ট্রান্স এশিয়ায় যুক্ত হচ্ছে দোহাজারী কক্সবাজার-ঘুমধুম রেলপথ

হাতি চলাচলের ৬টি পথ রেখে দ্রুত নির্মাণ হচ্ছে দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার রেলপথ। ইতিমধ্যে এক হাজার ৩৯০ একর ভূমি অধিগ্রহণসহ সব প্রক্রিয়াগত কাজ শেষ হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে দরপত্রের কাজও শেষ হবে এবং আগস্ট মাসের মধ্যে ১৪০ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণকাজ শুরু হবে। এর মধ্যে ১০১ কিলোমিটার মূল লাইন ও ৩৯ কিলোমিটার লুপ লাইন রয়েছে।
প্রথম ধাপে চট্টগ্রামের দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত। এরপর দ্বিতীয় ধাপে রামু থেকে মিয়ানমার-সংলগ্ন ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেললাইন হয়ে ট্রান্স এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে এ রেলপথ। যা মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-ইরান হয়ে যাবে ইউরোপের তুরস্ক পর্যন্ত। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজারের ঝিলংজা ও রামু এলাকা সরজমিনে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব চিত্র পাওয়া গেছে।
দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিায়ানমারের কাছে ঘুনধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
কক্সবাজার ঝিলংজা মৌজার চৌধুরীপাড়ায় স্থাপন করা হবে দৃষ্টিনন্দন টার্মিনাল। আর এই টার্মিনাল ঘিরে তৈরি হচ্ছে উৎসবের আমেজ। দৃষ্টিনন্দন টার্মিনাল নির্মাণ হওয়ার খুশিতে আত্মহারা চৌধুরীপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা। আবার অনেকে আনন্দে উদ্বেলিত। তারা বলেছেন, রেলপথ হলে এলাকার উন্নয়ন হবে ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে।
ঝিলংজা গ্রামের বাসিন্দা শফিক জানান, তাদের অনেকের জমি পড়েছে এই টার্মিনালে। তবুও তারা খুশি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পর্যটন এলাকা কক্সবাজার। দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে আসবে। এলাকার উন্নয়ন হবে। অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি হবে।
রেলওয়ের (পূর্ব) সহকারী পরিচালক মহিউদ্দিন বলেন, শিগগিরই আমরা আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছি দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম এ রেল যোগাযোগ প্রকল্পে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারের নান্দনিক সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি বদলে যাবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ সামগ্রিক চিত্র।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত থাকছে ৯টি রেলস্টেশন। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকোরিয়া, ডুলাহাজরা, রামু, ঈদগাহ হয়ে কক্সবাজার। রেলস্টেশনগুলোর ডিজাইন করা হয়েছে সেখানকার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ভিত্তি করে। এর মধ্যে কক্সবাজার রেল স্টেশনটির ডিজাইন করা হয়েছে সমুদ্রের ঝিনুক আদলে। আরো আনন্দের খবর হলো, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন যাবে কখনো পাহাড় ঘেঁষে, কখনো গভীর জঙ্গলের পাশ দিয়ে। ফলে ট্রেনের যাত্রীরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ট্রেনে ভ্রমণ করবেন।
এ ছাড়া দৃষ্টিনন্দন এই টার্মিনালকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বর্তমান সরকার। এ টার্মিনালের চারপাশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হোটেল, বাণিজ্যিক ভবন, বিপণিবিতান, বহুতলবিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণের বহুমুখী পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। অগ্রাধিকার ও দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের ১০টি মেগা প্রকল্পের অন্যতম চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণকাজ।
তিনি আরো জানান, আন্তর্জাতিক রেল নেটওয়ার্ক ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের (টিএআর) সঙ্গে যুক্ত হতেই রেলপথটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ১৮৯০ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রথম পরিকল্পনা নেয়া হয় এই রেলপথ নির্মাণে। চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের আকিয়াব বন্দরের মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপনে প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করেছিল সাবেক ব্রিটিশ কলোনি মিয়ানমার। মিয়ানমার রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম থেকে রামু ও কক্সবাজার হয়ে রেলপথ নির্মাণের জন্য সমীক্ষা চালানোর উদ্যোগ নেয়।
১৯০৮-০৯ সালে সমীক্ষাও চালায়। এরপর ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম-দোহাজারী-রামু হয়ে আকিয়াব পর্যন্ত আবারো সমীক্ষা চালানো হয়। প্রকল্পের কাজও শুরু হয়। তখন চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটারের মতো রেলপথ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাকি রেলপথ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। পরে ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার ৩টি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করে। এরপর ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সরকার উদ্যোগ নিলেও সফল হয়নি। জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস (জেআরটিএস) ১৯৭১ সালে ট্রাফিক সম্ভাবনা সমীক্ষা করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তাও সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার উদ্যোগ নেয়া হয়। তৎকালীন সরকারের অনুরোধে ১৯৭৬-৭৭ সালে আবার সমীক্ষা করে জেআরটিএস। পরে ১৯৯২ সালে এসকাপ কমিশন অধিবেশনে ৩টি ইউরো-এশিয়া রেল নেটওয়ার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়।
শুরুতে মিটারগেজ সিঙ্গেল লাইনে হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে ব্রডগেজসহ ডুয়েল লাইনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে প্রকল্পটি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পর্যটন শহর কক্সবাজার রেল নেটওর্য়াকের আওতায় আসবে। এর ফলে পর্যটনশিল্পের যেমন বিকাশ ঘটবে, তেমনি বিস্তৃত হবে সেখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য।
এ রেললাইন নির্মিত হলে পর্যটকদের কক্সবাজার যাতায়াতে যেমন সুবিধা হবে সেই সঙ্গে সাধারণ যাত্রীদেরও দুর্ভোগ লাঘব হবে অনেকখানি। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রেললাইনটি চালু হলেই কক্সবাজারের পর্যটক সংখ্যা দ্বিগুণ হবে বলে মনে করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এক্সপ্রেস রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে সময় লাগবে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। কক্সবাজার ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের পাশাপাশি সরকারের এ মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের সাধারণ জনগণ ।
দোহাজারী-কক্সবাজার-রামু-ঘুমধুম রেললাইন প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান জানান, বর্তমানে প্রকল্পের দরপত্র বাছাই শেষে সম্মতির জন্য এডিবির কাছে পাঠানো হয়েছে। আর কনসালট্যান্ট নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। এডিবির সম্মতির পর ‘প্রাইস বিডিং’ করা হবে। সর্বনি¤œ দরদাতা ঠিক করে সেটি আবার এডিবিতে পাঠানো হবে। তারপর মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন করলে ঠিকাদারকে ওয়ার্ক ওর্ডার দেয়া হবে। এরপরই শুরু হবে কাজ।