উত্তরাঞ্চলে সারাবছর দেশী-বিদেশী সবজি আবাদ হচ্ছে

উত্তরবঙ্গে সবজি আবাদের অবারিত ফসলের মাঠ খাদ্যাভ্যাস ও জীবনমানের সঙ্গে অর্থনীতির নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। একই জমিতে ধান পাট গমের সঙ্গে আইলের ওপর সবজি চাষ হচ্ছে। পুকুর-জলাশয়ের চার ধারে, কৃষক বাড়ির উঠানে চাষ হচ্ছে সবজির। নিকট অতীতের মৌসুমভিত্তিক সবজি উৎপাদন পেরিয়ে প্রায় সব সবজি ফলছে সারা বছরই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিথি সবজি। এই বীজ আসছে বিদেশ থেকে। মানুষ এখন দেশী সবজির সঙ্গে বিদেশী সবজিও পাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় নগরীর অভিজাত হোটেল এবং চাইনিজ রেস্টুরেন্ট দেশী ও চীনা খাবারের সঙ্গে দেশে উৎপাদিত বিদেশী সবজির খাবারও পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে আমিষ জাতীয় খাবার মাছ মাংসের রান্না কমে গিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষ সবজিভুক (ভেজিটারিয়ান) হচ্ছে। কোলেস্টরেল (মাংস, চর্বি জাতীয় খাবার) মুক্ত খাদ্যাভ্যাসে কারণে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। সবজি বিক্রি করে কৃষক লাভবান হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে।

উত্তর জনপদে প্রধান আবাদ ধান। উদ্বৃত্ত ধান বিদেশে রফতানিও হচ্ছে। সম্পূরক আবাদের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান নিয়েছে সকল ধরনের সবজি। একটা সময় যে কচু ঘেঁচু দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতীকী খাবার ছিল তা এখন বাণিজ্যিক আবাদে পরিণত হয়ে বিদেশে রফতানি হচ্ছে। মিষ্টি কুমড়া, কপি, শসা চিচিঙ্গা করলা লাউ কুমড়া, ঢেঁড়স, পটোল আলু সব ধরনের শাক কাঁচা কলার হাট এখন বসছে মহাসড়কের ধারে ধারে। সবজি আবাদের প্রধান অঞ্চল বগুড়ার মহাস্থানগড় থেকে মহাসড়কের ধার দিয়ে চ-িহারা হয়ে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে বসে সবজির হাট। দেদার বিক্রি হচ্ছে হাইব্রিড মিষ্টি কুমড়া।

প্রতিদিন পূর্বাঞ্চল থেকে ট্রাকের পর ট্রাক আসছে উত্তরাঞ্চলে। ফিরছে সবজি নিয়ে। এর কিছু অংশ যাচ্ছে ঢাকা চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে। কিছু অংশ উড়োজাহাজের কার্গো ফ্রেইটে যাচ্ছে বিদেশ বিভূঁইয়ে বাজরে। সবজি আবাদের উর্বর ভূমিতে পরিণত হওয়া উত্তরাঞ্চলের মানুষ দিনে দিনে ভেজিটারিয়ান (সবজিভূক) হয়ে যাচ্ছে। এত সবজি উৎপাদিত হওয়ায় মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে শক্ত খাবার মাছ মাংস কমতে শুরু করেছে। হালে মুরগি খাসি গরুর মাংসের দাম বেড়েছে। মানুষ মিতব্যয়ী হয়ে সবজি দিয়ে নিত্য নতুন রেসিপি তৈরি করেছে। এই রেসিপি পৌঁছে যাচ্ছে গৃহিণীদের কাছে। তৈরি হচ্ছে সবজির বিচিত্র সব সুস্বাদু খাবার। ক’জন প্রবীণ মন্তব্য করলেন এ অবস্থা চলতে থাকলে এ অঞ্চলের মানুষের রোগ-ব্যাধি অনেকটা কমে গিয়ে গড় আয়ু বাড়বে। উল্লেখ্য, অধিক শাক সবজি ও এক কেজি ওজনের নিচে মাছ ‘এ্যান্টি এজিং’ (শারীরিক গঠনে বয়স কম মনে হয়ে আয়ু বেড়ে যাওয়া) খাবার হিসাবে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন। উত্তরের মানুষ ভেজিটারিয়ান হয়ে এ্যান্টি এজিংয়ের দিকেই যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের জরিপ অনুযায়ী গত দশ বছরে উত্তর জনপদে সবজি আবাদ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে অনেক সবজির হাইব্রিড জাত নেমেছে। মূলা গাঁজর টমেটো শিম বরবটি করলা লাউ কুমড়া চিচিঙ্গা ঝিঙ্গা ইত্যাদি বলতে গেলে সারা বছরই ফলে। মৌসুমভিত্তিক আলু আবাদও আর মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর মধ্যে বিদেশী সবজির আবাদ শুরু হয়েছে। এ্যাসপ্যারাগাস, ক্যাপসিক্যাম লেটুস পাতা, চাইনিজ পাতা, বিট রুট, ব্রুকলি, রেব ক্যাবেজ, চাইনিজ ক্যাবেজ, স্কোয়াশ, ফ্রেঞ্চ বিম, সুইট কর্ন, বেবি কর্ন, লেমন গ্রাস, শিমলা মরিচ, স্লারি পাতা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বগুড়ার শিবগঞ্জ, গাবতলী, শাজাহানপুর উপজেলার কয়েকটি গ্রামে বিদেশী সবজির আবাদ দিনে দিনে বাড়ছে। পার্শ্ববর্তী জেলা জয়পুরহাট নওগাঁ নাটোর পাবনা অঞ্চলে বিদেশী সবজি আবাদ শুরু হয়েছে। বর্তমানে কোন জমি আর এক ফসলি নেই। ফসলের বহুমুখীকরণ আওতায় দেশী-বিদেশী সবজিও যোগ হয়েছে। এসব সবজি ঢাকার হোটেল সোনারগাঁ, শেরাটন, রেডিসন, ওয়েস্টিনের মতো তারকাখঁচিত হোটেলগুলোতে যাচ্ছে।

শিবগঞ্জের টেপাগাড়ি গ্রামের সবজি চাষী মিজানুর রহমান প্রায় ১৬ বছর আগে ঢাকায় খামারবাড়িতে সবজি প্রদশর্নীতে গিয়ে ক্যাবেজ লেটুস পাতাসহ কয়েক জাতের সবজি চারা নিয়ে বগুড়া অঞ্চলের আবাদ শুরু করেন। তারপর গত কয়েক বছরে একের দেখাদেখি আরেকজন এভাবে বিদেশী সবজি আবাদ বাড়তে থাকে। দেশী সবজির আবাদ সম্প্রসারিত হতে থাকে।

বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের ধারে মহাস্থানগড় পার হয়ে চ-িহারা থেকে উত্তর দিকে অনেকটা জায়গাজুড়ে বসে কাঁচা কলার হাট। প্রতিদিন সকালে এই হাট শুরু হয়ে দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। ট্রাকের পর ট্রাক কাঁচা কলা নিয়ে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। উত্তরাঞ্চলের প্রতিটি জেলার উপজেলা ও মাঠ পর্যায়ে সবজি কেনার ট্রাক প্রবেশ করছে। পূর্বাঞ্চলের পাইকারি ক্রেতারা অনেক সময় কৃষকদের আগাম অর্থ দিয়ে সবজি আবাদ করিয়ে নিচ্ছে। যারা আগাম অর্থ পাচ্ছে বিপণন নিয়ে তাদের ভাবনা থাকছে না। তবে যারা পূর্বাঞ্চলের পাইকারি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছতে পারছে না তাদের সবজি বেচতে হচ্ছে খোলাবাজরে। বাজারে চাহিদার তুলনায় সবজি বেশি উঠলে কখনও দাম নেমে যায়। তবে এই অবস্থা বেশি সময় থাকেও না। সবজি রফতানিকারকরা মাঠে নেমে বাকি সবজি কিনে নিয়ে যায়। অন্যদিকে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে সবজি কিনে বিশেষায়িত হিমাগারে রেখে ফুড প্রসেসিং করে বিক্রি করছে। এজন্য তাদের (আরডিএ) আলাদা মার্কেট আছে। এভাবে কৃষির সবজি আবাদে বদলে যাওয়া পটভূমিতে উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বদলে যাওয়া দৃশ্যপটে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে। নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়ে মধ্য আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে প্রবৃদ্ধি। লোকজন এখন আর অভাবের জন্য কচু ঘেঁচু খায় না। পুষ্টি সমৃদ্ধ সবজি হিসাবে খায়। এই কচু ঘেঁচু এখন রাজধানী ঢাকাসহ মহানগরীগুলোর পাঁচতারকা খঁচিত (ফাইভ স্টার) হোটেলের ভিটামিন সমৃদ্ধ উন্নত খাবার। যা বিক্রি হয় ডলারে। একাধিক সূত্র জানায় উত্তরাঞ্চলের সবজি এখন আমেরিকা ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে জনপ্রিয় খাবার। ওসব দেশে বাঙালী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বসবাসকারীরা নিজেদের চেনা খাবার পাচ্ছে। বিদেশীরা আকৃষ্ট হচ্ছে। কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা বললেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষ খাদ্য নিরাপাত্তা নিশ্চিত করতে নিজেদের গরজেই ধান পাট গম ভুট্টার পাশাপাশি সবজি আবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। গ্রাম গঞ্জ ও কিষান বাড়ি আঙিনা ও ফেলে রাখা জমি এখন আর পড়ে থাকে না। কোন না কোন সবজি আবাদ হচ্ছেই।