হাওরে নারীর শ্রম বিপ্লব

তথাকথিত ‘অবলা’ আর ‘গৃহলক্ষ্মী’ বিশেষণকে ম্লান করে আমাদের নারীরা আজ সমাজের সর্বত্র নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে চলেছেন। এই আধিপত্য গায়ের জোরে নয়, মেধা আর শ্রমের যুগপৎ মিশেলে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। সারাদেশের মতো হাওরের জনপদেও শ্রমজীবী নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ভাটি অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপটকেই পাল্টে দিচ্ছে। মজবুত হচ্ছে পরিবারের আর্থিক বুনিয়াদ। পুরুষের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীর এই শ্রম বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিকেও সুদৃঢ় করছে।

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এখন এ জনপদের নারীকর্মীদের হাতের ছোঁয়া আর ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছড়াচ্ছে কৃষির আবাদ। একটা সময় হাওরের অবলা, ঘরকুনো ও অসহায় বিশেষণের নারীরাই এখন পুরুষের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে বদলে দিচ্ছে হাওরের কৃষি ব্যবস্থা এবং দেশের অর্থনৈতিক চেহারা। সংসার আর সন্তান পালনকারী নারীদের হাতেই গড়ে উঠছে নতুন হাওর। এখন হাওরের নারীরা পুরুষের পাশাপাশি পুরোদস্তুর কাজ করছেন। বিভিন্ন কাজে পুরুষকে সহযোগিতা করছেন। সংসারে অভাব-অনটন ঘোচাতেও রাখছেন বহুমুখী ভূমিকা।

যে দেশে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার থেকে শুরু করে রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সবখানে নারীদের সমান বিচরণ, সে দেশে হাওরের অবহেলিত নারীরা সংসারে পুরুষের ওপর কেন শুধু নির্ভর করে থাকবেন? এ ভাবনাই এখানকার নারীদের বিভিন্ন শ্রমপেশায় উদ্বুদ্ধ করেছে। নারীরা আজ সংসার সামলানোর পাশাপাশি দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছেন সমান তালে। জেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে ও নারীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নানা দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কুয়াশাভেজা ভোরে শরীরে চাদর জড়িয়ে নারীরা চলে এসেছেন মাঠে। ক্ষেতে বোরো চারা রোপণ করছেন। সংসারের নৈমিত্তিক কাজের মতোই হাওরের নারীরা তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় গোছালোভাবে রোপণ করে চলেছেন ধানের চারা। কাজে তার এতই মগ্নতা যে, অন্যের সঙ্গে কথা বলার ফুরসতও যেন নেই। মাঠে কর্মরত নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নারী হিসেবে নয়, বরং সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবেই তারা মাঠে কাজ করছেন। কেউ নিজের জমিতে, কেউবা অন্যের জমিতে। তবে পুরুষদের তুলনায় পারিশ্রমিক একটু কম বলে কিছুটা আক্ষেপও রয়েছে তাদের। তারা জানান, মাঠে একজন পুরুষ যে পরিমাণ কাজ করেন, একজন নারীও তার থেকে কোনো অংশে কম নন। তাই পারিশ্রমিক যদি সমান হতো তবে কাজে আরও বেশি উৎসাহ পেতেন তারা। কৃষিকাজ করতে কেমন লাগে? এমন প্রশ্নে অধিকাংশ নারীরই সরল উত্তর, সংসারের অন্য কাজের মতোই কৃষিকাজ তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর এর মাধ্যমে সংসারে কিছুটা আর্থিক আয়-উন্নতিও হয়। তাই এটাকে খাটো করে দেখার কিছু নেই। ক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে সংসারে কোনো বঞ্চনার শিকার হতে হয় কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে নারীরা বলেন, যেহেতু এর মাধ্যমে সংসারে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ছে সেহেতু খুব বেশি সমস্যা হয় না। অষ্টগ্রাম-ইটনা-মিঠামইন-নিকলী উজেলাগুলোতে এখন শুকনো মৌসুম। এ সময় হাওরের কৃষি জমিতে ধান রোপণ থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই এবং গুদামজাতকরণের কাজ চলে পুরোদমে।

করিমগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকারি লক্ষ্যমাত্র অর্জনে নারীদের এই অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গৃহকর্মের বাইরে হাওরের নারীরা তাদের মেধা ও শ্রম বিনিয়োগের জন্য তাই বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ ও জলাশয়কেই বেছে নিয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ধান চাষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে তার সিংহভাগ কৃতিত্বই থাকবে নারীদের।