিন চুংগং সমাপনী বক্তব্যে বলেন, অত্যন্ত সফল আয়োজন করেছে ঢাকা, এটা একটি ভাগ্যবান শহর। এই সম্মেলনকে ঘিরে আমাদের যেই প্রত্যাশা ছিল তার সবই পূরণ হয়েছে, আমি পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত। গতকাল সম্মেলনের শেসদিনে মার্টিন চুংগং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগামী চার বছরের জন্য আবারও আইপিইউ’র সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন।

বাংলাদেশকে প্রশংসায় ভাসালেন বিশ্ব প্রতিনিধিরা

সম্মেলনের শেষভাগে ভূ-রাজনীতির হিসাবে ভাগ করা অঞ্চলগুলো থেকে একজন করে সমাপনী বক্তব্য রাখেন। এশিয়া প্যাসিফিকের পক্ষ থেকে দেয়া সমাপনী বক্তব্যে ভারতের প্রতিনিধি বলেন, আমি এর আগে আরও কয়েকটি আইপিইউ সম্মেলনে যোগ দিয়েছি। কিন্তু এবারের সম্মেলনটা আমার দেখা সেরা সম্মেলন। এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই সবাই আমার সঙ্গে একমত হবেন। বাংলাদেশের আতিথেয়তা ও সমাদরে আমি অভিভূত। খুব সুন্দর দেশ, অনেক উন্নয়ন দেখে গেলাম। ইউরেশিয়ার প্রতিনিধি বলেন, এরকম একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট ঢাকা আয়োজন করতে পারবে কিনা, এনিয়ে আমরা সংশয়ে ছিলাম। কিন্তু অত্যন্ত সফল একটি সম্মেলন হলো, বিদায় ঢাকা। ব্রুনাই প্রতিনিধি বলেন, ঢাকার আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ। টুয়েল্ভ প্লাস গ্রুপের পক্ষ থেকে পর্তুগালের ডোরাক বলেন, বাংলাদেশকে ধন্যবাদ, এই শহরটাকে খুব মিস করব। আরব গ্রুপের পক্ষ থেকে মরক্কোর প্রতিনিধি বলেন, বাংলাদেশ খুব সুন্দর করে আয়োজন করেছে। আফ্রিকান অঞ্চলের পক্ষে উগান্ডার স্পিকার রেবেকা ক্যারান্ডা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ খুব অতিথি পরায়ণ, আমি খুব মুগ্ধ। নিরাপত্তার কারণে শহরটি ঘুরে দেখতে পারিনি। কিন্তু এখানে মেলাটি দেখে এদেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি কিছুটা হলেও বুঝেছি।

‘বিশ্বব্যাপী সংসদের উপর মানুষের আস্থা কমে গেছে’

আইপিইউ’র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্বব্যাপী সংসদের উপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। এই কমিটির বৈঠকে আলোচকরা গণতন্ত্রকে জোরদারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

‘মানবাধিকার কোনো একক দেশের বিষয় নয়’

আইপিইউ’র শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির আলোচনার রিপোর্ট উপস্থাপনকালে পর্তুগালের প্রতিনিধি বলেন, কোনো দেশে অন্য দেশ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না বলে আমরা এখানে প্রস্তাব পাস করলাম। কিন্তু মানবাধিকার তো কোনো একক দেশের বিষয় নয়। কোনো দেশে মানবাধিকার ক্ষুন্ন হলে তাতে আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হয়, সেটিও আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত।

একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা ও কিবরিয়া হত্যা মামলা পর্যবেক্ষণের প্রস্তাব গৃহীত

বাংলাদেশের একুশে আগস্টের গ্রেন্ডে হামলা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলা দুটি আইপিইউ’র সংসদ সদস্যদের মানবাধিকার বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি পর্যবেক্ষণ করবে বলে গতকাল সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। গতকাল দিনের প্রথম ভাগে এই কমিটির বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই কমিটির প্রধান আফগানিস্তানের ফৌজিয়া কোফি জানান, বিশ্বব্যাপী সাবেক ও বর্তমান এমপিদের মানবাধিকার লংঘনের মোট ৪৫৯টি মামলা এই কমিটির কাছে এসেছে। কমিটি গুরুতর বিষয়গুলো পরীক্ষা করছে, প্রয়োজনে এগুলো দেখার জন্য আইপিইউর প্রতিনিধিও পাঠানো হবে।