বাংলার পাট বিশ্বমাত

পাট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশবান্ধব আঁশ ফসল। দীর্ঘদিন অবহেলার পর আবারও পাট তার হারানো গৌরব ফিরে পাচ্ছে। পৃথিবীর অন্য পাট উত্পাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পাটের মান ভালো এবং বর্তমানে উত্পাদনের বিবেচনায় ভারতের পরে দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশের পাটের অবস্থান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত বছর সর্বোচ্চ ৮ লাখ ১৭ হাজার ৩৮৩ হেক্টর জমিতে রেকর্ড পরিমাণ পাট ও কেনাফ চাষ হয়েছে।  গত অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসের তুলনায় কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে ১৪ দশমিক ০৫ শতাংশ আয় বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি মেয়াদে এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় চার হাজার ৫১৮ কোটি টাকা।

 

সোনালি আঁশের কোনো কিছুই এখন আর ফেলনা নয়। একদিকে সোনালি আঁশ, অন্যদিকে রুপালি কাঠি—দুটি মিলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে পাট উত্পাদনে। চীনসহ বিভিন্ন দেশে পাটকাঠির ছাই থেকে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আতশবাজি ও ফেসওয়াশের উপকরণ, মোবাইলের ব্যাটারি, প্রসাধনীপণ্য, এয়ারকুলার, পানির ফিল্টার, বিষ ধ্বংসকারী ওষুধ, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, দাঁত পরিষ্কারের ওষুধ ও ক্ষেতের সার ইত্যাদি পণ্য তৈরি করা হয়। পাটকাঠি থেকে উত্পাদিত কার্বনের গুণগতমান সর্বাধিক। তাই বিশ্ববাজারে এর চাহিদা ও মূল্য দুটিই বেশি। ছাই ছাড়াও পাটকাঠি থেকে কয়লা বা অ্যাকটিভেটেড চারকোল উত্পাদন করা হয়। ইউরোপে ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্লান্টে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে পাটকাঠির ছাইয়ের প্রধান আমদানিকারক দেশ হচ্ছে চীন। বর্তমানে চীন ছাড়াও তাইওয়ান, জাপান, হংকং ও ব্রাজিলেও পাটকাঠির ছাই রফতানি হচ্ছে। এ ছাড়া এর বড় বাজার রয়েছে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, পাটকাঠির ছাই রফতানিতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫৪ কোটি টাকা আয় হয়েছে।

 

এদিকে সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামীতে পাট থেকে তৈরি হবে ডেনিম গার্মেন্টস, ট্রাউজার, কোট, ব্লেজার, শার্ট, পর্দার কাপড়, ডোর মেট, হোম টেক্সটাইল ও বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ৫০ শতাংশ পাট ও ৫০ শতাংশ তুলা ব্যবহার করে তৈরি করা সুতা দিয়ে পরিবেশবান্ধব এসব পণ্য উত্পাদন করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন জুট মিলে বহুমুখী পাটপণ্য উত্পাদনের জন্য পৃথক ইউনিট স্থাপনে প্রকল্প নিয়েছে সরকার।

 

পাটের সম্ভাবনাগুলো বিকশিত করে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারে পাট খাতের উদ্যোগগুলো সমন্বিত করার লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছর ৬ মার্চ পাট দিবস হিসেবে উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছে। “সোনালি আঁশের সোনার দেশ, পাট পণ্যের বাংলাদেশ”—প্রতিপাদ্যে প্রথমবারের মতো জাতীয় পাট দিবস উদযাপনে আট দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। আগামী ৯ মার্চ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুমুখী পাটপণ্যের মেলার উদ্বোধন করে আলোচনা সভায় অংশ নেবেন। পাট শিল্পের পুনরুজ্জীবন ও আধুনিকায়নের ধারা বেগবান করা, পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় পাট দিবস উদযাপন করা হবে।

 

পাট বাংলাদেশের পরিচিতির অন্যতম অনুষঙ্গ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে পাটের ইতিহাস জড়িত। স্বাধীনতার পরও প্রায় দেড় যুগ ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের অবদানই ছিল মুখ্য। দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ খাতের উপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা নতুন করে পাট চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বাংলাদেশের পাট বিশ্বমানের, বাংলাদেশের পাটশিল্পের অভিজ্ঞতা শতবর্ষ পুরনো, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জিনকোড আবিষ্কারের কৃতিত্বও দেখিয়েছেন। পাশাপাশি পাটকাঠির ছাই থেকে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায়, পাট চাষের হারানো সোনালি দিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।