কৃষিতে সফল পায়রাবন্দের মর্জিনা

কৃষি ও সমাজ উন্নয়নে সফল নারী রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের চুহড় গ্রামের মর্জিনা বেগম। বেগম রোকেয়ার বাড়ির পাশেই তার বাড়ি। রোকেয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন নারীশিক্ষার, আর মর্জিনা স্বপ্ন দেখছেন কৃষিতে স্বনির্ভর বাংলাদেশের। মর্জিনা এ বছর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সহায়তায় ও নিজের অভিজ্ঞতায় উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করে পরিবেশবান্ধব সুপার-৭০২ জাতের ভুট্টা চাষ করে উত্তরাঞ্চলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। শুধু তা-ই নয়, কৃষি কাজ করেই তিনি অভাবকে জয় করেছেন।
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ মনজুরুল হান্নান, রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ শাহ আলম, রংপুরের উপপরিচালক কৃষিবিদ স. ম. আশরাফ আলী, রংপুর বেতারের আঞ্চলিক কৃষি অফিসার মোঃ আবু সায়েম, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ খোরশেদ আলমসহ বহু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মর্জিনার ভুট্টা ক্ষেত পরিদর্শন করে অভিভূত হন। তারা মর্জিনাকে কৃষির উন্নয়নে অধিক পরিশ্রমী নারী কৃষকের খেতব দিয়ে তার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এছাড়া মর্জিনার সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রম দেশ-বিদেশের অনেক বিশেষজ্ঞ সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রশংসা করেছেন। এলকার কৃষকও মর্জিনার চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করে ভালো ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন।
মর্জিনা প্রতি বছরই তার কাজের পরিধি বাড়াচ্ছেন। নারীজাতি যে পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নন, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। এ বছর বিভিন্ন এলাকা থেকে মর্জিনার চাষকৃত ভুট্টা, ধান ও আলু ক্ষেতসহ অন্যান্য সফল উৎপাদনের কার্যক্রম সরেজমিন দেখে অভিজ্ঞতা নিয়ে যাচ্ছেন কৃষক।
মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ খোরশেদ আলম বলেন মর্জিনা কৃষিপ্রযুক্তি গ্রহণ করে চাষাবাদের মাধ্যমে সফল নারী কৃষকে ভূষিত হয়েছেন। পায়রাবন্দ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ ফয়জার রহমান খান জানান, মর্জিনা পায়রাবন্দ এলাকায় কৃষিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।
১৯৮০ সালে মর্জিনার বিয়ে হয়। স্বামী মোঃ হামিদুর রহমান স্বল্প বেতনভুক্ত একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। এ অবস্থায় সংসারের অভাব-অনটন দেখা দেয়। বুদ্ধিমতি নারী মর্জিনা সংসারের খরচের টাকা জমিয়ে ১৯৯৮ সালে চুহড় এলাকায় ৪ একর জমি বন্ধক নিয়ে সমন্বিত ফসল চাষে কৃষি উন্নয়ন কাজ শুরু করেন। সেই সঙ্গে তিনি সমাজ উন্নয়নের নানা কাজসহ বাল্যবিয়ে প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখেন। তার প্রচেষ্টায় আর্থসামাজিক উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে পায়রাবন্দ এলাকার অনেক নারী ও পুরুষ কৃষক। তিনি পরিবেশবান্ধব ফসল এবং শাকসবজি উৎপাদন, সমাজ উন্নয়নসহ বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার করছেন। পায়রাবন্দের চুহড় এলাকায় গিয়ে এসব কাজের প্রমাণও পাওয়া যায়। মর্জিনা নিজের অভিজ্ঞতা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রযুক্তি সহায়তা নিয়ে গেল বছর হেক্টরপ্রতি ৩২ মেট্রিক টন আলু, ৬ দশমিক ৫ মেট্রিক টন বাংলামতি বোরো ধান (ব্রি ধান-৫০), ১০ মেট্রিক টন হাইব্রিড ভুট্টা উৎপাদন করেন। এছাড়া লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শসা উৎপাদনেও এলাকায় চমক সৃষ্টি করেছেন।
১৯৯৭ সালে তিনি এলাকায় ভার্মি কম্পোস্ট খামার স্থাপন করে পরিবেশবান্ধব ফসল উৎপাদনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। মর্জিনা জানান, সব কাজে স্বামী হামিদুর রহমান ও ছেলেরা তাকে সহযোগিতা করছেন। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারাও প্রযুক্তি সরবরাহসহ নানা ভাবে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়ে আসছেন। বর্তমানে পায়রাবন্দ এলাকায় বহু নারী ও পুরুষ তার পরামর্শ নিয়ে কৃষি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।