সামুদ্রিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আসুন একসঙ্গে তরী ভাসাই

রোহিঙ্গা ফেরত পাঠাতে ইন্দোনেশিয়ার সহায়তা চাইলেন শেখ হাসিনা * শ্রীলংকার সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে মতৈক্য
সামুদ্রিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আসুন একসঙ্গে তরী ভাসাইপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মঙ্গলবার ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় আইওআরএ লিডার্স সামিটে স্বাগত জানাচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো -পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে আরও শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ হিসেবে গড়ে তুলতে সামুদ্রিক সহযোগিতা জোরদারে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে এই অঞ্চলের দেশগুলোর জোট ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ) নেতাদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

তিনি এ অঞ্চলের জন্য দক্ষ নাবিক তৈরিতে বাংলাদেশে ভারত মহাসাগর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে মহাসাগর ও সমুদ্রপথ উন্নয়নের মাধ্যমে রিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশকে রূপান্তরের প্রচেষ্টা চালানো। আসুন সামুদ্রিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ ভারত মহাসাগরের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করি।… আসুন একসঙ্গে তরী ভাসাই।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার জাকার্তা কনভেনশন সেন্টারে ভারত মহাসাগর রিম অ্যাসোসিয়েশন সামিটে ‘একটি শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভারত মহাসাগরের জন্য রিম সামুদ্রিক সহযোগিতা জোরদারকরণ’ শীর্ষক এক বিতর্ক অধিবেশনে ভাষণ দিচ্ছিলেন।

শেখ হাসিনা আইওআরএ নেতাদের প্রতি সমুদ্রগামী নাবিকদের নিরাপত্তা এবং পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করার আহবান জানিয়ে বলেন, তাদের দক্ষতা এবং নিবেদিত কার্যপ্রণালি কখনও কখনও অনাকাক্সিক্ষত পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী দেশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এর সমুদ্রসম্পদ টেকসইভাবে ব্যবহারের ওপরই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এজন্য আমরা এসডিজি-১৪-কে আমাদের ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করেছি এবং সমুদ্র অর্থনীতির দিকে আমাদের মনসংযোগকে নবায়ন করেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদিও আমরা এ বিষয়টিতে সম্পূর্ণভাবেই অবগত যে, সমুদ্র এলাকার সম্পদ আহরণের সামর্থ্যরে ওপরই আমাদের এই সাফল্য নির্ভর করছে।’

ভারত মহাসাগরকে আমাদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ, শান্তি এবং সমৃদ্ধির জন্য অন্যতম মাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা বিশ্বায়নের এই যুগে একটি লাইফলাইন যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক কনটেইনার জাহাজ, তিন ভাগের এক ভাগ বাল্ক কার্গো এবং তিন ভাগের দুই ভাগ তেলের চালান পরিবাহিত হয়।

শেখ হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রশ্নে বাংলাদেশে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির উল্লেখ করে বলেন, ‘ব্যাপক অর্থে আমাদের এই নীতির আওতায় নিরাপদ সমুদ্র এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তাজনিত বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা প্রতিহত করায় আইওআরএ’র যে ঘোষণা তা আইওআরএ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করবে।

জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মনে করে টেকসই জ্বালানি অনুসন্ধানের জাতীয় প্রচেষ্টার বিষয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রভাব ইতিবাচক।

শান্তি ও উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ যোগাযোগকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে আমরা শুধু অবকাঠামোগত যোগাযোগই নয়- চিন্তা-চেতনা, উদ্ভাবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং পর্যটন ক্ষেত্রে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে মানসিক যোগাযোগও স্থাপন করতে চাই। বিশেষ করে মানবীয় যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।’

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা এখনও জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কাছে জিম্মি এবং এর মানে হল আমরা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভীতিকর অবস্থার দিকেই অগ্রসর হচ্ছি।

শেখ হাসিনা বলেন, এটা অনুমিতই যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ তার মহামূল্যবান কৃষি জমির এক-তৃতীয়াংশ হারাবে এবং প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ লোক বাস্তচ্যুত হবে।

আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য স্মরণীয় একটি দিন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।

‘বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে। আমি বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং বাংলার মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী সামিটের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেন।

সম্মেলনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভিকে সিংহ, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিমন্ত্রী সালেম আল-শামসি এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নোবউ কিশির সঙ্গে বৈঠক করেন।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠাতে সে দেশের সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মিয়ানমারের শরণার্থীরা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা এবং এর সমাধান প্রয়োজন।’

বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র সচিব সম্প্রতি বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে এ দুটি দেশ সফর করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ-শ্রীলংকা বাণিজ্য চুক্তিতে মতৈক্য : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে একমত হয়েছেন। পরে শহীদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নে এফটিএর বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেছেন। ‘বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে এফটিএর বিষয়টি খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটি সম্পন্নের জন্য দুই নেতাই সম্মত হয়েছেন।’ শ্রীলঙ্কার সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হলে এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। দুই দেশের সম্পর্ক আরও কিভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয় নিয়েও দুই নেতা আলোচনা করেছেন বলে জানান শহীদুল হক।

আমিরাতের ভিসা সহজের সুপারিশ

শেখ হাসিনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিমন্ত্রী মাইথা সালেম আল-শামসির সঙ্গে বৈঠক করেন।

দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্রমেই যে বৃদ্ধি পাচ্ছে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আইওআরএ-তে ইউএই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

‘এক সময় ইউএই আইওআরএর চেয়ারম্যান হবেন। ইউএইর মেয়াদ শেষ হলে বাংলাদেশ চেয়ারম্যানশিপ গ্রহণ করবে।’ আমিরাতের ভিসা পদ্ধতি বিশেষ করে বিজনেস ভিসা সহজ করতে প্রধানমন্ত্রী সুপারিশ করেছেন বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদের সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন ও দেখবেন বলে জানিয়েছেন।

জঙ্গিবাদ নির্মূলে গৃহীত উদ্যোগে জাপানের প্রশংসা : জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নোবউ কিশির সঙ্গেও বৈঠক করেছেন শেখ হাসিনা।

শহীদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার প্রশংসা করেছেন জাপানের প্রতিমন্ত্রী।’ এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে যেসব সমঝোতা রয়েছে তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। সবশেষে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভিকে সিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।