সোনালী আঁশের সোনালী সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ‘সোনালী আঁশের দেশ’। পাট আমাদের প্রধান অর্থকরী ফসল। বাঙালির জীবন-জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমৃদ্ধি ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে পাট চাষ। অবিভক্ত বাংলায় পাটের বর্ণময়, উজ্জ্বল ও সোনালী অধ্যায় শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে এবং এ অঞ্চলে শিল্প যুগের সূচনা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গে পাটকল স্থাপনের মধ্য দিয়ে। উর্বর গাঙ্গেয় উপত্যকা, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার কারণে বঙ্গীয় অঞ্চল পাট চাষের জন্য বিশ্বে সবচেয়ে উপযোগী জায়গা। পাট ‘সোনালী আঁশের’ মর্যাদা অর্জন করেছিল ১৮৯০-এর দশকে। গত শতাব্দীজুড়ে আন্তর্জাতিক নীতি, যুদ্ধবিগ্রহ, অর্থনৈতিক মন্দা, ‘সিনথেটিক বিপ্লব’সহ বিভিন্ন কারণে পাটের গৌরব ওঠানামা করেছে। ইতিহাসের পথপরিক্রমায় বাংলার পাট আবার নতুন সম্ভাবনার মুখ দেখছে। গ্রিন ইকোনমি, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ন্যাচারাল ফাইবারের ব্যাপক চাহিদা ও সরকারের সাহসী পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের সোনালী আঁশের ‘সোনালী সম্ভাবনা’ দেখা দিয়েছে।

পাট বিশ্বে সবচেয়ে সস্তা, পরিবেশবান্ধব ও বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্রাকৃতিক তন্তু। প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে তুলার পরই পাটের অবস্থান। বৈশ্বিক তন্তুর ৯১ শতাংশ জোগান আসে তুলা ও সিনথেটিক তন্তু থেকে। পাট জোগান দেয় ৬ শতাংশ। প্যারিস সম্মেলনের পর বিশ্বজুড়ে বায়ো-ডিগ্রেডেবল ও পরিবেশবান্ধব পাটের প্যাকেট ও বস্তার চাহিদা বেড়ে গেছে। পাট থেকে উন্নতমানের মিহি সুতা আবিষ্কার পাটের সম্ভাবনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

যুগের পথপরিক্রমায় পাট আবার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, গ্রিন ইকোনমি ও সবুজ পৃথিবীর বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে পাট ও পাটপণ্যের প্রতি আগ্রহ আশাতীতভাবে বেড়ে গেছে। কার্বন নিউট্রাল সবুজ পৃথিবী ও লাগসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য বৈশ্বিক কণ্ঠ একসুরে মিলেছে। ‘সবুজ পণ্যের’ আন্দোলন বৈশ্বিক রূপ লাভ করেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পাটের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পাটের বহুমুখী ব্যবহারের ফলে বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ পাটের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার শুরু করেছে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক পাটের বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে। বিশ্বে মোট কাঁচা পাটের (৩০ লাখ মেট্রিক টন)  ৯৬ শতাংশ উত্পাদিত হয় বাংলাদেশ (১২ লাখ মে. টন) ও ভারতে (১৭ লাখ মে. টন)। কাঁচা পাটের বৈশ্বিক রপ্তানি বাণিজ্যের ৯৬ শতাংশ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। ৬০ শতাংশ পাটপণ্য রপ্তানি হয় বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশ বিশ্বের প্রধান পাট সুতা (ইয়ার্ন) রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে ছয় লাখ মে. টন ইয়ার্ন বিশ্ববাজারে রপ্তানি করেছে। ভারত রপ্তানি করে ৫০ হাজার মে. টন। অভ্যন্তরীণ ও বিশ্ববাজারে পাট সুতার ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।   বিশ্বজুড়ে মোট ৩৮৫টি পাটশিল্পের মধ্যে বাংলাদেশে ২১৯টি।

বৈশ্বিক সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ২০২১ সাল নাগাদ কাঁচা পাট ও পাটপণ্যের চাহিদা ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা পাটপণ্য নিয়ে নতুন নতুন বাজারে প্রবেশ করছে। পাটের নতুন সম্ভাবনা উপলব্ধি করে বাংলাদেশ সরকার কয়েকটি যুগান্তকরী পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করা হয়েছে। সিনথেটিক বস্তা নিষিদ্ধ করে ‘প্যাকেজিং অ্যাক্ট’ পাস করায় পাটের বস্তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। পাটকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করায় পাট চাষি ও রপ্তানিকারকরা উপকৃত হবে। বার্ষিক পাটের বস্তার চাহিদা ১০ কোটি থেকে বেড়ে ৭০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

পাটের জীবন রহস্য  (জেনোম সিকোয়েন্সিং) আবিষ্কার বাংলাদেশে সোনালী আঁশের সম্ভাবনা আরো উজ্জ্বল করেছে। সাড়াজাগানো এই আবিষ্কার আন্তর্জাতিক পাটশিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুসংহত করবে। মাল্টিমিলিয়ন ডলারের পাটশিল্প উজ্জীবিত হবে। জেনোম সিকোয়েন্সিং আবিষ্কারের ফলে কাঙ্ক্ষিত মানের, উচ্চ ফলনশীল জাত আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের মেধাবী বিজ্ঞানীরা। স্বল্প সার প্রয়োগে, স্বল্প জীবনকালবিশিষ্ট, রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণমুক্ত, সব ধরনের মাটিতে উত্পাদন উপযোগী, কাঙ্ক্ষিত ফডার মান, রেটিং কোয়ালিটি, উচ্চমানের আঁশ ও পাটকাঠি এবং উচ্চফলনশীল জাত উন্নয়ন সম্ভব হবে। জেনোম সিকোয়েন্সিংয়ের সুফল কৃষক পাওয়া শুরু করলে পাট সেক্টরে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। সদ্যপ্রয়াত ড. মাকসুদুল আলমের স্বপ্নের ‘স্বপ্নযাত্রা টিম’ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বে ‘পাট বিপ্লব’ ঘটানোর জন্য।

বিশ্বে বর্তমানে ফুড গ্রেড পাটের ব্যাগের চাহিদা যেখানে ৩২ মিলিয়ন, সেখানে প্রধান পাট উত্পাদনকারী দেশ বাংলাদেশ ও ভারত সরবরাহ করতে পারে মাত্র ১২ মিলিয়ন। পাটের শপিং ব্যাগের বৈশ্বিক বার্ষিক চাহিদা ৫০০ বিলিয়ন কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারত রপ্তানি করতে পারছে মাত্র ৪০ মিলিয়ন। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জুট জিও টেক্সটাইলের চাহিদা ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধির আশা করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে পাটপণ্যের ব্যবহার অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাট তন্তু ও পাটপণ্যের উত্কর্ষ সাধনের জন্য নিরলস কাজ করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বেসরকারি উদ্যোক্তা, বিজেএমসি, বিজেএসএসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডার পাটপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের কাজ করছে। বেসরকারি পর্যায়ে দেশে বড় বড় পাটশিল্প স্থাপিত হচ্ছে। বিজেএমসির পাশাপাশি জনতা জুট মিল, আকিজ জুট মিল পাট ইয়ার্ন ও পাটপণ্য উত্পাদন ও বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে। বিনিয়োগকারীরা পাটশিল্পে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসছে। নবীন ও নারী উদ্যোক্তারা এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে নতুন নতুন পাটপণ্য নিয়ে প্রবেশ করছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাঁচা পাট ও পাটপণ্যের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। কাঁচা পাট ও পাটপণ্য আমদানিকারক দেশগুলো মূলত বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় পাট আমদানিকারক দেশগুলো সমস্যায় পড়েছে। তারা বাংলাদেশকে অনুরোধ করছে পাট চাষের আওতায় জমি ও ফলন বৃদ্ধি করে কাঁচা পাট রপ্তানি করার। বাংলাদেশের কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধের ফলে পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বের অনেক দেশের পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে।

কার্বন নিউট্রাল পৃথিবী, গ্রিন ইকোনমি ও ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পাটের ফলন ও মোট উত্পাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে পাটভিত্তিক ক্রপিং প্যাটার্নের আওতায় জমির পরিমাণ বাড়াতে হবে। গত দুই বছর পাটের ভালো দাম পাওয়ায় কৃষক আবার পাট চাষের দিকে ঝুঁকেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৭.২৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয় এবং মোট উত্পাদন ৭৫ বেল (১ বেল=১৮২ কেজি)। দেশের সব জেলায় পাট চাষ করা হয় না। সব জেলায় উত্পাদন উপযোগী, লবণাক্তসহিষ্ণু, জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু, খরাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করতে পারলে ১৫ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ সম্ভব। পাটের ফলন ২.৩২ টন/হেক্টর থেকে বাড়িয়ে ৩.৩০ টন/হেক্টর করতে পারলে বার্ষিক পাটের উত্পাদন বেড়ে দাঁড়াবে ৫০ লাখ টন। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় হতো পাট থেকে। ভবিষ্যতে পাট উত্পাদনে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে।

কার্বন ইস্যুতে পাট অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফসল। এক হেক্টর জমির পাট ১৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে (ধান শোষণ করে পাঁচ টন) এবং বায়ুমণ্ডলে ১১ টন অক্সিজেন মুক্ত করে। এক হেক্টর জমির পাট ১০ টন বায়োমাস মাটিতে যুক্ত করতে পারে, যা মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করে। পাট চাষ থেকে পশুখাদ্য ও সবজি পাওয়া যায়। অর্থকরী ফসল হিসেবে পাটের আর্থিক লাভ অন্যান্য অর্থকরী ফসলের তুলনায় অনেক সম্ভাবনাময়।

খাদ্যনিরাপত্তা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। ধান, সবজি, ফল ও আলুর পাশাপাশি পাট উত্পাদনে বাংলাদেশ গ্লোবাল লিডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাটের রপ্তানি আয় ২.০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। পাটের সোনালী সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত ও আধুনিক ডিজাইনের পাটপণ্য উদ্ভাবন ও রপ্তানি করতে হবে। ‘জুট ডিপ্লোম্যাসি’ শক্তিশালী করতে হবে। সঠিক নীতি, যুগোপযোগী গবেষণা, উদ্ভাবন,  গ্লোবাল পার্টনারশিপ, বহুমাত্রিক কূটনীতি ও সঠিক সম্প্রসারণ নীতির ফলে সোনালী আঁশের সম্ভাবনা পুনরুজ্জীবিত হবে এবং  বাংলার পাট চাষি হবে ‘গোল্ডেন হিরো’—এই প্রত্যাশা সবার