নীড় ঊপসম্পাদকীয় বাংলাদেশের সামরিক শক্তি কেন দরকার

বাংলাদেশের সামরিক শক্তি কেন দরকার

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাঁকজমক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ঈশা খাঁ নৌঘাঁটিতে ‘নবযাত্রা’ ও ‘জয়যাত্রা’ নামক সাব মেরিন দুইটির কমিশনিং অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছেন ১২ মার্চ। ভারতের দেশরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পারিকর সাবমেরিন বাংলাদেশে পৌঁছার পর পরই ভারতের তিন বাহিনী উপ-প্রধানদের নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। দীর্ঘ সময়ব্যাপী মিস্টার মনোহর বাংলাদেশের বাহিনী প্রধানদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেছেন। বৈদেশিক সম্পর্ক কখনো সরল রেখায় চলে না। সম্ভবত চীন থেকে সাবমেরিন কেনায় ভারত অসন্তুষ্ট হয়েছে। হয়তবা তারই প্রতিক্রিয়া জানাতে এসেছিলেন মনোহর পারিকর।
ভারতের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত তার আবার সাবমেরিনের প্রয়োজন কি? বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তখন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রয়োজন কি- এমন কথাবার্তা বলে তার উদ্যোগকে হতাশ করতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সে কথায় কর্ণপাত করেননি। একটা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রথম প্রতীক হলো তার সামরিক বাহিনী। সামরিক বাহিনী ছাড়া একটা স্বাধীন দেশের পূর্ণাঙ্গতা প্রকাশ পায় কিভাবে? সেই উপলব্ধি বঙ্গবন্ধুরও ছিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও রয়েছে।
ভারত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অকাতরে সাহায্য করেছে। আমরা বাংলাদেশের মানুষ ভারতের কাছে এ ব্যাপারে কৃতজ্ঞ। ভারতের সৈন্যবাহিনীর যে সমস্ত সৈনিক মুক্তিযুদ্ধের সময় আত্মত্যাগ করেছিলেন তাদেরকে ৫ লাখ টাকা করে প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছে। অবশ্য ওয়ারিশ খুঁজতে গিয়ে সমস্যা তৈরি হবে বলে ভারত এটি না করতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে বলে খবরে দেখলাম। ত্যাগের বিনিময় অর্থ দিয়েও হয় না। ভারতের এই ত্যাগ বাংলাদেশকে আজীবন মনে রাখতে হবে। আবার এটাও সত্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত যে সমর্থন দিয়েছে সেখানে ভারতের প্রয়োজনটাও কম ছিল না।
১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ১৯ মার্চ বাংলাদেশ আর ভারতের মাঝে ২৫ বছর মেয়াদি ‘শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতার’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ চুক্তি সম্পাদনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো বলতে শুরু করে যে, বাংলাদেশ ভূটানের মতো ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’ পত্রিকা লেখে যে, ‘বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা পঙ্গু করে দিতে রুশ ভারতীয় চক্রান্ত’। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটা কথা বহুল প্রচলিত হয়েছিল যে, প্রবাসী তাজউদ্দীন সরকার ভারতের সঙ্গে গোপনে বহু ‘গোলামির চুক্তি’ স্বাক্ষর করে এসেছে। ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে এ সমস্ত চুক্তি বাস্তবায়িত করবে আর ২৫ বছরের চুক্তি অনুরূপ একটা চুক্তি।
জাসদের গণবাহিনী মোকাবিলা করার জন্য রক্ষীবাহিনীতে তেজস্বী লোকবল নিয়োগ করে খুবই শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গঠন করা হয়েছিল। রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে প্রচার করা হলো যে, রক্ষীবাহিনীর পঞ্চাশ শতাংশ লোক ভারত সরবরাহ করেছে। পাকিস্তানপন্থি, পিকিংপন্থি জাসদ, সিআইএ-এর অনুপ্রেরণায় তখন বঙ্গবন্ধুর হত্যার পটভূমিকা তৈরি করে ফেলেছিল। অবশেষে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন।
এরপর দীর্ঘ ২৭ বছর পাকিস্তানপন্থি সরকার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত ১২শ’ মাইল মধ্যখানে ভারত ছিল, না হয় তারা পুনরায় বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করে ফেলত। দীর্ঘ ২১ বছর রাজপথে থেকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। সুতরাং আওয়ামী লীগ এবার পূর্বের কোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে পারে না। করলে আওয়ামী লীগের ধ্বংস কেউ ঠেকাতে পারবে না।
গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে ইন্দোনেশিয়ায় নাহাদাতুল ওলামা পার্টি কমুনিস্ট নিধনের নামে পাঁচ লাখ লোক হত্যা করেছিল। যদি এবার আওয়ামী লীগ কোনো কারণে সামান্য ভুল করে তবে মৌলবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নিশানা রাখতে চাইবে না। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর এসব ডানপন্থি এমনিভাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বসে আছে। ইন্দিরা-মুজিবের মাঝে সম্পাদিত ২৫ বছরের চুক্তি বাংলাদেশের এক ছটাক উপকার হয়নি আবার এ চুক্তির বলে ভারত বাংলাদেশ গিলেও খায়নি। তবে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ চুক্তিটার প্রয়োজন কি ছিল? এ চুক্তি নিয়ে অপপ্রচারের তরঙ্গ বয়ে গেল সারাদেশে আর শেখ মুজিব নিধনের পটভূমিকা তৈরি হলো।
আগামী ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় অনুরূপ কোনো চুক্তির অবতারণা হউক তা দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে না। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কোনো সামরিক চুক্তি সম্পাদন করবেন না আর ভারতও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সামরিক চুক্তি সম্পাদনে চাপ প্রয়োগ করবে না। জোর করে বন্ধুত্ব হয় না। বন্ধুত্ব সৃষ্টির জন্য উভয় পক্ষকে অনুকূল আবহ সৃষ্টিতে মনোযোগী হতে হয়। বিশ্বের বহু বিষয়ে আমেরিকা শক্তির জোর দেখিয়ে বহু কিছু করেছে কিন্তু কোনো কিছুই স্থায়ী হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে আমেরিকা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছে।
সিকিম ভারতের হাতে তার দেশরক্ষা ও বিদেশ সংক্রান্ত বিষয় প্রদান করে নিরাপদে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু থাকতে পারেনি। ভারত কৌশলে সিকিম গ্রাস করেছে। তাতে ভারতের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব বেড়েছে তা নয় বরঞ্চ প্রতিবেশীদের কাছে ভারত আস্থা হারিয়েছে। নেপালের সঙ্গেও ভারতের আচরণ এ যাবৎ ভালো ছিলো না। শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ ভারতের নিকট প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে ভারতের আস্থার সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। কোনো কারণে তারা ভারতের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হচ্ছে বলে মনে করলেই চীন এসে উপস্থিত হবে। পাকিস্তানের গোয়াদরে চীন নৌঘাঁটি স্থাপন করছে। শ্রীলঙ্কায়ও নাকি একটা নৌঘাঁটি স্থাপন করছে চীন। বাংলাদেশ এ যাবৎ কাউকেও কোনো ঘাঁটি স্থাপন করতে দেয়নি। বাংলাদেশ নিজেই নিজেকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে ভারতের আপত্তি করা হবে বোকামি।
বাংলাদেশ তো ভূটান নয় যে তার নিরাপত্তার গ্যারান্টি ভারতের হাতে তুলে দিয়ে মনের সুখে নিদ্রা যাপন করবে। বাংলাদেশ সব প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চায়। এ জন্য ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, না হয় মিয়ানমার রোহিঙ্গা নিয়ে যা করছে তা তো সীমা অতিক্রম ভিন্ন অন্য কিছু নয়। যে রোহিঙ্গা এক সময় মিয়ানমারের পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করেছে এখন যদি তাদেরকে বাংলাদেশি বলে বাংলাদেশে ঠেলে দেয় তবে তা তো সহ্য করার কথা নয়। বাংলাদেশ ১৫ লাখ রোহিঙ্গার দায়িত্ব নেবে কেন? বুঝতে হবে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত দেশ আবার রোহিঙ্গারাও মুসলমান। সুতরাং মিয়ানমারের সরকার নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চালালে বাংলাদেশ সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়ে বসে থাকতে পারে না।
জনসাধারণের মাঝে এর প্রতিক্রিয়া রয়েছে। মালেশিয়া যে এবার মিয়ানমারকে আক্রমণ করার কথা বলেছে তা তার সার্বিক জনমতের প্রতিফলন। বাংলাদেশ সরকারকেও জনমত তোয়াক্কা করে চলতে হয়। এবার বাংলাদেশ অভিমুখী রোহিঙ্গা ভর্তি নৌকা ফিরিয়ে দেয়াকেও বাংলাদেশের মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। বাংলাদেশ সরকারেরও উপায় ছিল না। রোহিঙ্গা আগমনকে যদি নির্বিঘœ করা হতো তবে পঙ্গপালের মতো ১৫ লাখ রোহিঙ্গাই বাংলাদেশে প্রবেশ করত। কারণ রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।
পাকিস্তানের সময় মিয়ানমার রোহিঙ্গা নিয়ে এত কিছু করেনি। কারণ তারা পাকিস্তানকে ভয় করত। বাংলাদেশের সামরিক প্রস্তুতিকে দুর্বল মনে করে তাই তারা রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে উদ্যোগী হয়েছে। এখন মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করছে। গত নির্বাচনে তাদেরকে ভোটার পর্যন্ত করা হয়নি। ১৫ লাখ মানুষ রাষ্ট্র ছাড়া থাকবে কোথায়! রোহিঙ্গা নিয়ে হয়তো মায়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধও হতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের সর্বাঙ্গীণ সামরিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। বাংলাদেশকে শক্তিশালী বিমান বাহিনীও গড়ে তুলতে হবে। পদাতিক বাহিনীর সংখ্যা প্রয়োজনে আরো বাড়তে হবে। সমরাস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে। কারো করুণা ভিক্ষা করে দেশ রক্ষা করা যায় না।
এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করতে হয়। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক ব্লকের রাষ্ট্রগুলো সর্ববিষয়ে ঠিকাদারি ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার হাতে। ঐ দেশগুলোর সাধারণ মানুষ এ ঠিকাদারি ব্যবস্থা মানতে রাজি ছিল না। পূর্বে তো এসব দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু ছিল। পোল্যান্ড হাঙ্গেরিতে অসন্তোষ ছিল সবচেয়ে বেশি। হাঙ্গেরির মানুষের বিক্ষোভের কারণে প্রধানমন্ত্রী রাকোসি দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। রাকোসির পর রাশিয়ায় ইঙ্গিতে ইমরে নাজকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়েছিল। তার সময়ে যখন বিক্ষোভ ভয়াবহরূপ ধারণ করে তখন ১৯৫৬ সালে প্রতি বিপ্লব আখ্যায়িত করে লাল ফৌজ হাঙ্গেরির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। কিন্তু হাঙ্গেরির নিরস্ত্র জনগণ লালফৌজকে প্রতিরোধ করে। ১,২৫,০০০ মানুষ প্রতিরোধে প্রাণ হারায়। ৭০০০ লাল ফৌজকে জীবন দিতে হয়।
শেষ পর্যন্ত পূর্ব ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রকে আর তাঁবেদার করে রাখা সোভিয়েতের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সোভিয়েতের ঠিকাদারির অবসান হয়। এত সব কথা বললাম এ জন্য যে, ভারত যেন তার প্রতিবেশীদেরকে সমমর্যাদার রাষ্ট্র বলে বিবেচনা করে এবং তাঁবেদার বানানোর খেয়ালও যেন পরিত্যাগ করে। সমমর্যাদা নিয়ে চলতে পারলে এ উপ-মহাদেশের রাষ্ট্রগুলো অন্য বৃহত্তর শক্তির খেলা থেকে বাঁচতে পারবে। বাংলাদেশ কারো সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেনি। সামরিক চুক্তি না করে চলার আগ্রহই বেশি। সুতরাং ভারত যেন বাংলাদেশকে চুক্তির বিষয়ে জোরাজুরি করা থেকে বিরত থাকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সাবমেরিন কমিশনিং অনুষ্ঠানে তো বলেই দিয়েছেন- কাউকে আক্রমণের জন্য নয়, আত্মরক্ষার জন্য বাংলাদেশ সাবমেরিন কিনেছে।