ইটভাঙা নারীদের ভাগ্য বদলের গল্প

জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে ভোর হতে চলছে ঠুুশঠাশ হাতুড়ি পেটার শব্দ। কঠিন ইটের গায়ে আঘাত হেনে চলেছে নানান বয়সী নারী। রাস্তার দু’পাশে। বাড়ির আঙিনায়। কোথাও বারান্দায় কিম্বা রান্নাঘরের ভেতরেই স্বাচ্ছন্দ্যে হচ্ছে এই ইট ভাঙ্গার উৎসব। এটি পাঁচবিবি পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের তুড়িপাড়া ভূমিহীন আদিবাসী পল্লীর প্রতিদিনের দৃশ্য। সংসারের সব কাজ করার পাশাপাশি ইট ভেঙে পরিবারের অভাব দূর করতে নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন এ গ্রামের শতাধিক নারী। জীবন যুদ্ধে সংগ্রামী কোকিলা, পুরবী, বেনু, আকালী, বুলো, শুকদা, রাধারাণী সরকার, বাসন্তী, নীরা, শেফালী, পঞ্চ, নার্গিস, পূর্ণিমা, মালতি, ইতি, চাম্পা, সন্ধ্যা, তারা, আদরী, শিউলি, দুর্গী, ববিতা, চন্দনা, শিল্পী, দেবী, শোভা রাণী, কৃষ্ণা রাণী, খিরো, রিতা, আরতি, শেফালী-২, কল্পনা, মিনতি, সরথিসহ শতাধিক নারী জানান, ২৫ বছর আগের কথা। তখন তারা কিশোরী। বাবা কখনো কুলি কখনো রিকশা চালাতেন। সারা দিন খেটে যা রোজগার করতেন তা দিয়ে ৪-৫ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ হতো না। কিছু একটা করে সংসারের অভাব দূর করার তাড়নায় একদিন তারা ঘর থেকে বের হন নিঃসংকোচে। এ কারণে সহ্য করতে হয়েছে অমানসিক নিপীড়ন। তবুও তারা থেমে থাকেনি। এই ভাঙ্গাগড়ার জীবনে অনেকেই এখন সচ্ছল। তারা আরো বলেন, বন-জঙ্গল। পুরোনো পরিত্যাক্ত বাড়ি। রাস্তা-ঘাটে-মাঠে-কুড়িয়া পাওয়া ইট দিয়ে সূচনা ঘটে ইটের খোয়ার ব্যবসা। পরে গ্রামে খোয়ার ব্যবসা প্রসারিত হলে দেখা দেয় ইটের আকাল। ফলে সকলেই শরণাপন্ন হন ইট ভাটায়। তৎকালে ৩-৪ জন যুক্ত ছিলেন এই ব্যবসায়। এখন শ্রমজীবী নারীর সংখ্যা শতাধিক। বর্তমানে ভাটা থেকে ১ ভ্যান ইট ভাড়াসহ ক্রয় করছেন তারা ৫০০ টাকা। ভেঙে খোয়া তৈরি হচ্ছে ৪০ ডালি। প্রতি ডালি খোয়া বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা। এতে খরচ বাদে ইটের প্রতি ভ্যানে লাভ হয় ৩০০ টাকা। এই ব্যবসায় টাকা আটকায় না। ভাঙলেই টাকা। লাভ কম হলেও বিক্রি বেশি। আগে তেমন লাভ হতো না। বিক্রি ছিল কম। এখন খোয়া ব্যবসায় পরিবর্তন এসেছে। নির্মাণ কাজ বেড়ে যাওয়ায় প্রচুর চাহিদা। অঘোষিত খোয়ার বাজার সৃষ্টি হয়েছে এখানে। খুচরা ও পাইকারদের ভিড়ে সবসময় সড়কে থাকে খোয়ার বাজার। এই খোয়া ঠিকাদার মহলে সুনাম কুড়িয়েছে। সংসারেও বাড়তি অর্থ যোগ হচ্ছে। আর স্বামী সন্তানদের উপার্জনের অপেক্ষায় থাকতে হয় না। ১৯ শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজরা ভারতের কোচবিহার অঞ্চলের এসব অভাবি মানুষকে জোরপূর্বক ও লোভের ফাঁদে ফেলে তাদের কাজে ব্যবহারের জন্য এখানে নিয়ে আসতেন। পরে স্টেশন কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হলে এই সম্প্রদায়ের লোকেরা আশেপাশের বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে বসবাস শুরু করে বলে তারা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।