সোনালি স্বপ্ন ফেরাতে পাটের নতুন চার জাত

দেশের সোনালি স্বপ্ন পাট বিকাশে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই)। পরিবেশবান্ধব ও কৃষকের চাহিদা বিবেচনায় নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে প্রতিষ্ঠানটি। নির্ধারিত সময়ে অধিক, উন্নতমানের পাট এবং এ জাতীয় ফসলের আঁশ উৎপাদন; প্রান্তিক এবং অপ্রচলিত (লবণাক্ত, পাহাড়ি, চরাঞ্চল) জমিতে আবাদ উপযোগী উন্নত দেশি, তোষা, কেনাফ ও মেস্তাসহ এখন পর্যন্ত ৪৫টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছেন বিজেআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা। চলতি বছরেই আসছে আরও নতুন চারটি জাত।

বিজেআরআই থেকে জানা গেছে, পাটের চারটি নতুন জাত উদ্ভাবনের সব কাজ শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে রয়েছে কেনাফ জাতের কেই-৩, যার পাতা হবে লাল রঙয়ের এবং ফলন একই গোত্রের অন্যান্য জাতের থেকে ১০ শতাংশ বেশি। এটির স্বীকৃতিও দিয়েছে জাতীয় বীজ বোর্ড, রয়েছে প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায়। এ ছাড়া তোষা জাতের এমজি-১, দেশি পাটের বিজেসি-৫০০৩ ও মেস্তা পাটের বিজেআরআই এম-৩, এই তিনটি নতুন জাত উদ্ভাবনের প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এদিকে উদ্ভাবিত ৪৫টি উচ্চ ফলনশীল পাটের জাতের মধ্যে দেশি ২৪টি, তোষা ১৫টি, কেনাফ চারটি ও মেস্তা দুটি। এর মধ্যে বর্তমানে নয়টি দেশি, ছয়টি তোষা, তিনটি কেনাফ এবং দুটি মেস্তা জাতের বীজ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ও আবাদ হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বীজ, বিশেষ করে কেনাফ ও মেস্তা জার্মপ্লাজম সংগ্রহ এবং তা মূল্যায়ন করে উত্তরোত্তর পাট এবং এ জাতীয় আঁশ ফসল উন্নয়ন প্রচেষ্টা চলছে।

পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ড. চন্দন কুমার সাহা আমাদের সময়কে বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট নতুন জাত উদ্ভাবন করছে। তবে চলতি বছর বিগত যে কোনো বছরের তুলনায় বেশি জাতের পাট উদ্ভাবন হওয়ার আশা করা যায়। ইতোমধ্যে একটি জাতের অনুমোদন বাংলাদেশ বীজ বোর্ড দিয়েছে।

২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে পাটের উৎপাদন হয়েছিল ৫০ লাখ বেল। পরের কয়েক বছর উৎপাদন ওঠানামা করে, ২০১১-১২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৭৮ লাখ পাঁচ হাজার বেল পাট উৎপাদন হয়। এর পর থেকে উৎপাদন কমতে থাকে। তবে ২০১৩ সালের পর পাটের নতুন চারটি জাত উদ্ভাবন করায় উৎপাদন বেড়ে যায়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পাটের উৎপাদন হয় প্রায় ৬৮ লাখ বেল, তা বেড়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে হয়েছিল ৭৫ লাখ বেল। এ ছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৮৫ লাখ বেলে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয় ৭৫ লাখ বেল। চলতি অর্থবছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৬ লাখ বেল।

উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি পাটজাত দ্রব্যেও এসেছে ভিন্নতা। বস্ত্র শিল্পগুলো পরিধেয় বস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ ফেব্রিক্স তৈরিতে তুলা প্রধান উপাদান হলেও অন্যান্য গার্হস্থ্য ব্যবহারের জন্য পাটকেই বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। কটন প্রসেসিং সিস্টেমে ব্যবহারের জন্য লম্বা পাটকে তিন থেকে চার সেন্টিমিটার বা দেড় থেকে দুই ইঞ্চি দীর্ঘ টুকরা করে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তুলার কাছাকাছি গুণসম্পন্ন করা হয়। এর পর বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াজাত পাটকে তুলার সঙ্গে বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি করা হয় সুতা। এই সুতাকে কটন কাউন্ট হিসেবেই পরিমাপ করা হয়। জুট অ্যান্ড টেক্সটাইল প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে (জেটিপিডিসি) ১০, ১২, ১৫, ১৬, ২০, ২২ কটন কাউন্ট পর্যন্ত মিহি সুতা উদ্ভাবন ও উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। বিজেআরআইয়ের কারিগরি শাখা থেকে উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি হস্তান্তর ও পণ্যগুলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন ও বাজারজাতের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ৩০০টি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করে দিয়েছে।