সফল পাঁচ নারী উদ্যোক্তার পথচলা

বাংলাদেশে নারীরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন। সমাজের সর্বক্ষেত্রে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ নারীই স্বনির্ভরতার জন্য চাকরিতে যাচ্ছেন। আর কিছু নারী এগিয়ে আসছেন ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ব্যবসায়। তারা নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। নিজেদের পাশাপাশি অন্য নারীদেরও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতা করছেন। এমন পাঁচজন নারী উদ্যোক্তার সাফল্য ও জীবনসংগ্রামের কাহিনি তুলে ধরেছেন ইশরাতুল জাহান 

১ হাজার টাকায় ব্যবসা শুরু আইরিনের  

মাত্র ১ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন আইরিন পারভীন। সিরাজগঞ্জের এই নারী উদ্যোক্তা ঘরোয়াভাবে কাজ শুরু করেন ২০০৭ সালে। শুরুতে নিজেই কিছু বৈচিত্র্যধর্মী ডিজাইনের পোশাক তৈরি করে সেগুলো স্থানীয় ফ্যাশন হাউসগুলোয় সরবরাহ করতেন। তার পোশাকের চাহিদা বাড়ায় বাড়তে থাকে কাজের কলেবর। একটি পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে বেশ সুনাম অর্জন করায় ব্যবসা বাড়াতে তিনি সিরাজগঞ্জ থেকে চলে আসেন ঢাকায়। ২০১৩ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পুঁজি বাড়ান। সিরাজগঞ্জে গড়ে তোলেন একটি কারখানা। সেখানে প্রায় ৫০ জন নারী ও পাঁচজন পুরুষ কাজ করছেন। যুক্ত হন মহিলা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত জয়িতার সঙ্গে। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আরও এগিয়ে যান সামনের দিকে। বর্তমানে রাজধানীর রাপা প্লাজায় জয়িতায় শোরুমে তার প্রতিষ্ঠানের একটি স্টল রয়েছে। এর নাম রূপায়ণ হস্তশিল্প। বর্তমানে তার মাসিক আয় গড়ে ৪০ হাজার টাকা। তবে বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে তার বিক্রি বেড়ে যায়। তখন আয়ও বাড়ে।

বাজারের টাকা বাঁচিয়ে ব্যবসা শুরু মাহমুদার

অসম্ভবকে সম্ভব করতে মনের সাহসই যে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী তা প্রমাণ করেছেন উদ্যোক্তা মাহমুদা খাতুন। সংসারের বাজার খরচের টাকা থেকে কিছু সাশ্রয় করে মাত্র ৫০০ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। প্রথমে নিজের বাড়িতে বসে বালিশের কুশন কভারের কাজ করতেন। এই রঙবেরঙের সুতা, পুঁতি, কুশন কভারই ছিল তার উপকরণ। ৫, ১০ ১৫, ২০ এভাবে ৫০০ টাকা জমিয়ে কুশন কভারে কারুকাজের কাজ শুরু করেন। খুব ছোট কলেবরে তার কাজ চলছিল। অনেকে বাসায় এসে এগুলো কিনে নিয়ে যেতেন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনী মহিলা কল্যাণ সমিতি (বাফওয়া) থেকে নয় মাসের পোশাক কাটিং ও মেকিং কোর্স করেন। এরপর সাহস নিয়ে নেমে পড়েন ব্যবসায়। জয়িতার মধ্যে একটি স্টল দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন তিনি কুশন কভারসহ সালোয়ার-কামিজ, নকশিকাঁথাও তৈরি করছেন। ২০০৩ সালে তিনি মহিলা উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি সমিতি গড়ে তোলেন।

নারীদের উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন মমতা

পরিবারিক সচ্ছলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২০০৭ সালে ব্যবসা শুরু করেন মোহসেনা মমতা। নারায়ণগঞ্জে বাড়ি হওয়ায় সেখানেই শুরু। প্রথমে হাতে তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী স্থানীয় ফ্যাশন হাউসগুলোয় সরবরাহ করতেন। এভাবে তার তৈরি পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকায় ব্যবসার আকারও বাড়তে থাকে। ২০১১ সালে যুক্ত হন জয়িতার সঙ্গে। গড়ে তোলেন ফ্যাশন হাউস উন্নিশ ফ্যাশন। অর্ডারের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় স্থাপন করেন একটি কারখানা, যেখানে বর্তমানে কাজ করছেন ২০ জন কর্মচারী। ২০১৬ ও ২০১৭ সালের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করেন জয়িতার মাধ্যমে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে তিনি জয়িতার প্যাভিলিয়নে প্রথম হন।

নারায়ণগঞ্জ ক্লাব থেকে ২০১৬ সালে তাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। বতর্মানে তার মাসিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা।

সংগ্রামী ও সাহসী নারীর প্রতীক মুক্ত

সংগ্রামী ও সাহসী নারীর উদাহরণ নাজনীন আক্তার মুক্তা। জীবন সংগ্রামে কখনই হেরে যাননি তিনি। যত বাধাই এসেছে সবকিছুই মোকাবিলা করেছেন নিজস্ব শক্তি ও মনোবল দিয়ে। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে বিভিন্ন জটিলতার শিকার হন তিনি। একটি ছেলেসন্তান নিয়ে নতুন করে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়েন ২০০৭ সালে। অনেক কষ্টে মাত্র ২৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। তৈরি নকশিকাঁথা, ব্লক, বাটিক, এমব্রয়ডারি, ওয়ান পিস, থ্রি-পিস, কুশন কভার, পর্দা ইত্যাদি তৈরি করছেন। এগুলো বিক্রিও হচ্ছে ভালো। তিন বছর ধরে একাধারে জয়িতার মাধ্যমে বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করছেন।

নিজের পাশাপাশি অন্য নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে সহযোগিতার জন্য ২০১৫ সালে গঠন করেছেন নারায়ণগঞ্জ মহিলা সমিতি। এর মাধ্যমেও তিনি অনেককে কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি তার কাজের জন্য নারায়ণগঞ্জের ক্লাব থেকে সম্মাননাও পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি মাসে আয় করছেন ২৫ হাজার টাকা।

চাকরি নয়, ব্যবসায়ই লক্ষ্য ছিল ফারজানার

বগুড়ার মেয়ে ফারজানা আফরীনের স্বপ্ন ছিল নিজে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন, সেখানে আরও অনেকের কর্মসংস্থান করবেন। চাকরির জন্য কোথাও যাবেন না। সেই লক্ষ্য অর্জনে তিনি ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে তিনি বিভিন্ন পোশাক তৈরি করে সেগুলো ফ্যাশন হাউসগুলোয় সরবরাহ করতেন। পরে নিজেই গড়ে তোলেন মহিলা কর্মসংস্থা ও দারিদ্র্য বিমোচন সংস্থা। এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর তিনি। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেন। নিজের ব্যবসা বাড়াতে তিনি ২০১১ সালেই জয়িতা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হন। ওই বছরেই ব্যবসা নিজের পুঁজি ও ঋণের টাকা মিলে গড়ে তোলেন আরএফ ফ্যাশন হাউস। এর আওতায় তিনি সব ধরনের পোশাক ও শৌখিন সামগ্রী তৈরি করছেন। এগুলো বিক্রির জন্য মোহাম্মদপুরে দুটি শোরুম দিয়েছেন। এ ছাড়া রাপা প্ল­াজায় জয়িতা ফাউন্ডেশনে একটি স্টল রয়েছে তার। বর্তমানে তার মাসিক আয় প্রায় ৬০ হাজার টাকা।