পুরুষের সমান গতি, নিজের বাইকে সুন্দর এগিয়ে চলা

বাইকে ছেলেদের মতো করে বসলে, এই কিছুকাল আগেও, বিরাট লজ্জা-শরমের ব্যাপার হয়ে যেত। ৪০০ বছর বয়সী ঢাকাও যেন মুখ ঢাকতো লজ্জায়। কিন্তু আজ? বদলে গেছে চিত্রটা। বদলে যে গেছে, শহরের রাস্তায় নামলে বেশ টের পাওয়া যায়। এখন মোটরসাইকেলের পেছনে নিজের মতো বসা নয় শুধু, সামনে আসছেন নারীরা। নিজে চালাচ্ছেন। প্রিয় বাহনে করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসা-চাকরি সব হচ্ছে। আশার কথাÑ- নোংরা চোখের পুরুষেরা পিছু হটছে। অন্ধকারের বুক চিড়ে সামনে পুরুষের সমান গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে নারী। বলার অপেক্ষা রাখে না এই দৃশ্য শহর ঢাকার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে।

রুটিন দেখার পাশাপাশি বুধবার নারী দিবসে কথা হলো চার নারীর সঙ্গে। বিকেলে শাহবাগে এসেছিলেন তারা। বাইক পাশাপাশি রেখে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথমে কথা হয় ফাহমিদা আফরিনের সঙ্গে। এই তরুণী একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাসা মিরপুরে। সেগুন বাগিচায় অফিস। মাঝখানে দীর্ঘ পথ। কিন্তু প্রতিদিন হাসিমুখেই পাড়ি দেন তিনি। বলেন, দুই বছর ধরে বাইক চালিয়ে অফিসে আসা যাওয়া করছি। প্রথম দিকে বাসা থেকে সামান্য আপত্তি ওঠেছিল। এখন আর তা নেই। খুব ভাল খবরটি দিয়ে তিনি বলেন, সমাজও ভালভাবে নিয়েছে বলে মনে হয়। সবাই হেল্প করে। বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশের কথা বললেন তিনি। জানালেন, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক যে কোন সমস্যায় এগিয়ে আসেন।

পাশেই ছিলেন সুবর্ণা। বাইকের ওপরে হেলমেট পরে বসেছিলেন। স্মার্ট তরুণী। শান্তমারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়ছেন। বাসা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। সেখান থেকে বাইকে করে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে আসেন। মেয়েরা তো ছেলে বন্ধুদের বাইকে নিয়মিতই চড়েন। কিন্তু যখন মেয়েরা চালক, ছেলে বন্ধুদের জায়গা হয় বাইকে? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে মোটেও সময় নেন না তিনি। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেন, অবশ্যই। আমার বাইকে ছেলে বন্ধুরাও ওঠে। আমি তাতে কোন সমস্যা দেখি না।

শ্রাবণী আবার কলেজের শিক্ষার্থী। উত্তরার একটি কলেজ থেকে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন। এইটুকুন দেখতে। হালকা পাতলা গড়ন। কিন্তু বাইকের ওপর চমৎকার নিয়ন্ত্রণ। তিনি জানালেন, বাইক কেনার আগে খুব সমস্যা হতো। সিএনজি অটো রিক্সা, রিক্সা কিছুই সময় মতো পাওয়া যেত না। বাসে চড়ার অভিজ্ঞতা আরও খারাপ। বললেন, আপনারাও জানেন, বাসে মেয়েদের কী পরিমাণ হ্যারেস হতে হয়। সব চুকে বুকে গেছে বাইক কেনার পর। শ্রাবণী জানায়, পরিবারের সাপোর্ট পেয়েছেন তিনি। এ কারণেও বাইক চালানোর চ্যালেঞ্জটা নেয়া সম্ভব হয়েছে।

এ তো গেল কয়েকজন নারী বাইক চালকের কথা। কিন্তু সব মিলিয়ে অবস্থাটা কেমন? জানতে কথা হয় ইশরাতের সঙ্গে। বাংলাদেশ উইমেন রাইডার্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। জানালেন, প্রতিদিন অনেক নারী বাইক চালিয়ে কর্মক্ষেত্রে যান। একইভাবে বাসায় ফেরেন। সংখ্যাটি নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে খুব কম হবে না। শতাধিক নারী বাইক চালক তাদের সংগঠনের সদস্য জানিয়ে তিনি বলেন, গৃহিণী ডাক্তার রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন পেশার নারীরা পুরুষের পাশাপাশি বাইক চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছছেন। এ ব্যাপারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একসময় ভাল সমস্যা ফেস করতে হতো। ছেলেরা ডিস্টার্ব করতো খুব। আমাদের দেখলেই অনুসরণ করার চেষ্টা করতো। রেস দিতে আসত। এমনভাবে পাশ দিয়ে চলে যেত যাতে করে আমাদের ব্যালেন্স নষ্ট হয়। তবে যতদিন যাচ্ছে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে বলে জানান তিনি।

আরও বদলাবে। পুরুষের সমান গতিতে সুন্দর এগিয়ে যাও নারী। এখানে থেমো না…।