বোরোয় এবারও বাম্পার

চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতেই কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ধরায় নেমে আসে বৃষ্টি। ফলে কয়েকদিন আগেও যেসব মাঠে অল্প স্বল্প পানি ছিল সেসব জমিতে এখন ভরপুর পানি। ধীরে ধীরে সবুজ হওয়া বোরো ক্ষেত এখন সবুজে একাকারÑ ঠিক যেন সবুজের সমারোহ। কোথাও ধানের গোছাগুলো মোটা হতে হতে অনেকটা কালচে সবুজ। এদিকে সারা দেশেই বোরোর রোপণ কার্যক্রম প্রায় শেষ। কৃষক এখন ধানের ক্ষেত পরিচর্চায় মহাব্যস্ত। তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও এখন পর্যন্ত রোপণ হয়েছে ৪৭ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এক্ষেত্রে আবাদে অগ্রগতির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। এদিকে চলতি মৌসুমে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিক টন। একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষির সব উপকরণ সহজলভ্য হওয়ায় চাষাবাদ এগিয়ে চলছে কোনপ্রকার বাধা বিঘœ ছাড়াই। অথচ কয়েক বছর পূর্বেও মৌসুমটিতে সেচ ব্যবস্থাই ছিল প্রধান অন্তরায়। বর্তমানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহের ফলে বোরো ক্ষেতে পানির প্রয়োজনে হাহাকার নেই কৃষকের। আর এবারের মৌসুমটি সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম, ফাগুনেই শুরু হয় বর্ষণ। এমন পরিস্থিতিতে অনুকূল আবহাওয়ায় পুরোদমে এগিয়ে চলছে বোরো ধানের আবাদ কার্যক্রম। কৃষি সংশ্লিষ্টরা চলতি মৌসুমেও বাম্পার ফলনের আশা করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোঃ মনজুরুল হান্নান জনকণ্ঠকে বলেন, সারা দেশে এখন পর্যন্ত বোরো আবাদের অগ্রগতির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। কৃষির সমস্ত উপকরণ সহজলভ্য হওয়ায় কোন প্রকার বাধা বিঘœ ছাড়াই এগিয়ে চলছে বোরো ধানের চাষাবাদ। চলতি বছরও বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। বছরটিতেও মৌসুম শেষে দেশের কৃষি বয়ে আনতে পারে ইতিবাচক ফল। অর্থাৎ বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সারাদেশে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত রোপণ হয়েছে ৪৭ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এক্ষেত্রে অগ্রগতির হার ৯৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। এদিকে, বছরটিতে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও আবাদ হয়েছে ৭ লাখ ১১ হাজার হেক্টর জমিতে। এক্ষেত্রে অগ্রগতির হার ৮৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। উফশী বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৩৯ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর হলেও রোপণ হয়েছে ৩৯ দশমিক ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে। এক্ষেত্রে অগ্রগতির হার ৯৯ দশমিক ১৫ শতাংশ, আর স্থানীয় জাতের বোরো আবাদে অগ্রগতি ৯৭ দশমিক ৪১ শতাংশ।

জানা গেছে, বছরটিতে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ১ কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর ১ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৮৯ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ বছরও দেশটিতে ১ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হবে।

দেশের কয়েকটি অঞ্চলের কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ অঞ্চলে বোরোর রোপণ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এখন এগিয়ে চলছে পরিচর্যার কাজ। মাঠে চৈত্রমাসের মাঝামাঝি সময়ে দেখা মিলতে পারে ধানের শীষ। কৃষকরা বলছেন, মাঠে প্রচুর পানি রয়েছে। পোক্ত হচ্ছে ধানের গোছা। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার হরশী গ্রামের কৃষক হিমেল জনকণ্ঠকে বলেন, কিছু কিছু জমিতে বোরোর রোপণ চলছে। যেসব জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল; সেসব জমিতে শেষ সময়ের মতো চলছে রোপণ কাজ। এই কৃষক আরও জানান, জেলাটিতে বিদ্যুত থাকায় ঠিক সময়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে। কৃষির কোন উপকরণ প্রাপ্তি নিয়েও বেগ পোহাতে হচ্ছে না তাদের। একই ধরনের কথা জানান নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার চন্দপুর গ্রামের কৃষক মোঃ শহীদুল্লাহ। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ‘এলাকায় শেষ হয়েছে বোরোর রোপণ। এখন বড় হচ্ছে ধানের গোছা। আশা করা যাচ্ছে চৈত্রমাসের মাঝামাঝি ধান বের হতে শুরু করবে।’ তিনি বলেন, ‘পানি নিয়ে কোন সমস্যা নেই। কয়েকদিন হয়ে গেল বৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি ধানী ক্ষেতেই পানি রয়েছে। অন্যান্য উপকরণ প্রাপ্তি নিয়েও কোন সমস্যা নেই। ফলে এখন পর্যন্ত ফলনকাজ ইতিবাচক।’

এদিকে দেশের কয়েকটি জেলায় বোরো আবাদের পরিমাণ কমছে। হাওর প্রধান কিশোরগঞ্জ জেলায় কমছে বোরোর আবাদ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য থেকে জানা গেছে, জেলাটিতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৬ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হলেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আবাদ হয় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জেলাটিতে বোরোর আবাদ কমে প্রায় ১ হাজার ৪১০ হেক্টর। এক তথ্য থেকে জানা যায়, চলতি মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রাও পূর্বের বছরের সমান। এই জেলার কৃষি সম্প্রসারণের আরেক তথ্যে বলা হচ্ছে, জেলাটিতে শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ হারে কমছে বোরোর আবাদ। তবে জনকণ্ঠের এক প্রশ্নের জবাবে কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৬০ হেক্টর। আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে। তার তথ্যমতে বছরটিতে পূর্বের বছরের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে।

রাজশাহী থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার জানান, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় কমছে বোরা ধানের চাষাবাদ। বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা গম, আলু, ভুট্টা ও সবজিসহ বিকল্প চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে সেচ সঙ্কট। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১২ সালে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় বোরোর আবাদ হয় ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৭৪১ হেক্টর জমিতে। পরের বছর ২০১৩ সালে বিভাগটিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ লাখ ৫২ হাজার ১২৮ হেক্টর জমিতে। এর পরের কয়েকটি বছর বিচ্ছিন্নভাবে বোরো আবাদ বাড়লে সার্বিকভাবে রাজশাহীতে কমেছে বোরো আবাদের পরিমাণ। বর্তমানে জেলাটিতে বোরো চাষ হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো অবাদের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর!

জানা গেছে, অঞ্চলটিতে বোরো আবাদের পরিমাণ কমে যাওয়ার মূল কারণ সেচব্যবস্থা। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন করা যাচ্ছে না। সঙ্কটময় মুহূর্তে ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহারও বাড়ছে না তেমনভাবে। তথ্যমতে, রাজশাহী অঞ্চলের সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নেও তেমন কোন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। থমকে আছে পুরনো একটি প্রকল্পও। এছাড়া অঞ্চলটিতে ধানী জমিতে খনন করা হচ্ছে পুকুর। অধিক লাভের আশায় ওইসব জমিতে মাছ চাষ হওয়ায় সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কৃষক।

তবে কয়েকটি অঞ্চলে বোরো আবাদে বছর ভিত্তিতে তারতম্য দেখা গেলেও জাতীয়ভাবে মোট উৎপাদনে এর কোন প্রভাব পড়ছে না। কৃষি সম্প্রসারণের তথ্যমতে প্রতিবছরই সারাদেশে বাড়ছে বোরো আবাদে জমির পরিমাণ। একই সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদনও।

সামগ্রিক প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন ইউংয়ের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবদুহু জনকণ্ঠকে বলেন, ১৫ মার্চের মধ্যে সারাদেশে বোরো ধানের রোপণ কার্যক্রম শেষ হবে। এখন পর্যন্ত অগ্রগতির হার ৯৭ শতাংশ হলেও শেষ পর্যন্ত তা শতভাগ অতিক্রম করেও বেশি হবে। অর্থাৎ এ বছরও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণ জমিতে বোরোর আবাদ হবে বলে আমরা আশা করছি।