৬শ’ কোটি টাকার উৎসব ভাতা পেলেন সরকারী চাকরিজীবীরা

মার্চ মাসের বেতনের সঙ্গে প্রায় ৬শ’ কোটি টাকার উৎসব ভাতা পেলেন দেশের সরকারী চাকরিজীবীরা। বেসরকারী খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে গত মাসের বেতন হয়ে গেছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান বৈশাখী ভাতা এবার থেকে চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছে। অসাম্প্রায়িক বাঙালী জনগোষ্ঠী বৈশাখ বরণে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। সর্বজনীন এই উৎসব ঘিরে সারাদেশে শুরু হয়েছে বৈশাখী কেনাকাটা। মার্কেট, বিপণি বিতান, শপিংমল ও ফ্যাশন হাউসগুলো সেজেছে বর্ণিল সাজে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অর্থনীতিতে বইছে সুবাতাস। উৎসব কেন্দ্রিক অর্থনীতির ব্যাপ্তি ছড়িয়ে দিতে আগামীতে সরকারীভাবে নবান্ন উৎসব এবং পৌষ উৎসব পালনের সিদ্ধান্ত আসছে। এজন্যও থাকবে সরকারী বরাদ্দ। আগামী বাজেটে এ সংক্রান্ত একটি ঘোষণা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণায়। জানা গেছে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং বাঙালীর মূল শেকড় বাঁচিয়ে রাখতে সব ধরনের উৎসব-পার্বণে সরকারী সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে। আর এ কারণেই সরকারী কর্মকর্তাদের বৈশাখী ভাতা প্রদান করে এই উৎসবকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়ে গেছে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, উৎসব পার্বণের দেশ বাংলাদেশ। পয়লা বৈশাখ স্বীকৃতি পেয়েছে। বাঙালীর সর্বজনীন এই উৎসব বাংলাদেশের বাইরেও পালন করা হয়। এবার নবান্ন এবং পৌষ উৎসব সরকারীভাবে পালনের সিদ্ধান্ত আসবে। তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা দেয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে, বাকি কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

এদিকে, পয়লা বৈশাখের উৎসব শুধু এখন আর পান্তা-ইলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পান্তা-ভর্তার পাশাপাশি সমান তালে চলে কোরমা-পোলাও খাওয়ার ধুম। খাবারের ম্যানুতে থাকে হরেক রকম মিষ্টান্ন। সর্বজনীন এই উৎসবটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে দেশের এখন সবচেয়ে বড় উৎসবের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে এই উৎসব ঘিরে বাড়ছে অর্থনৈতিক কর্মকা-ও। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির এই ঘোষণায় এবছর সব উপজেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ রয়েছে সরকারের। এতে করে শহর থেকে গ্রাম এবং গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র পয়লা বৈশাখের ব্যাপ্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পয়লা বৈশাখ ঘিরে কেনাকাটা শুরু হয়ে সর্বত্র।

সরকারী কর্মকর্তা মাহমুদা মনি জনকণ্ঠকে বলেন, উৎসব ভাতার টাকা বেতনের এ্যাকাউন্টে এসে গেছে। এবার কেনাকাটা শুরু হবে। তিনি বলেন, মূল বেতনের বাইরে যে ভাতা পাওয়া গেল, সেই টাকার পুরোটাই ব্যয় করা হবে বৈশাখ উৎসবে। পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটার পাশাপাশি ওইদিন ভাল খাবারদাবারের আয়োজন করা হবে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর আগেও পয়লা বৈশাখে এত মাতামাতি ছিল না। কিন্তু এখন ভাতা পাওয়ায় এই উৎসব বেশ ভালভাবেই পালন করা হয়। তাই এবারের প্রস্তুতি আরও বেশি।

এছাড়া বৈশাখের অন্যতম বড় দিক হচ্ছে-নতুন পোশাক। নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ফ্যাশন হাউসগুলো তৈরি করছে বাহারি সব পোশাক। শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, টি শার্টসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকে ভরে উঠছে সারদেশের পোশাক হাউসগুলো। নারী- পুরুষ ভেদে পোশাকের কদর বেড়ে যায় সর্বত্র। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্যমতে, রাজধানীসহ সারাদেশে প্রায় সাড়ে ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার বুটিক ও ফ্যাশন হাউস রয়েছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জ, সদরঘাট, জিঞ্জিরা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হচ্ছে বৈশাখী পোশাক। এসব পোশাক এখন শোভা পাচ্ছে রাজধানীসহ সারা দেশের ফ্যাশন হাউসগুলোয়। এ প্রসঙ্গে বিক্রেতারা বলছেন, ঢাকায় বৈশাখ ঘিরে ঈদের মতো মার্কেট জমে ওঠে। তা ছাড়া প্রতিবছরই ঢাকার বাইরে প্রচুর পরিমাণ পোশাক বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ থেকে নেয়া হয়। পুরান র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটের আড়ংয়ের বিক্রয়কর্মী সালমা জাহান জানালেন, বৈশাখ ঘিরে বাহারি সব শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া ও টি শার্ট আনা হয়েছে। এগুলোর বিক্রিও ভাল হচ্ছে। একই কথা বললেন, র‌্যাঙ্কিন স্ট্রিটের কে-ক্রাফটের বিক্রেতা হায়দার হোসেন। তিনি বলেন, বৈশাখ উৎসব ঘিরে তাদের পোশাকে ডিজাইন ও রঙে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। ধীরে ধীরে ক্রেতা বাড়ছে। বৈশাখের আগে তাদের সব পোশাক বিক্রি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করলেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ঢাকার বেইলি রোড, আজিজ মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, বসুন্ধরা ও যমুনা ফিউচার পার্কসহ সর্বত্র বৈশাখী পোশাকের ছড়াছড়ি। পোশাকের পাশাপাশি এই উৎসবে বিক্রি হবে মাটির বাসন, মাটির গহনা থেকে সোনার গহনা। মুরালি, চিরা, দই, পোলাওয়ের চাল ও মাংসের চাহিদা রয়েছে। গেঞ্জি, ফতুয়া থেকে শাড়ি এবং বাশের বাঁশি থেকে স্টিল আলমারি, খাট, বিছানার চাদর থেকে পর্দা ও ফ্লোর কার্পেট সব বিক্রি হবে এই উৎসবে। বিক্রি হবে টিভি ও ফ্রিজ। তাই সব পণ্যের দোকানেই এখন ভিড়। এই ভিড় সর্বজনীন। জাতিধর্মনির্বিশেষে সব ক্রেতা এসব দোকানে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান কারও মধ্যে কোন ফারাক নেই। সবাই কেনাকাটা শুরু করেছেন। বৈশাখের এই কেনাকাটায় সবাই যেন একাকার।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এস কাদের চৌধুরী কিরণ জনকণ্ঠকে বলেন, সর্বজনীন এই উৎসবের কেনাকাটা প্রতিবছর বাড়ছে। বিশেষ করে গত বছর থেকে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা দেয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরে এসেছে। দ্বিধা নয়, এখন ধরেই নেয়া যায় বৈশাখে কেনাকাটা ও বিক্রিবাট্টা হবে। এছাড়া সবর্জনীন উৎসব হওয়ায় অর্থনীতিতে এর একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। পার্বণের এই দেশে আগামীতে এ ধরনের আরও উৎসব পালিত হতে পারে। তিনি বলেন, এজন্য সরকারী সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন।

এদিকে, পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে অনেকেই বেড়িয়ে পড়েন শহর ছেড়ে গ্রামে, আবার কেউ গ্রাম থেকে শহরে আসেন শহরের বৈশাখ উদযাপন দেখতে। আবার কেউ যান পর্যটন এলাকা বিশেষ করে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, সিলেট ও কুয়াকাটায়। কেউ ছুটবেন সুন্দরবনে। কেউ যান একা, আবার কেউ ছোটেন পরিবারপরিজন নিয়ে। তাই পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পর্যটন এলাকার হোটেল মোটেল রেস্তরাঁসহ সব ধরনের ব্যবসায়ীরাই এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, ক্রেতা আকর্ষণে এখন মুঠোফোনে কথা বলা থেকে ইন্টারনেট চালানো, কেনাকাটা সব ক্ষেত্রেই দেয়া হচ্ছে বিশেষ ছাড়। বাংলা নববর্ষ বরণ করতে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে পার্ক-উদ্যান, পাড়া-মহল্লায় ছোট-বড় নানা অনুষ্ঠানের। গ্রামগঞ্জে চলছে অসংখ্য মেলার আয়োজন। শহরের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে এক ধরনের বৈশাখী তাঁত মেলা। এসব কর্মকা- ঘিরে আর্থিক লেনদেন বাড়ায় অর্থনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে।