সহযোগিতার নতুন জানালা খুলে যাবে

বীণা সিক্রি
কূটনীতিক বীণা সিক্রি ২০০৩-০৬ পর্যন্ত ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালেই পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এর আগে দীর্ঘ ৩৫ বছর মালয়েশিয়া, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের ভারতীয় দূতাবাসে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে বীণা সিক্রি দিলি্লর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক এবং দিলি্লভিত্তিক সাউথ এশিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারপারসন। তিনি ভারতের পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতক ও দিলি্ল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন – সাক্ষাৎকার গ্রহণ :শেখ রোকন

সমকাল :শুভ সকাল মিসেস সিক্রি! ঢাকায় এখন বৃষ্টি হচ্ছে, দিলি্লর আবহাওয়া কেমন?

বীণা সিক্রি :শুভ সকাল! এখানে আবহাওয়া বেশ উষ্ণ।

সমকাল :আমরা জানি, আপনি ঢাকায় হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন ছাড়াও বর্তমানে জামিয়া মিলিয়ায় বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। বাংলাদেশ বিষয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ ও প্রবন্ধ লিখেছেন, গবেষণা করছেন। এ মুহূর্তে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বীণা সিক্রি :আমি মনে করি, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এ মুহূর্তে ঐতিহাসিক উচ্চতায় অবস্থান করছে। দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা, কানেকটিভিটি, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ সব প্রেক্ষিতেই সহযোগিতা ও বোঝাপড়া এমন মাত্রায় রয়েছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। এই উচ্চতা এমনিতেই আসেনি, অর্জন করতে হয়েছে। আমি বলব, দুই দেশের সরকারই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এই উচ্চতা অর্জন করেছে।

সমকাল :এমন সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে, আপনি জানেন। এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করবেন?

বীণা সিক্রি :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সফরের জন্য আমরা সবাই অপেক্ষা করছি। গোটা ভারত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে। তিনি ২০১০ সালে ভারত সফরে এসে সহযোগিতার নতুন মাত্রার বার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন। এর পরের বছর আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ঢাকা সফরে গিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ঢাকা সফর করেছেন। সেদিক থেকে শেখ হাসিনার এই সফর ফিরতি হলেও সাত বছরের বেশি সময় পরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দায়িত্ব গ্রহণের পর এটা হবে ভারতে শেখ হাসিনার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। এর মধ্যে দু’বার অবশ্য শেখ হাসিনা ভারতে এসেছেন। তখন প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে তার দেখাও হয়েছে। সর্বশেষ গোয়ায় অনুষ্ঠিত ব্রিকস-বিমসটেক সম্মেলনে তাদের সাক্ষাৎ হয়েছে এবং সম্মেলনের সাইডলাইনে দু’জন বৈঠক করেছেন, আলোচনা করেছেন। তারও আগে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির স্ত্রী বিয়োগের পর তিনি ব্যক্তিগত সফরে নয়াদিলি্ল এসেছিলেন। মোট কথা, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে যোগাযোগে কখনও ছেদ পড়েনি। বিভিন্ন ইস্যুতেই তারা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদির আমলে এটাই ভারতে শেখ হাসিনার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। আমি মনে করি, সে কারণে এই সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একেকটি রাষ্ট্রীয় সফরের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মাত্রায় পেঁৗছে। আগেই বলেছি, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ইতিমধ্যে এক ঐতিহাসিক উচ্চতায় পেঁৗছেছে; এখন সেটা আরও নতুন মাত্রা পাওয়ার অপেক্ষা করছে। আমি বিশ্বাস করি, এই সফরের মধ্য দিয়ে অনেক বিষয় আরও স্পষ্ট হবে, পুরনো কিছু বিষয়ের সুরাহার পথ খুলে যাবে, দুই দেশের সহযোগিতার নতুন নতুন জানালা উন্মুক্ত হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক অনেকদূর এগিয়ে যাবে। মাত্র এক দশক আগেও যা কল্পনা করা যায়নি, তা এখন বাস্তবে পরিণত হবে।

সমকাল :এবারের সফর সামনে রেখে বহুল আলোচিত একটি বিষয় প্রতিরক্ষা সমঝোতা বা চুক্তি। আপনি বললেন যে দুই দেশের সম্পর্ক এখন ঐতিহাসিক উচ্চতায়। তারপরও একটি প্রতিরক্ষা বিষয়ক সমঝোতা বা চুক্তি কি জরুরি?

বীণা সিক্রি :হ্যাঁ, বিষয়টি নিয়ে আমি বাংলাদেশি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু নিবন্ধ পড়েছি। তারা যেন খানিকটা সন্ধিগ্ধ। আমি বলতে চাই, প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সমঝোতা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো একই। দুই দেশকেই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আপনি দেখবেন, ইতিমধ্যে দুই দেশ নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা গড়ে তুলছে। পরস্পরকে সহায়তা করছে। দুই দেশের সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ হচ্ছে, যৌথ মহড়া হচ্ছে, সীমান্ত যৌথ টহল নিয়ে উদ্যোগ বেড়েছে। তাহলে একটি চুক্তি বা সমঝোতার আওতায় তা করতে বাধা কোথায়? আমি বলব, বরং এতদিন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে নজর দেওয়া হয়নি। আরও আগে এ বিষয়ে দুই দেশের অগ্রসর হওয়ার

উচিত ছিল।

সমকাল :আপনার কি মনে হয়, প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সমঝোতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার হতে পারে?

বীণা সিক্রি :আমি মনে করি না। অন্তত হওয়া উচিত নয়। কারণ দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা বিষয়ক চুক্তি বা সমঝোতা কি নতুন কিছু? ভারতের সঙ্গে অনেক দেশের আছে, বাংলাদেশের সঙ্গেও অনেক দেশের আছে। ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশীর প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গেও হবে, এটাই স্বাভাবিক, এটা সাধারণ বিষয়। আর বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তো বরাবরই বলে আসছে, তারা সবাই ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। তাহলে প্রতিবেশী বা বন্ধুর সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সমঝোতা হতেই পারে। চীনের সঙ্গে কি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বিষয়ক সম্পর্ক নেই? সেটা নিয়ে কেউ কি কিছু বলছে? চীনের সঙ্গে থাকতে পারলে ভারতের সঙ্গে থাকতে সমস্যা কোথায়?

সমকাল :কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন ক্রয়ের পর থেকেই ভারতের দিক থেকে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সমঝোতা করার তাগিদ বেড়েছে। আপনি কী মনে করেন?

বীণা সিক্রি :আমি মনে করি না বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে চীনা প্রেক্ষিতের কোনো ভূমিকা রয়েছে। আসলে প্রত্যেক দেশই সার্বভৌম। কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক হবে, সে সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই গ্রহণ করবে। চীন-ভারত সম্পর্ক, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আলাদা। তাদের নিজেদের বিবেচনায় তারা সম্পর্কের ধরন ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে থাকে। এর সঙ্গে অন্য কোনো দেশের সম্পর্ক থাকে না। একই সঙ্গে আপনাকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ ও ভারত দক্ষিণ এশীয় দেশ। আমাদের সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি অভিন্ন। চীন দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের। এমনকি ভৌগোলিকভাবেও যদি আপনি দেখেন, বাংলাদেশ ও ভারত অভিন্ন। চীন আলাদা। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি ভৌগোলিক যোগাযোগ নেই। অপরদিকে বাংলাদেশ ও ভারত পরস্পরের সঙ্গে দীর্ঘতম সীমান্তরেখার অংশীদার। আমি মনে করি না, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দিক থেকে ভারত ও চীনের তুলনা হতে পারে। বাংলাদেশ কি চীন থেকে অস্ত্র ক্রয় করে না? সেখানে ভারতের প্রসঙ্গ কি আসে? বাংলাদেশের দিক থেকে চীন ও ভারতের সঙ্গে তুলনার কোনো অর্থ নেই।

সমকাল :আমরা দেখছি, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘতম সীমান্তরেখাও সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করে। এটা ঠিক যে দুই দেশ বিলম্বে হলেও দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছে। ছিটমহল বিনিময় হয়েছে। কিন্তু সীমান্ত হত্যাকাণ্ড এখনও বাংলাদেশের মানুষের কাছে বড় উদ্বেগের বিষয়।

বীণা সিক্রি :এটা দুই পক্ষের জন্যই উদ্বেগজনক। আবার দুই পক্ষই একমত যে কেন এসব দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ে বা সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠকে এই বিষয়টি প্রত্যেকবারই আলোচনা হয়। দুই পক্ষই একমত যে সবাই সীমান্তে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায়। কিন্তু এটাও সত্য যে সীমান্তে নানা ধরনের চোরাচালান হয়। এর মধ্যে অস্ত্র চোরাচালানও রয়েছে। জঙ্গিরাও এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বা সেগুলো তাদের হাতে গিয়ে পেঁৗছে। ভারতের কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীও সীমান্ত এলাকায় বেআইনি যাতায়াত ও চোরাচালান করে। ফলে নিরাপত্তার স্বার্থেই সীমান্তে কড়া নজরদারি ও সতর্কতার প্রয়োজন হয়। কড়াকড়ি করতে গিয়ে রাতে আরও কঠোর পাহারা দিতে হয়। তখন সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। চোরাচালান ও রাতে অবৈধ যাতায়াত বন্ধ করা গেলে এর হার অনেক কমে আসবে। বিজিবি ও বিএসএফ উভয় পক্ষই এ ব্যাপারে একমত।

সমকাল :কারণ যাই হোক, তার জন্য কি প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড বৈধতা পেতে পারে? ভারতের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না কেন?

বীণা সিক্রি :না, আমি বৈধতার কথা বলছিও না। আপনি দেখবেন, সীমান্তে কেবল বাংলাদেশি নাগরিক নয়, ভারতীয় নাগরিকও হতাহতের ঘটনা ঘটে। এমনকি বিএসএফও হামলার শিকার হয়। এগুলো কমাতে পারে কেবল দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা। আপনি দেখবেন, গত দুই বছরে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। নন-ল্যাথাল বা অ-প্রাণঘাতী বুলেট ব্যবহার করা হচ্ছে। সীমান্তে চোরাচালান কমেছে, অস্ত্র পাচার কমেছে। কারণ দুই বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বেড়েছে। সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন ও ছিটমহল বিনিময়ের কারণেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, আগামী বছরগুলোতে আরও উন্নতি লাভ করবে। আমরা দুই পক্ষ মিলেই সীমান্তে হতাহতের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারব।

সমকাল :গত কয়েক মাসেও কিন্তু বেশ কয়েকটি সীমান্ত হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

বীণা সিক্রি :আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন, কী পরিস্থিতিতে এগুলো হয়েছে। আমি বলতে পারি, এর প্রায় প্রত্যেকটির সঙ্গে গরু চোরাচালান জড়িত। চোরাচালানি বা পাচারকারী ছাড়া রাতের বেলায় কেন সীমান্ত এলাকায় যাবে বা সীমান্ত অতিক্রম করবে? প্রত্যেকটি ঘটনার পর কিন্তু বিএসএফ বা বিজিবির মধ্যে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়, তদন্ত হয়। কেউ যদি দোষী হন, তার শাস্তিও হয়। আমি বলব, দুই দেশের মিডিয়ারই উচিত এই ঘটনাগুলো নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট করা। প্রকৃত কারণ ও চিত্র তুলে ধরা। জনসাধারণ প্রকৃত চিত্র বুঝতে পারবে। তাতে করে ভুল বোঝাবুঝি কমবে। সীমান্ত এলাকার মানুষও সচেতন হবে।

সমকাল :মিডিয়াতে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির জন্য বাংলাদেশের মানুষ কতটা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিলি্ল সফরও অন্তত তিন দফা পিছিয়েছে দৃশ্যত ভারতের দিক থেকে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য। কিন্তু এবারও চুক্তিটি স্বাক্ষর হবে না বলেই জানা যাচ্ছে। ভারতের দিক থেকে কি আন্তরিকতার অভাব?

বীণা সিক্রি :দেখুন, ভারতের দিক থেকে আন্তরিকতার অভাব যে নেই, সেটা ২০১১ সালেই প্রমাণ হয়েছে। চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা গিয়েছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে স্বাক্ষর করা যায়নি। এর পরের ইতিহাস আপনারা জানেন। আমি নিশ্চিত, এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের সময় চুক্তিটি স্বাক্ষর না হলেও আলোচনায় অনেকদূর অগ্রগতি হবে। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন, এবারের সফরে স্বাক্ষর না হলেও অচিরেই এ স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। আরেকটি প্রেক্ষিত হচ্ছে, তিস্তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার মধ্যেই কিন্তু বেসিনওয়াইজ বা অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতার প্রশ্নটি সামনে চলে আসছে। দুই দেশ অভিন্ন নদীগুলোর অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় একমত হয়েছে। এটা একটা বড় অগ্রগতি বলে আমি মনে করি। কারণ পানি ভাগাভাগি করে কোনো দেশই লাভবান হবে না। ইতিমধ্যে গঙ্গা ব্যারাজ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। এটা হলে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা অববাহিকায় পানির সংকট কমে যাবে।

সমকাল :ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কীভাবে কমানো যায়?

বীণা সিক্রি :বাণিজ্য ঘাটতি কমতে পারে কেবল বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমেই। আর কিছু দিয়ে নয়। আর আশাব্যঞ্জক দিক হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ দ্রুত গতিতে বাড়ছে। আমি যখন ঢাকায় হাইকমিশনার ছিলাম, তখন দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ডলার। এখন সেটা ছয়শ’ কোটি ডলারে পেঁৗছেছে। দুই দেশের কানেকটিভিটি যত বাড়বে, বাণিজ্য তত বাড়বে। বাণিজ্য ঘাটতি তত কমে আসবে। আমরা আনন্দিত যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কানেকটিভিটি বেড়েছে। মনে রাখতে হবে, এটা শুধু ভারতের জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও সুযোগ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ ভারতের বিরাট বাজার বাংলাদেশের জন্য রয়েছে। কানেকটিভিটির মাধ্যমে সেখানে প্রবেশ করতে পারবে বাংলাদেশি পণ্য। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে পণ্য উৎপাদন করে ভারতের বাজারে সরবরাহ করতে পারবেন। এতে করে বাংলাদেশের আয় ও কর্মসংস্থান অনেক বেড়ে যাবে।

সমকাল :ভারতের দিক থেকে অশুল্ক বাধা এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা।

বীণা সিক্রি :দেখুন, বাণিজ্য বেড়ে গেলে এগুলো থাকবে না। ইতিমধ্যেই অনেক কমেছে। অশুল্ক বাধা সম্পূর্ণ কমে যাবে। এ জন্য আমাদের কানেকটিভিটি বাড়াতে হবে। দুই দেশের মধ্যে পণ্য বিনিময় যত বাড়বে, এই বাধা তত কমতে থাকবে। এটাও মনে রাখতে বলি, চীনের সঙ্গে কিন্তু বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ও অশুল্ক বাধা আরও বেশি। কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের এখন যে মাত্রা, তাতে যে কোনো কিছু নিয়েই আলোচনা হতে পারে। আলোচনা করে সমাধান হতে পারে। বাণিজ্য ঘাটতি বা অশুল্ক বাধাও দূর করা কোনো ব্যাপার নয়।

সমকাল :দুই দেশের নাগরিক সমাজের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক দেখছেন?

বীণা সিক্রি :এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও যাতায়াত বেড়েছে। সহযোগিতা বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা বাড়ছে। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, চট্টগ্রাম বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও আমরা যৌথ গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করছি। সাংবাদিকদের মধ্যে যাতায়াত বেড়েছে। সংস্কৃতি কর্মীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ছে। এর ফলে নাগরিক সমাজ পরস্পরের সম্পর্কে জানতে পারছে। বোঝাপড়া বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে।

সমকাল :আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

বীণা সিক্রি :সমকালের জন্যও শুভকামনা। ভালো থাকবেন।