কৃষিতে নারীর অবদান ও স্বীকৃতি

২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষি খাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তির ৫০ লাখই নারীশ্রমিক। কৃষিতে যুগ যুগ ধরে অব্যাহত অবদান রাখলেও রাষ্ট্রে এখনো নারীর স্বীকৃতি সেভাবে মেলেনি। বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, সম্প্রসারণকর্মী, গবেষক ও নারী নেত্রীরা মনে করছেন দেশের কৃষি ও কিষাণ-কিষাণীর সার্বিক উন্নতির স্বার্থে সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচি জরুরিভিত্তিতে হাতে নিতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারকে গ্রামীণ নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও কৃষি তথ্য পৌঁছে দেয়ার বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
কৃষিবিদ ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম
কৃষি খাতের ২১টি কাজের ধাপের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে ১৭টি ধাপে ছবি : ইন্টারনেটবিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। কথায় আছে নারীর কোমল হাতের পরশে অতনু বীজ সর্বপ্রথম মাটির গভীরে প্রোথিত হয়েছিল। পরে তা অঙ্কুরিত হয়ে উজ্জীবিত হয়ে, শাখা-প্রশাখা ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, সেবা, ওষুধ পুষ্টি বিনোদনের সহায়ক হয়েছিল। কৃষি এবং নারী ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাই কবিতায় লিখেছেন …এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল, নারী দিল তারে রূপ-রস-মধু গন্ধ সুনির্মল…।
আমাদের দেশে ৯২ ভাগ পরিবার পুরুষশাসিত আর মাত্র ৮ ভাগ মহিলাশাসিত। মোট মহিলাদের মধ্যে ৭১.৫ ভাগ কৃষি কাজে নিয়োজিত আর সে তুলনায় ৬০.৩ ভাগ পুরুষ কৃষি কাজে নিয়োজিত। মোট কৃষিশ্রমে ৪৫.৬ ভাগ বিনামূল্যে মহিলারা শ্রম দেন আর বাকি ৫৪.৪ ভাগ অংশ শ্রম টাকার বিনিময়ে কেনা হয়। জরিপ বলে এ দেশে ৮৫ ভাগ নারীর উপার্জনের স্বাধীনতা নেই। মাত্র ১৫ ভাগ নারী নিজের ইচ্ছায় উপার্জনের স্বাধীনতা পান। আমাদের দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থানটি সার্বিকভাবে বিবেচনায় আনলে দেখা যাবে নারী কত অসহায় কত বঞ্চিত।
দেশে মোট শ্রমশক্তির মধ্যে ৬৮ শতাংশই কৃষি, বনায়ন ও মৎস্য খাতে জড়িত। জরিপে জানা যায়, কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে কৃষিকাজে সবচেয়ে বেশি নারী নিয়োজিত। ফসলের প্রাক-বপন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ফসল উত্তোলন, বীজ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এমনকি বিপণন পর্যন্ত অনেক কাজ নারী এককভাবেই করেন। এ ছাড়া বাড়ির বাইরে মাঠে ফসল, সবজি চাষ, মসলা উৎপাদন, শুঁটকি ও লবণাক্ত মাছ প্রক্রিয়াকরণ, মাছ ধরার জাল তৈরি ও মেরামত, পোনা উৎপাদন, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালনের কাজও নারীরা করেন আপন মহিমায়। বসতবাড়িতে সামাজিক বনায়নের কাজও হয় নারীর হাত দিয়ে। বলা চলে কৃষি ও এর উপ-খাতের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নারী।
২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষি খাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তির ৫০ লাখই নারীশ্রমিক। কৃষিতে যুগ যুগ ধরে অব্যাহত অবদান রাখলেও রাষ্ট্রে এখনো নারীর স্বীকৃতি সেভাবে মেলেনি। বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নকর্মী, সম্প্রসারণকর্মী, গবেষক ও নারী নেত্রীরা মনে করছেন দেশের কৃষি ও কিষাণ-কিষাণীর সার্বিক উন্নতির স্বার্থে সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচি জরুরিভিত্তিতে হাতে নিতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারকে গ্রামীণ নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও কৃষি তথ্য পৌঁছে দেয়ার বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
কৃষি খাতের ২১টি কাজের ধাপের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ ১৭টি ধাপে অথচ কৃষি কাজে সেভাবে নারীর স্বীকৃতি, মর্যাদা, সম্মান নেই। একজন গ্রামীণ নারী প্রতিদিন তার ঘর ঘোছানো, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জ্বালানি সংগ্রহ সব মিলিয়ে অন্তত ১৫ থেকে ১৭ কিলোমিটার হাঁটাহাঁটি করেন। নারী কৃষি শ্রমিকদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান, একই ধরনের কাজে পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করা, বেশি কাজে বেশি সম্মান স্বীকৃতি, সরকারি কৃষি কর্মকা-ে নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া, কৃষিকাজে নারী শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, প্রান্তিক সুবিধাদি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নারী কৃষি শ্রমিক তথা কৃষাণীদের অগ্রাধিকার দেয়াসহ আরও বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ বাস্তবায়ন করা একান্ত প্রয়োজন।
জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৮১ সালে ঘোষিত নারীর প্রতি বিরাজমান সব রকম বৈষম্য বিলোপের দলিল যা সংক্ষেপে সিডও সনদ নামে পরিচিত। কৃষিতে নারীর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বিশ্বখাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিল ১৯৮৪ কৃষিতে নারী, ১৯৯৯ অন্ন জোগায় নারী নির্ধারিত হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে ১৮৯টি দেশের প্রায় ৩০ হাজার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সর্বসম্মতভাবে নারী উন্নয়নের সামগ্রিক রূপরেখা হিসেবে বেইজিং ঘোষণা ও ‘প্লাটফরম ফর অ্যাকশন’ গৃহীত হয়।
দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক যেখানে নারী সেখানে নারীর উন্নয়ন ছাড়া দেশের কোনো সেক্টরের উন্নয়ন অসম্ভব। জাতীয় কৃষিনীতিতে নারীর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি বিভিন্ন সময় নেয়া হলেও তা কখনো বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। কিন্তু এখন এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সময় এসেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশে কৃষিকে যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি এ খাতে নারীর অবদানকেও আজ অস্বীকার করার উপায় নেই। কৃষি খাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের স্বীকৃতি ও ন্যায্য মজুরি প্রদান নিশ্চিত করতে পারলে দেশের কৃষি উৎপাদন কাজে নারীরা আরও আগ্রহী হবে। এর ফলে কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়বে, জিডিপিতে কৃষির অবদানও বাড়বে। তাই কৃষিকাজে জড়িত নারী শ্রমিকদের মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
কৃষিতে নারীর সংশ্লিষ্টতা অবদান ব্যাপক ও বিস্তৃত। এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য হলো_ বীজ সংরক্ষণ; বীজ অঙ্কুরোদগম; বীজ বাছাই; বীজ শোধন; বীজতলায় বীজ বপন; চারা তোলা; চারা রোপণ; কৃষি পঞ্জিকা প্রণয়ন ও অনুসরণ; পুষ্টিসম্মত রান্না কৌশল; খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ; কর্তন উত্তর কৌশল; শস্য সংরক্ষণ; কৃষি উৎপাদন পরিকল্পনা; কৃষি শ্রমিক ব্যবস্থাপনা; জৈবকৃষি; জৈবসার তৈরি ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা; ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা; কুইক কম্পোস্ট তৈরি ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা; খামারজাত সার; মুরগি পালন; হাঁস পালন; ছাগল পালন; গরু পালন; দুধ দোহন; গরু মোটাতাজাকরণ; ডিম ফোটানো; মুরগি লালন-পালন; হাঁস লালন-পালন; বসতবাড়িতে শাক-সবজি চাষ; বসতবাড়িতে ফল চাষ; বসতবাড়িতে ফুলচাষ; বসতবাড়িতে ভেষজচাষ; কবুতর পালন; কোয়েল পালন; নার্সারি ব্যবস্থাপনা; মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনা; মৌচাষ ; শীতল পাটি বুনন ব্যবস্থাপনা; হোগলা তৈরি; অঙ্গজ বংশবিস্তার; বায়োগ্যাস কার্যক্রম; বনসাই/অর্কিড/ক্যাকটাস চাষ; কুল বার্ডিং; খাঁচায় মাছ চাষ; পুকুরে আধুনিক উপায়ে মাছ চাষ; ছোট কৃষিশিল্প জ্যাম, জেলি, আচার, কেচাপ, স্যুপ, আমসত্ত্ব, তালসত্ত্ব; মাছের সঙ্গে হাঁস/মুরগির চাষ; ভাসমান সবজি চাষ; ঘাস চাষ; উন্নত চুলায় রান্না; কুটির শিল্প; মাশরুম চাষ; আলুর কলার চিপস; চানাচুর তৈরি; ছাদে বাগান; আইপিএম/আইসিএম/আইএফএম; বাহারি মাছ; পারিবারিক শাক-সবজি সংগ্রহ; পারিবারিক শাক ফলমূল সংরক্ষণ; জ্বালানি সংগ্রহ; কৃষি বনায়ন; সামাজিক বনায়ন ইত্যাদি।
সিডিপির অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রেক্ষিত বাংলাদেশ শীর্ষক সংলাপে বলা হয়, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২.১টি কাজ করে ব্যয় করেন ৭.৭ ঘণ্টা। পুরুষ করেন ২.৭টিতে করেন ২.৫ ঘণ্টা। অর্থাৎ নারী-পুরুষের তুলনায় ৩ গুণ বেশি কাজ করেন। জাতীয় আয়ে নারীর যে পরিমাণ কাজের স্বীকৃতি আছে তার চেয়ে ২.৫ থেকে ২.৯ গুণ কাজের স্বীকৃতি নেই। নারী যে পরিমাণ কাজে স্বীকৃতি আছে সে হারে ২.৫ গুণ কাজের স্বীকৃতি নেই। নারী ঘরে করে এমন কাজের আর্থিক মূল্য গত অর্থবছরের জিডিপির ৭৬.৮০ শতাংশ। চলতি টাকার মূল্যে তা ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। স্থানীয় মূল্যে এটা ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।
নারীর সম্মান আর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আমাদের টোটাল মানসিকতা যৌক্তিকভাবে বদলাতে হবে; পুষ্টিতে, তুষ্টিতে, যুক্তিতে নারীর পাওনা অধিকারকে সমানভাবে প্রাপ্যতা অনুযায়ী সুনিশ্চিত করতে হবে; নারীকেই শিক্ষা প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও দক্ষ করে তুলতে হবে; নারী বলে কোনোরকম বৈষম্য অবহেলা করা চলবে না; নারী আইনগত অধিকার, বিনিয়োগী অধিকার, অবদানের স্বীকৃতি যথাযথভাবে দিতে হবে; নারী যেমন পুরুষের কাজে সার্বিক আন্তরিক সহযোগিতা করে তেমনি নারীর কাজেও পুরুষের সার্বিক সহযোগিতা আবশ্যকীয়ভাবে করতে হবে; জিডিপিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য জাতীয় হিসাব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে; গৃহস্থালির কাজের ভার কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ; নারীর মজুরি বাড়ানো, যারা আয় করেন তাদের ইচ্ছামতো খরচ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে; ঘরে-বাইরে কাজ করার পর নারীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম আবশ্যকীয়ভাবে দিতে হবে; নারীর সব অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে; নারীদের প্রকৃত মর্যাদা দিতে হবে; নারীদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান।
নারীকে অবহেলা করে দূরে রেখে বাইরে রেখে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কখনো সফল হবে না। আমাদের জাতীয় কবির সঙ্গে একমত হয়ে বলি- ‘শস্যক্ষেত্র উর্বর হ’ল, পুরুষ চালাল হাল, নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল। নর বাহে হাল, নারী বহে জল, সেই জল মাটি মিশে’ ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে। সেদিন সুদূর নয়-যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।’ বাংলার নারীর সার্বিক কল্যাণ হোক মঙ্গল হোক।