প্রান্তজনের সপক্ষে সামাজিক সমঝোতা অটুট থাকুক

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে সাধারণ মানুষের বিপুল আত্মত্যাগের বিনিময়ে। পাকিস্তান নামের কতিপয়তান্ত্রিক, আমলানির্ভর নির্মম রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় ঘটেছিল সাম্প্রদায়িক অনুভূতির সুড়সুড়ির মাধ্যমে। পূর্ব বাংলার কৃষক ও সাধারণ মানুষকে একধরনের ফাঁকি দিয়েই এ অস্বাভাবিক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। তাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিপুল ভোটে পাকিস্তানের পক্ষে জনমত তৈরি করা হয়। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করে কৃষকদের জমি প্রদান, উঠতি মধ্যবিত্তের শিক্ষা ও কর্মের সুযোগ বৃদ্ধি, খাদ্যসংকট নিরসনসহ নানা গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে পাকিস্তানের পক্ষে গণভোট দিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ওই ভ্রান্ত রাষ্ট্রের আসল চেহারা পরিষ্কার হতে থাকে। রাজধানী করা হলো পশ্চিম পাকিস্তানে। সংখ্যাগুরু মানুষের বাস পূর্ব বাংলার নাম পাল্টে পূর্ব পাকিস্তান করা হলো। সামরিক-বেসামরিক আমলাদের ৯০ শতাংশই পশ্চিম পাকিস্তানি। প্রশাসনে তাদের একচেটিয়া দাপট। পূর্ব বাংলার মানুষদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে গিয়ে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবহেলা ও অপমান করা হলো। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সেই ১৯৪৮ সালেই গণপরিষদ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নাকচ করে দেওয়া হলো। এর প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হলো। সেদিনের সক্রিয় ছাত্রনেতা শেখ মুজিব ও তাঁর সতীর্থদের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে বড় ধরনের জনমত তৈরি হলো। ১১ মার্চ শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হলেন। শুরু হলো পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আত্ম-আবিষ্কারের পালা। তরুণসমাজ পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে

যুক্ত বেশির ভাগ সুবিধাবাদী নেতাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি জেল থেকে বের হয়ে এলেন। তাঁরই আপসহীন নেতৃত্বের প্রভাবে বাংলা ভাষার সপক্ষে ব্যাপক আন্দোলনে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো যুক্ত হতে থাকে। অন্য প্রগতিশীল নেতাদেরও ভূমিকা ছিল ইতিবাচক। দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষের অশনিসংকেতে এ দেশের কৃষক-শ্রমিকদের ক্ষোভ ধীরে ধীরে প্রগতিশীল বাঙালির আত্মমর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলনে কাজে লাগাতে অসুবিধা হয়নি সে সময়ের তরুণ নেতৃত্বের। জিন্নাহ্র মৃত্যুর পর ভাষা আন্দোলন খানিকটা স্তিমিত হলেও ১৯৫০ সালের পর ফের তা দানা বাঁধতে থাকে। ১৯৫২ সালে ঘটে পূর্ণাঙ্গ বিস্ফোরণ। একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে পুরো পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা পাকিস্তান নামের একচোখা রাষ্ট্রকে একেবারেই প্রত্যাখ্যান করে। গ্রামবাংলা থেকে শহর-শিল্পাঞ্চলে পূর্ব বাংলার ভাষা-সংস্কৃতির পক্ষে জনমত তৈরি হতে থাকে। পাশাপাশি কৃষক-জনতার স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবিগুলো (খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনের অংশগ্রহণ ইত্যাদি) দিন দিন পোক্ত হতে থাকে। রাজনীতিকরাও এসব দাবি সমন্বিত করে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সামনে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। ফলে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ব্যাপক জয় বাঙালিকে আশাবাদী করে তোলে। কিন্তু কয়েক বছরের মাথায় পাকিস্তানের সিভিল-মিলিটারি আমলাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সামরিক শাসন জারি করা হয়। মূলত পূর্ব বাংলাকে শোষণের জন্যই এই অগণতান্ত্রিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাময়িক ধাক্কা খেলেও ভাষা আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্ব জেল-জুলুম উপেক্ষা করে পুরো ষাটের দশকে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি মজবুত করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্রের নামে বাঙালির ভরসার প্রতীক শেখ মুজিবকে রাজনৈতিক ও শারীরিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা চালায় পাকিস্তানের কুচক্রী মহল। কিন্তু পূর্ব বাংলার ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-রাজনীতিক ঐক্যবদ্ধ হয়ে শেখ মুজিবকে এই ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত করেন। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা। জেল থেকে বের হয়েই তিনি পূর্ব বাংলার জনগণের প্রাণের দাবি ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলনকে আরো জোরদার করেন। আইয়ুব খান ক্ষমতাচ্যুত হন। ইয়াহিয়া ফের সামরিক শাসন জারি করলেও ১৯৭০ সালে নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। সত্তরের নভেম্বরের সাইক্লোনে লাখ লাখ অসহায় মানুষের মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে পাকিস্তানের জনবিচ্ছিন্ন সামরিক সরকার বরং বঙ্গবন্ধুর হাতকেই শক্তিশালী করে। নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ করে বঙ্গবন্ধু ছুটে যান দক্ষিণ বাংলার দুর্বিপাকে পড়া মানুষের কাছে। জনদরদি এই নেতার পক্ষে ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাই ভোট পড়ে ব্যাপক হারে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তাঁর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের অভিপ্রায় ছিল ভিন্ন। ঢাকায় সাংবিধানিক সভার অধিবেশন ডেকেও একাত্তরের ১ মার্চ তা স্থগিত করে দেওয়া হয়। শুরু হয় প্রতিরোধ ও পরবর্তী পর্যায়ে অসহযোগ আন্দোলন। ও আন্দোলনে ‘পূবর্ বাংলা’র (তত দিনে বাংলাদেশ নামই বেশি ব্যবহূত হতে থাকে) প্রায় সবাই স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার হতে শুরু করেছেন। সবাই তখন রাস্তায়। এ অঞ্চলের সরকার চলছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। এরই একপর্যায়ে ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু করল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। ওই রাতেই তিনি বন্দি হলেন। কিন্তু সদ্যঘোষিত স্বাধীন বাংলাদেশের ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতা একযোগে নেমে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। এই যুদ্ধে তাঁরা অকাতরে প্রাণ দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সিংহভাগই ছিলেন কৃষক সন্তান। তখন তাঁদের স্বপ্ন ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি ও সুষম উন্নয়ন। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতার পেছনে সাধারণ মানুষের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার যে আকাঙ্ক্ষা দানা বেঁধেছিল তা উপেক্ষা করার ক্ষমতা এলিটদের ছিল না। আর তখনকার নেতৃত্বও ছিল মাটিঘেঁষা। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুর দিনগুলোতে খাদ্যসংকট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যাতায়াতের সমস্যা মোকাবেলার জন্য যে প্রচেষ্টা সামান্য দেশি সম্পদের অধিকারী সেদিনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব করেছিলেন, তা আমাদের পরের চলার পথ অনেকটাই বেঁধে দিয়েছিলেন। এসব সংকট আমরা হেলায় বিনষ্ট করিনি। বরং সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আরো বেশি উদ্যমী ও লড়াকু হতে পেরেছি। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পুনর্নির্মাণের যে গণহিতৈষী ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, তার ওপরই গড়ে চলেছি আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ।

দুঃসময়-দুর্বিপাকে কী করে ঘুরে দাঁড়াতে হয় সে শিক্ষা আমরা পথ চলতে চলতে পেয়েছি। এই পথ গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার আদলেই তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাই তার প্রমাণ। ঐতিহাসিক এই প্রেক্ষাপটের কারণেই আজ বাংলাদেশের এলিটরা ইচ্ছা করলেও সাধারণ মানুষের মৌল চাওয়া-পাওয়ার বাইরে যেতে পারবেন না। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার এই পথ আরো প্রশস্ত করে চলেছে এবং তাকে টেকসই করার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। ১৯৯৬ সালে গরিবহিতৈষী উন্নয়নের যে অভিযাত্রা বঙ্গবন্ধুকন্যা শুরু করেন, তা পরবর্তী সময়ে বাধাগ্রস্ত হলেও ২০০৯ সালে ফিরে এসে ফের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ছকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তাঁর সরকার যেভাবে সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য প্রকল্প ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সেসবের সুফল এখন চোখে পড়ছে। এসব পরিকল্পনার ফলে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের এক রোল মডেলে পরিণত হচ্ছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রচেষ্টার পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক আর্থসামাজিক রূপান্তরের যে পথরেখা এসব পরিকল্পনা আমাদের জন্য তৈরি করেছে তাতে ব্যক্তি খাত, সরকারি ও বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। ওপর থেকে আগামীর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আর নিচের দিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি, এনজিওকর্মী ও ব্যক্তি খাত। একই সঙ্গে সরকারের অর্থায়নে খাতভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নতুন ভাবনা ও উদ্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় ধানের বীজ ও কৃষির নতুন ধরন আবিষ্কার সহজতর হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগও বাংলাদেশের উন্নয়নে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় অর্জিত সাফল্যগুলো মোটা দাগে এভাবে চিহ্নিত করা যায় : ১. টেকসই ৬ শতাংশ+ প্রবৃদ্ধি অর্জন। ২. দ্বিগুণেরও বেশি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। ৩. দ্রুত কমে আসা মূল্যস্ফীতি। ৪. বিশ্ব মন্দা সত্ত্বেও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি। ৫. দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ৬. নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন। ৭. গ্রামীণ আয়-রোজগার বৃদ্ধি। ৮. খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন। ৯. বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণের বেশি করা। ১০. রাস্তাঘাট, রেল, বন্দরসহ ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন। ১১. পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন। ১২. শ্রমঘন শিল্পায়ন ও সার্ভিস খাতের প্রবৃদ্ধি। ১৩. প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা (বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিডা, দুদক, এসইসি ইত্যাদি)। ১৪. আমলাতন্ত্রের মাঠোপযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধি। ১৫. জাতীয় ডিজিটাল পোর্টাল চালু করা। ১৬. দেশব্যাপী পাঁচ হাজারেরও বেশি ডিজিটাল কেন্দ্র স্থাপন। ১৭. জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও তহবিলের ব্যবস্থা করা। ১৮. অতিদারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশ থেকে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ১৯. এমডিজির বেশির ভাগ লক্ষ্য পূরণ।

এসব সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চালু করেছে বাংলাদেশ সরকার। এই পরিকল্পনার মূল সুরও ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মতোই। তিনটি মূল লক্ষ্য সর্বশেষ পরিকল্পনায় স্থান পেয়েছে : ১. জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরো বৃদ্ধি (৭-৮ শতাংশ) এবং আরো দ্রুত দারিদ্র্য নিরসন। ২. সব নাগরিকের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বাড়তি সুযোগ সৃষ্টি করা। ৩. দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার, দ্রুত নগরায়ণকে টেকসই ব্যবস্থাপনাধীনে আনা।

একটি বিষয় খেয়াল করা যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য নিরসনের গুরুত্ব একটুও কমেনি। বরং এই পরিকল্পনা দলিল টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোকে আত্মস্থ করে ‘কাউকে ফেলে যাব না’র মূল দর্শনটি এর কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সে জন্য প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় খাতের সামাজিক দায়িত্ববোধকে সমানভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা দলিলগুলোই বলে দিচ্ছে এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে রাষ্ট্র কতটা তৎপর। এই পরিকল্পনার মূূল দর্শন পরিপালনের কথা মাথায় রেখে ফিবছর জাতীয় বাজেট ও মুদ্রানীতি প্রণীত হচ্ছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ওপর যে গুরুত্ব বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়ে চলেছে তাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, কৃষকসহ সৃজনশীল উদ্যোগী মানুষের পক্ষে নানামুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া সহজতর হচ্ছে। অর্থনৈতিক এই গণতন্ত্রায়ন সমাজের নিচের দিকের মানুষগুলোকে এখন অনেকটাই কর্মব্যস্ত রেখেছে। তাদের মনের কথা এখন তারা অনায়াসে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারছে। এর ফলে সামাজিক গতিময়তা অনেকটাই বেড়েছে। আখেরে সমাজের অন্তর্নিহিত বন্ধন আরো শক্তিশালী হতে শুরু করেছে। উন্নয়নের এই গতি ও তাতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ সোনার বাংলায় নিশ্চয় রূপান্তরিত হবে।

তবে এ জন্য আমাদের সবারই খেয়াল রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো শক্তিশালী করা যায় কী করে। আর সে জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা বাঞ্ছনীয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধি করতে চাইলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো আধুনিক ও গুণমানের হতে হবে। বিশেষ করে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেভাবে উগ্রপন্থার অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে আশঙ্কা করা হয় সে দিকটায় তীক্ষ নজরদারি বজায় রাখতে হবে। নিঃসন্দেহে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কোনো বিকল্প আমাদের হাতে নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে রূপান্তরিত হলে সাধারণ মানুষ এদের ওপর আরো আস্থাশীল হবে। স্বচ্ছতা বাড়লে দুর্নীতির সুযোগও কমে যাবে। মনে রাখতে হবে সমাজে ব্যাপক দুর্নীতির প্রসার ঘটলে উন্নয়ন সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মনে হতাশা বাড়বে। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধে আমাদের দ্বিধান্বিত হওয়ার সামান্য সুযোগও নেই। আর এ্র প্রশ্নে দৃঢ়তা দেখাতে পারলে সমাজ অনেকটাই সচল ও দায়বদ্ধ থাকবে। এমন সমাজে নাগরিকদের ব্যক্তিত্ব ঋজু হবে। স্বদেশ নিয়ে আশাবাদ বাড়বে। এলিট ও সাধারণের দূরত্ব কমবে। আমাদের সামাজিক এই বোঝাপড়া দিন দিন আরো মজবুত হোক—এই কামনাই করছি।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর